হোম অফবিট 'অ্যালেক্সা, আমার সন্তানের মন তোমার কাছে নিরাপদ তো?'

‘অ্যালেক্সা, আমার সন্তানের মন তোমার কাছে নিরাপদ তো?’

Sanjuktaসংযুক্তা সরকার

দৃশ্য : এক 
‘অ্যালেক্সা, ড্যু ইউ নো হাউ টু লাফ?’ ‘অ্যালেক্সা তুমি হাসতে পারো?’ ‘অব কোর্স আই ক্যান লাফ।’ ‘হ্যাঁ, নিশ্চই পারি।’ বলেই রিনরিনে গলা সুর করে গাইতে লাগলো, হা হা, হি হি, হো হো.. 

প্রশ্নকর্তা থামিয়ে দিয়ে ফের জানতে চাইল, ‘অ্যালেক্সা, ড্যু ইউ নো হাউ টু ক্রাই?’ ‘অ্যালেক্সা, তুমি কাঁদতে জানো?’ সপ্রতিভ মেয়েটি এবার খানিকটা বিব্রত। স্বভাবসিদ্ধ নম্র, মোলায়েম স্বরে জানালো, ‘আই অ্যাম সরি। আই কান্ট।’ ‘আমি দুঃখিত, আমি জানি না। তবে বদলে আমি তোমাকে কান্নার কিছু গান শোনাতে পারি।’

দৃশ্য : দুই
সামনে রাখা ইঞ্চি আটেকের স্ক্রিনটার ওপর রাগে লাল হয়ে এলোপাথাড়ি চাটি মেরে যাচ্ছে সদ্য চারে পা রাখা বরফি। হন্তদন্ত হয়ে কী হয়েছে জানতে চাওয়ায় রেগেমেগে বলল, অ্যালেক্সা নাকি কিছুতেই তার কথা বুঝতে পারছে না। তাই সে প্রচন্ড রেগে গেছে। চার বছরের ছেলের মুখের জড়তা এখনও কাটেনি পুরোপুরি। এখনও মিনির মত সে ‘জল’কে বলে ‘দল’। তাকে কে বোঝাবে দোষটা আসলে অ্যালেক্সার নয়, ওর নিজের আধো মুখের উচ্চারণের। সে তো তখনও সমানে একটা ভিডিও চালানোর ফরমায়েশ দিয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছে।
আর অ্যালেক্সা বুঝতে না পেরে অন্য ভিডিও চালিয়ে যাচ্ছে।

কোভিড ১৯, লকডাউন, অনলাইন স্কুলিং এইসবের মধ্যেই নিউ নর্মালে মানিয়ে নেওয়া ছোটদের জীবনে অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটের পাশাপাশি ক্রমশ ঢুকে পড়ছে অ্যালেক্সা, সিরি, গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের মত আর্টিফিসিয়াল ইনট্যালিজেন্সরা। ওরা গান শোনানো, ভিডিও দেখানোর পাশাপাশি গড়গড় করে নামতা বলতে পারে, ফটাফট কোন দেশের রাজধানীর নাম বলে দিতে পারে, মায় গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে লেকচারও দিতে পারে, একটুও সময় নষ্ট না করে।

মা বাবারাও খুশ্। সন্তানকে ছেড়ে দিচ্ছেন এআই-দের সাহচর্যে। কিন্তু একবারও কি ভাবছেন, সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এই সংলাপ চলতে দেওয়াটা ওদের জন্য কতটা নিরাপদ? ভেবে দেখুন তো ওপরে চিহ্নিত দৃশ্যপটগুলির কোনও একটি আপনার ঘরেও ঘটছে না তো? হয়ত আপনার অজান্তেই?

ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী শেরি টার্কল তাঁর ‘রিক্লেইমিং কনভারসেশন : দ্য পাওয়ার অব টক ইন আ ডিজিটাল এজ’ বইটিতে বলেছেন, “দ্য লঙ টার্ম ইনফ্লুয়েন্স অব অ্যাট হোম এ আই ইউনিটস অন চিলড্রেন উইল বি হার্মফুল: দিজ মেশিনস আর সেডাকটিভ এ্যান্ড অফার দ্য রঙ পে অফ : দ্য ইলিউশন অব কম্পানিয়নশিপ উইদাউট দ্য ডিমান্ডস অব ফ্রেন্ডশিপ। দ্য ইলিউশন অব কানেকশন, উইদাউট দ্য রেসিপ্রসিটি অব আ মিউচুয়াল রিলেশনশিপ।”

মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়

এইসব নিয়েই কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
তাঁর প্রশ্ন, ‘ছোট্ট একটা বাচ্চার কাছে অভিভাবকদের বিকল্প অ্যালেক্সা হচ্ছেই বা কেন? একটা চার পাঁচ বছরের বাচ্চার তো একটা রোবটের সঙ্গে কথা বলার কথাই ছিল না। একটা শিশুর কাছে একটা মেশিন কেনই বা প্রাথমিক কথা বলার মাধ্যম হবে? আর সেটা যদি হয়, তবে কিন্তু গোড়াতেই অনেকগুলো প্রশ্ন উঠে আসবে।’

হ্যাঁ, প্রশ্নটা উঠছে। প্রশ্নটা একাকীত্বের। একান্নবর্তী পরিবার আজ প্রায় ডাইনোসরের মত অদৃশ্য। কাকিমা, জেঠিমা, কাকা, পিসি অথবা তুতো ভাইদের সঙ্গ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু বদলে যে নিউক্লিয়ার পরিবার গজিয়ে উঠেছে সে পরিবারটুকুই বা কতটুকু পাশে পাচ্ছে শিশুরা? বাবা মায়ের বদলে দিনরাতের সঙ্গী হচ্ছেন ন্যানি বা কেয়ারগিভাররা। ক্রমশ তাঁদেরও সরিয়ে শিশুটির একমাত্র বন্ধু, এ আই।

এই অ্যালেক্সারাই অনেকটা বেবিসিটারের কাজ করছে কোনও কোনও পরিবারে। ঘর, ওয়ার্ক ফ্রম হোম নিয়ে নাজেহাল মা। ব্যস্ত বাড়ির অন্যান্য অভিভাবকরাও। সেই সুযোগে বাচ্চা ঘন্টার পর ঘন্টা আঁঠার মত আটকে থাকছে গুগল হোম, অ্যালেক্সা, সিরিদের সঙ্গে।

‘ইট ক্যাননট বি আ বেবিসিটার’, বললেন অনুত্তমা। অ্যালেক্সা ইজ অ্যান অ্যাক্সেসরি গাইডেড বাই দ্য অ্যাাডাল্টস্। অর্থাৎ পরিবারের কোনও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নজরদারিতে থেকে কিছুটা সময় ছোট বাচ্চারা এটি ব্যবহার করতেই পারে। কিন্তু সেটা কতখানি আর কতক্ষণ এই জায়গাটা বোঝাটা খুবই জরুরি।’

তাঁর মতে, ‘আজকের ব্যস্ত জীবনে অভিভাবকদের নিজেদের কাজকর্ম অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সন্তানের স্বার্থেই তার সঙ্গে কথোপকথন, আদান প্রদানের একটা পরিসর তার মধ্যেই তৈরি করে নিতে হবে বাবা-মাকে।’ বাচ্চার জীবনে গ্যাজেটের ব্যবহার থাকলেও তা নিয়ন্ত্রিত থাকাটা অত্যন্ত প্রয়োজন। আর সেই নিয়ন্ত্রণের রাশ থাকুক পরিবারের বড়দের হাতে।

এইখানে আরও একটা উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। একদম প্রাথমিক যে বয়সটা, চার বা পাঁচ বছর, এই বয়সটা কিন্তু অ্যাটাচমেন্ট অর্থাৎ পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবের প্রতি টান তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অ্যালেক্সা কিন্তু সেই ভালবাসা সেই সাহচর্যটা কোনও ভাবেই তাকে দিতে পারবে না।

‘অ্যালেক্সা আদতে কী’ প্রথমেই বাচ্চাকে সেটা তার মত করে বুঝিয়ে দেওয়াটাও খুব প্রয়োজন। কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে তাকে বোঝাতে হবে, ও কথা বলতে পারে মানেই মা-বাবা-ভাই-বোন অথবা পিসি মাসীদের মত কিন্তু নয়। বরং তাকে ল্যাপটপ, ট্যাব বা ফোনের সঙ্গে শ্রেণীকরণ করাতে শেখাতে হবে।’

‘কোনও বাচ্চা অ্যালেক্সার ওপর অত্যন্ত রেগে গেলে বুঝতে হবে এই রাগটা কিন্তু ওর অ্যালেক্সার ওপর নয়। অনেকটাই ‘আমায় কেন বুঝতে পারছে না’ সেই জায়গা থেকে শুরু হচ্ছে এই ফাস্ট্রেশনটা। এক্ষেত্রেও পরিবারের মানুষদেরই আশ্বাস এবং বিশ্বাসের জায়গাটা তৈরি করতে হবে যাতে বাচ্চার প্রত্যাশা, অভিমান পরিবারের মানুষদের ঘিরে হয়, কোনও রোবটকে ঘিরে নয়।’

‘একটা শিশুর জীবনে অ্যালেক্সা একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠলে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ, মানসিক বিকাশ তার বন্ডিং এই সব কিছুকে আমরা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেব নিজেদের অজান্তেই।’ কারণ যন্ত্র শুধু তাকে কিছু তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারে। কিছু কাজ একটু সহজ করে দিতে পারে। সামাজিক শিক্ষা দিতে পারে না। এই ধরনের অসম বন্ধুত্বের ফাঁক গলেই কিন্তু ঢুকে পড়তে পারে ব্লু হোয়েলের মত আরও ভয়ঙ্কর কিছু।

স্কুলে যাওয়া একটা বাচ্চার সামাজিক বিকাশের জন্য জরুরি। কারণ, সেখানে একটা বাচ্চা শেখে খেলায় কখনও হেরেও যেতে হয়, মিলেমিশে চলতে হয়। মানিয়ে নিতে হয়। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কখনও নিজের প্রিয় জিনিসটুকুও শেয়ার করতে হয়। নিজের পালা আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে হয়। এই প্রজন্মের বাচ্চাদেরও আমাদেরই বোঝাতে হবে অনলাইনে পিৎজা অর্ডার করা আর বন্ধুত্ব চাওয়া দুটো এক জিনিস নয়।

এ প্রসঙ্গে আজকের অভিভাবকদের কাছে মনোবিদ অনুত্তমার প্রশ্ন, ‘ঘরে সন্তানের বদলে একজন চলাফেরা করা গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা অ্যালেস্কা তো কখনও চাননি নিশ্চয়ই আপনারা? একটা অনুভূতিসম্পন্ন সন্তান চেয়েছিলেন। আজ তাকে একটা সফ্টওয়্যারের সঙ্গে সহবাস করতে শেখালে, কাল তার যে প্রভাব পড়বে সেকথা ভেবে দেখেছেন কখনও? সেদিন হয়ত যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা মাকে পাশে ফেলে রেখে সন্তান মুখ গুঁজে থাকবে এমনই কোনও আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্সে!’ 

মনে পড়ে যায় সদ্য নেটফ্লিক্সে দেখা ছবি, ‘হার’। যেখানে একাকীত্বের ঘেরাটোপে থাকা লেখক থিয়োডোর যাবতীয় সম্পর্ককে দূরে সরিয়ে নিজের লেখায় ডুবে থাকতে থাকতে একসময় বন্ধুত্ব করে ফেলেন স্মার্ট, সপ্রতিভ এ আই অপারেটিং সিস্টেম, সামান্থার সঙ্গে। শেষমেষ সেই সামান্থারই প্রেমে পড়ে যান থিয়োডোর। মানুষ, মেশিন, সম্পর্ক, বন্ধুত্ব,ভার্চুয়াল, রিয়্যালিটি, থিয়োডোরের সামনে একটু একটু করে গুলিয়ে যেতে থাকে। ক্রমশ একা আরও একা হয়ে গিয়ে একটা শূন্যের মুখে দাঁড়িয়ে থাকে জীবন।

শিউড়ে উঠছেন তো? এই ধরনের ভয়ের কিছু যাতে না হয়, তাই প্রথম থেকেই একটু সচেতন থাকুন। সতর্ক থাকুন। সন্তান ও অ্যালেক্সার বন্ধুত্বের মাঝে না হলেও, কাছাকাছি কোথাও আপনিও থাকুন। সম্পর্কের বাঁধনগুলো আরও একটু দৃঢ় করুন যাতে কোনও অ্যালেক্সার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে না হয় আপনার সন্তানকে।

ডান-বাম-মধ্যপন্থা নয়, আমরা সোজাসুজি পথেই বিশ্বাসী। সংবাদমাধ্যমকে কুক্ষিগত করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল লগ্নি করছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। আর তার জেরে শিকেয় উঠেছে নির্ভীক, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা। বিপন্ন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। আমজনতাই আমাদের শক্তি। তাই আমরা চাই, আপনিও আমাদের পাশে থাকুন। আপনার সামান্য অনুদানও আমাদের চলার পথে সাহস জোগাতে পারে। kolkatanewstoday@gmail.com

সবাই যা পড়ছেন

করোনায় চিকিৎসকদের পরামর্শ, এই ফোন নম্বরগুলি অবশ্যই সঙ্গে রাখুন

দেশে করোনা সংক্রমণ দিন দিন ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে। ইতিমধ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে।কোনওরকম সমস্যা হলে, ফোনে বিনাখরচে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিন। এখানে...

আরও ভয়াবহ! দেশে একদিনে আক্রান্ত ২ লক্ষ ৬১ হাজার, মৃত ১৫০১

দেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৬১ হাজার ৫০০। এ...

বাংলায় দৈনিক আক্রান্ত ৮ হাজারের পথে, মৃত ৩৪, তবু ভোটপ্রচারে লাগাম নেই

নির্বাচনী প্রচারের মধ্যেই রাজ্যে দৈনিক করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এবার প্রায় ৮ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। সেইসঙ্গে সক্রিয় করোনা রোগীর সংখ্যা ৪৫ হাজার...

বাংলায় করোনা ছড়ালে, দায় নিতে হবে মোদী-বিজেপিকে : মমতা

দেশে করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কাঠগড়ায় তুললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয়তার জন্যই দেশে ব্যাপক হারে ছড়াচ্ছে করোনা।...

শীতলখুচিকাণ্ডে মমতার অডিও টেপ ফাঁস বিজেপির, ভুয়ো বলল তৃণমূল

পঞ্চম দফার ভোটের আগের দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরও একটা অডিও ক্লিপ প্রকাশ্যে আনল বিজেপি, যা নিয়ে ফের তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। যদিও এই...