হোমশাশ্বত_বাণীজীবন গঠনে ভগিনী নিবেদিতা

জীবন গঠনে ভগিনী নিবেদিতা

জীবন গঠনে ভগিনী নিবেদিতা

  • স্বামী শেখরানন্দ
    ( পূর্ব প্রকাশের পর ) [ ১৪ ও ১৫ ]

আমরা জানি, পরিবারেই প্রথম শিক্ষার বীজ বপন করা হয়।

নিবেদিতা ভারতীয় পরিবারের প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি বিষয়ে পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন।

সেই অভিজ্ঞতার ফসল তিনি শুধু ভারতবাসীর মধ্যে নয়, পাশ্চাত্যবাসীর মধ্যেও ভাগ করে দিয়েছিলেন।

তিনি নিজে সর্বদা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, শুধু তাই নয়, তাঁর সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন তাঁদেরও এই কাজে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

কাপুরুষ তাঁর কাছে এলে বিরক্ত হতো, আর সাহসী তার কাছে এলে নতুন উদ্যম ও উৎসাহ লাভ করত।

ভারতবর্ষের প্রাচীন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস, শিল্পকলা, ধর্মনীতি, আচার-ব্যবহার – এই সমস্ত বিষয়ে নিবেদিতার উৎসাহ আগ্রহ‌ই শুধু ছিল না, তাঁর সমসাময়িক সমস্ত ব্যক্তিদের এইসকল বিষয়ে জ্ঞান লাভের জন্য অনুপ্রেরণা দিতেন।

১৯০২ সালের ৪ জুলাই স্বামীজী দেহত্যাগ করলেন।

পরদিন সকালে নিবেদিতা বেলুড়মঠে এলেন।

স্বামীজীর মরদেহের পাশে বসে একটা হাতপাখা নিয়ে বেলা দুটো পর্যন্ত হাওয়া করলেন।

অপরাহ্ন চিতা প্রস্তুত হল।

শয্যার গৈরিক বস্ত্রটি খুব পেতে ইচ্ছে হচ্ছিল বন্ধু ম্যাকলাউড এর জন্য।

দৃষ্টিকটু হবে মনে করে চাইতে পারলেন না।

তন্ময় হয়ে তাকিয়ে ছিলেন প্রজ্বলিত চিতার দিকে।

হঠাৎ যেন জামায় একটা টান পড়ল।

তাকিয়ে দেখলেন পায়ের কাছে কাঙ্খিত বস্ত্রের একটা টুকরো।

পরম যত্নে তুলে নিলেন।

কঠিন এই আঘাত স্তিমিত হওয়ার আগেই কঠিন আর‌ও একটি সিদ্ধান্ত নিতে হলো নিবেদিতাকে।

জন্মস্বাধীনতাপ্রেমী নিবেদিতার পক্ষে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না।

ফলে তাঁকে বিধিবদ্ধভাবে রামকৃষ্ণ সংঘ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হল।

যদিও রামকৃষ্ণ সংঘ ও নিবেদিতার মধ্যে পারস্পারিক ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার ভাবটি চিরকাল অটুট থেকেছে।

পারস্পারিক প্রয়োজনে উভয়ে উভয়কে প্রাণপণে সহযোগিতা করেছেন।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমস্ত নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের তিনি সর্বতোভাবে সাহায্য করেছেন।

শ্রীঅরবিন্দের ‘কর্মযোগীন’ পত্রিকায় তিনি নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতেন।

প্রখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর সমস্ত লেখালেখির কাজে তিনি নিরলস সহায়তা করেছেন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিবেদিতার বিশেষ অনুরাগী ছিলেন।

‘ডন’ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, রাজনৈতিক নেতা রমেশচন্দ্র দত্ত, গোপালকৃষ্ণ গোখলে,সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে নিবেদিতার ঘনিষ্ঠতা ছিল।

স্বামীজীর আদর্শ ছিল ‘Man making Education’।

তাঁর প্রিয় শিষ্যা নিবেদিতার সমগ্র জীবন প্রকৃত মানুষ তৈরীর শিক্ষায় ব্যয়িত হয়েছে।

তাঁর লেখা পড়লে বুঝা যায় উৎসাহ, উদ্দীপনা, প্রেরণা ছাড়াও তা অত্যন্ত সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধ।

The web of Indian Life, Cradle Tales of Hinduism, The Master as I saw Him, Foot falls of Indian story প্রভৃতি বইয়ের ছত্রে ছত্রে নিবেদিতার প্রতিভার দীপ্তি ছড়িয়ে আছে।

তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে যখন Our People কথাটি উচ্চারণ করতেন, তখন প্রকাশ পেত তাঁর প্রাণের টান।

তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছেন ‘লোকমাতা’ আর শ্রীঅরবিন্দ বলেছেন ‘শিখাময়ী’।

১৩ অক্টোবর ১৯১১ দার্জিলিং-এ সূর্য উঠল।

আমাদের সকলের প্রিয় ভগিনী নিবেদিতা উচ্চারণ করলেন :
“The boat is sinking but I shall see the sunrise”.

তাঁর স্মৃতি ফলকে লেখা হলো,
‘HERE REPOSES SISTER NIVEDITA WHO GAVE HER ALL TO INDIA’.

( সমাপ্ত )
পৃষ্ঠা – ১৮৭

রামকৃষ্ণ মিশন সেন্টিনারি প্রাইমারি স্কুল, বরানগর এর ভগিনী নিবেদিতার শুভ অাবির্ভাবের ১৫০তম বর্ষ পূর্তির সমাপনী উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারক পত্রিকা রশ্মি ২০১৭ হতে গৃহীত।

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img