হোম আজকের সেরা খবর CRIME REPORTER : কাগজে মোড়া গর্ভবতী মহিলার টুকরো টুকরো দেহ

CRIME REPORTER : কাগজে মোড়া গর্ভবতী মহিলার টুকরো টুকরো দেহ

(CRIME REPORTER: এই পর্বে শোনানো  হবে নানান অপরাধ কাহিনী। বিভিন্ন রহস্যজনক ঘটনার নেপথ্য কাহিনী। বিখ্যাত গোয়েন্দা এজেন্সিগুলোর তদন্তের রোমহর্ষক গল্প। বিভিন্ন দেশের গুপ্তচর সংস্থাগুলোর গোপনে খবর সংগ্রহের গল্প আড্ডার মত করে উঠে আসবে বিশিষ্ট সাংবাদিক হীরক কর -এর কলমে।)

হীরক কর : ঘটনাটা বহু বছর আগের। ১৯৫৪ সালের ৩০ জনুয়ারি। সাত সকালে কলকাতার কালীঘাটের উদ্বাস্তু কলোনিতে সবে একটা নতুন দিনের সূচনা হচ্ছে। সকাল হলেও উদ্বাস্তু কলোনিতে যথেষ্ট ভিড়। সেই সময় সকাল সকাল কলকাতা পুরসভার ঝাড়ুদাররা রাস্তা পরিষ্কার করতেন। ভিস্তিওয়ালারা জল দিয়ে রাস্তা ধুয়ে দিয়ে যেতেন। তাঁরা সবসময়ই চাইতেন বাজারের ভিড় বাড়ার আগে তাঁদের কাজ শেষ করতে। ৩০শে জানুয়ারি সকালে তাঁরা সেই ভাবেই দ্রুত কাজ করছিলেন। এই সময় কেওড়াতলা শ্মশান ঘাটের গেটের সামনে এক সাফাই কর্মী দেখেন, খবরের কাগজে মোড়া তিনটে বড় বড় প্যাকেট পড়ে রয়েছে। ওই প্যাকেটগুলো সাধারণ জঞ্জালের থেকে কিছুটা তফাতে আলাদাভাবে পড়ে আছে। ওই ঝাড়ুদারের সন্দেহ হলে, ঝাড়ুর ডান্ডা দিয়ে তিনি ওই প্যাকেটগুলো একটু নেড়েচেড়ে দেখেন। উনি বোঝার চেষ্টা করেন খবরের কাগজে মোড়া প্যাকেটগুলোতে কি জিনিস আছে?

ঝাড়ুর ডান্ডা দিয়ে প্যাকেট উল্টে দেখে নিজেই ঘাবড়ে যান। প্যাকেটের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে মানুষের আঙুল। রক্তের চিহ্নও চোখে পড়ে। তৎক্ষণাৎ পুরো এলাকায় ভিড় জমে যায়। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। কলকাতা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।

খবরের কাগজের প্যাকেট খুলে পুলিশ দেখে, তার ভিতরে রয়েছে কোন মহিলার পায়ের অংশ, বাঁ হাতের টুকরো। সেগুলো একটা নারকেলের দড়ি দিয়ে টাইট করে বাঁধা ছিল।

খবরের কাগজগুলো ২১ শে নভেম্বরের যুগান্তর পত্রিকার। পুলিশ খবরের কাগজগুলো বাজেয়াপ্ত করে। ‌ আর নারী দেহের অংশগুলো পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠিয়ে দেয়। কিছু সময় যেতে না যেতেই কালীঘাট পার্কের একটি গাছের নিচে দারোয়ানের নজর পড়ে। তিনি দেখেন কালীঘাট শ্মশানে গেটের সামনে সকালে যে ধরনের প্যাকেট পাওয়া গিয়েছিল, একই ধরনের প্যাকেট কালীঘাট পার্কের গাছের তলায় পড়ে রয়েছে। প্যাকেট খুলে দেখা যায়, মহিলার হাত-পায়ের সঙ্গে মাথাও খবরের কাগজের মোড়কে। কিন্তু খুনি মুখটা এমনভাবে থেঁতলে দিয়েছে যে, চেনাই যাচ্ছে না। মুখ থেকে চামড়া তুলে মাংস বের করে দেওয়া হয়েছিল। টিকরে বেরিয়ে আসছিল চোখ। সে এক বীভৎস দৃশ্য।

খবরের কাগজগুলো ছিল ২১ নভেম্বর ১৯৫৩, ৫ জানুয়ারি এবং ১০ জনুয়ারি ১৯৫৪-র যুগান্তরের। কালীঘাট পার্কে যে খবরের কাগজের মোড়কগুলো মেলে, তাতে একটা পূর্ণবিকশিত বাচ্চার ভ্রূণও পাওয়া যায়। পুলিশ বুঝতে পারে, একজন গর্ভবতী মহিলাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করার পর তাকে টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। খুন হওয়ার পর মহিলার পেটে থাকা ভ্রূণও বের করে পার্কের গাছের তলায় ফেলা হয়েছে।

তৎকালীন কলকাতার পুলিশ কমিশনার এই ঘটনার তদন্ত করার জন্য গোয়েন্দা বিভাগের হোমিসাইড শাখাকে নির্দেশ দেন। তদন্তকারী অফিসার হন কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড শাখার ইন্সপেক্টর সমরেন্দ্র নাথ ঘোষ।

উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের টুকরোগুলোর পোস্টমর্টেম হয় ৩১ শে জানুয়ারি। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে দেখা যায় মৃতদেহে এন্টিমর্টম এবং পোস্টমর্টম দুই ধরনেরই আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। খুনের পর মৃতদেহ সরিয়ে ফেলার জন্য ধারালো অস্ত্র দিয়ে লাশকে টুকরো টুকরো করেছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা তাঁদের অবজারভেশনে বলেন, মৃত্যুর পূর্বে এবং মৃত্যুর পরেও ওই মৃত দেহে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। যে মহিলাকে হত্যা করা হয়েছে সেই মহিলার পায়ের পাতা সাধারণ মহিলাদের থেকে বড়। মহিলার বাঁ পায়ের উরুতে একটা গভীর কাট মার্ক ছিল। যেটা হত্যা করার সময় আঘাতের চিহ্ন নয়, বরং সেই চিহ্ন ছিল বহু পুরনো।

পুলিশ ওই মহিলার খোঁজে কালীঘাট এলাকায় তল্লাশি চালাতে থাকে। লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। কিন্তু কোন “ক্লু” মেলে না। ওই সময় ওই এলাকায় বিভিন্ন নিখোঁজ মহিলাদের সম্পর্কেও পুলিশ খোঁজখবর করা শুরু করে। কিন্তু খুন হওয়া মহিলার সঙ্গে নিখোঁজ হওয়া অন্য মহিলাদের ডিটেলস ম্যাচ করছিল না। 

কিছু উপায় না পেয়ে পুলিশ এক প্লাস্টিক সার্জেনের সাহায্য নেয়। ‌ মহিলার মুখ থেকে যে চামড়া তুলে নেওয়া হয়েছিল প্লাস্টিক সার্জেন সেটাকে পুনর্নির্মাণ করেন। বিখ্যাত প্লাস্টিক সার্জনে ডাক্তার মুরারী মোহন মুখার্জি ওই মহিলার মুখ মন্ডল নতুন করে তৈরি করেন। পুলিশ ওই মুখের কিছু ছবি তোলে। এবং দৈনিক সংবাদপত্রে তা ছাপার ব্যবস্থা করে। যে যুগান্তর কাগজে মুড়ে মৃতদেহ টুকরোগুলো ফেলা হয়েছিল, সেই যুগান্তরেও ওই ছবি ছাপা হয়। কিন্তু এতেও পুলিশের সাফল্য মেলেনি।

এই ঘটনার এক মাস পার হয়ে যায়। তদন্তকারী অফিসার সমরেন্দ্র নাথ ঘোষ আস্তে আস্তে নিরাশ হয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু তিনি সহজে পরাজয় স্বীকার করে নেওয়ার মতো মানুষ ছিলেন না। ‌২৫ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে নটা নাগাদ সমরেন্দ্রনাথবাবু লালবাজারের নিজের অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িতে বাড়ি যাচ্ছিলেন। সেদিন তার গায়ে একটু জ্বর ছিল। লাগাতার কাশ ছিলেন। উনি যাচ্ছিলেন রসা রোড দিয়ে। সেখানে দুটো ওষুধের দোকান ছিল। একটির মালিক দোকান বন্ধ করছিলেন। সমরেন্দ্র বাবুর হঠাৎ মনে হয় গাড়ি থেকে নেমে একটু কাশির ওষুধ নিয়ে নেওয়া যাক। একটি দোকান রয়্যাল মেডিক্যাল ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। ‌ দ্বিতীয় দোকান সাউথ ক্যালকাটা ফার্মেসিতে দোকান বন্ধ করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। তিনি সাউথ ক্যালকাটা ফার্মেসিতে গিয়ে দোকানদারকে বলেন, একটা কাফ সিরাপ দিতে। ‌প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে। 

দোকানদার বলেন, একটু দাঁড়ান, দিচ্ছি। একটু খুঁজে দেখি। ‌ দোকানদার যখন বলেন, খুঁজে দেখি তখন সমরেন্দ্র বাবুর মনে হয়, এ কেমন দোকান কাফ সিরাপের মত মামুলি ওষুধ খুঁজতে সময় লাগে ! তখন তিনি লক্ষ্য করেন দোকানে বেশি স্টক নেই। বেশি বেশিরভাগ তাক খালি পড়ে আছে। কিছু কিছু ওষুধ শুধু পড়ে আছে। দোকানদার বলেন, কিছু মনে করবেন না আমার কাছে কাফ সিরাপ নেই। সমরেন্দ্র বাবু একটু ক্ষুব্ধ হন। বলেন এই দোকানের মালিক কে ? কাফ সিরাপের মত একটা মামুলি ওষুধ রাখতে পারে না। দোকানদার বলে আমি এই দোকানের মালিক নই। সামান্য কর্মচারী মাত্র।‌ দোকান বীরেন দত্ত নামে এক ব্যক্তির । তিনি রোজই এই দোকানে আসা যাওয়া করেন। ‌কেন জানি না গত একমাস ধরে তিনি একবারের জন্যও এই দোকানে আসেননি। তাঁকে ফোন করে আমি কাজ চালিয়ে নিচ্ছি। ‌ কিন্তু দোকানের মালিক যেহেতু আসছেন না, তাই  রেগুলার সব ধরনের ওষুধ পেতে অসুবিধা হচ্ছে। দোকানে বিক্রিও কমে যাচ্ছে। আপনি দেখতেই পাচ্ছেন দোকানে ওষুধের স্টক কম। দোকান ভালো চলছে না।

সমরেন্দ্র বাবু ওই কর্মচারীর কাছ থেকে সবটা শোনেন এবং গাড়িতে বসে পড়েন। তার মনে হতে থাকে, দোকানের মালিক কেন এক মাস ধরে তার ব্যবসা দেখতে আসছেন না? হঠাৎ তাঁর মনে খটকা লাগে। মনে হয় এই দোকানের মালিক কে, সেটা একটু খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি গাড়ির ড্রাইভারকে বলেন, এক কাজ করো, দোকানে যাও, ওই দোকানের মালিক বীরেন দত্তর ঠিকানাটা জেনে এসো।

ড্রাইভার ওষুধের দোকানটিতে গেলে কর্মচারী জানান বীরেন দত্তের ঠিকানা, ৫৫/৪/২ ড্রাফ রোডে থাকেন। কর্মচারী ঠিকানাটা একটা কাগজে লিখে দেন। ড্রাইভার এসে সেটা সমরেন্দ্রনাথ ঘোষকে দেন। পরদিন সমরেন্দ্র বাবু পুলিশ পাঠিয়ে দেখেন আদৌ ড্রাফ রোডে বীরেন দত্ত থাকেন কিনা। পুলিশ সেখানে পৌঁছে জানতে পারে, ওই ঠিকানায় বীরেন দত্ত থাকেন। কিন্তু, এক মাস ধরে বীরেন দত্ত পুরো পরিবারের সঙ্গে উধাও। পুলিশ প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। প্রতিবেশীরা জানান, ওনার পরিবার বলতে আছে স্ত্রী বেলা রানি দত্ত। আর আছে পাঁচ-ছয় বছরের তাদের একটি পুত্র। তাঁরা তাকে বটম বলে ডাকেন। ‌ প্রতিবেশীরা আরও বলেন বীরেন দত্ত ৩০ শে জানুয়ারি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। বলে গেছিলেন, আমার স্ত্রী গর্ভবতী। তাই আমি তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে নিয়ে যাচ্ছি।  কিন্তু এরপর বীরেনের  সঙ্গে দেখা হলে তিনি বলেছিলেন, আমার স্ত্রী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আমি খুব তাড়াতাড়ি তাঁকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসব।

কিন্তু প্রায় এক মাস ধরে বীরেন দত্ত তার স্ত্রী বেলারানি দত্ত বা তাদের ছোট বাচ্চা কাউকেই প্রতিবেশীরা দেখেন নি । প্রায় এক মাস ধরে পুরো পরিবারটা নিখোঁজ ছিল। পুলিশ বীরেন দত্তর সমস্ত ইতিহাস খুঁজে বার করার চেষ্টা করে। ‌ পুলিশ জানতে পারে ড্রাফ রোডের পাশে হরিশ মুখার্জি রোডেও বীরেন দত্তের একটি বাড়ি আছে। ‌ ওই বাড়িতে বীরেন দত্তের এখনো যাতায়াত আছে। পুলিশ যখন বীরেনের  দ্বিতীয় বাড়ি সম্পর্কে জানতে পারে, তখন পুলিশের একটা টিম ২৭ ফেব্রুয়ারি সাতসকালে হরিশ মুখার্জি রোডের ওই বাড়ির সামনে নজরদারি শুরু করে। বীরেন দত্ত সকালে বাড়ি থেকে বেরোতেই পুলিশ তাকে ধরে ফেলে। ‌ পুলিশ যথারীতি জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পুলিশ বলে আপনার বাড়িতে কে কে আছে? জবাবে বীরেন  জানান, তাঁর স্ত্রী এবং একটি কন্যা আছে। স্ত্রীর নাম মীরা। তখন পুলিশ বলে ড্রাফ রোডে যে বীরেন দত্ত থাকেন তার স্ত্রীর নাম কি ? তিনিই বা‌ কে ? এটা শুনেই বীরেন দত্তর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়।  এরপর তিনি পুলিশকে নানারকম গল্প বলতে শুরু করেন। অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন। ‌ কিন্তু পুলিশের চাপের মুখে পড়ে একসময় তাকে ভেঙে পড়তে হয়। তিনি স্বীকার করেন যে উনিই বেলা রানি দত্তকে খুন করেছেন। হত্যা ড্রাফ রোডের বাড়িতেই করেছেন। কিন্তু কেন ? তাও আবার নিজের গর্ভবতী স্ত্রীকে ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে। ‌ বীরেন দত্তের বাবা কলকাতা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ছিলেন। ‌ ওরা বজবজের বাসিন্দা। খুব ছোটবেলায় ওর বাবার মৃত্যু হয়। কিছুদিন আগে তার মা মারা যান।  বীরেনের দুই বড় দিদিও ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিয়েও হয়ে যায়।  মা- বাবার মৃত্যুর পর বীরেন যেহেতু একলা হয়ে গিয়েছিলেন, তাই আত্মীয়-স্বজনরা তার দেখাশোনা করতেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে তিনি বসবাস করেছেন। কিন্তু এক সময় বীরেনের এক দূর সম্পর্কের ভাই তাকে বজবজ থেকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। রসা রোডে সাউথ ক্যালকাটা ফার্মেসি নামে দোকানটিও কিনে দেন। এখনো যেটার মালিক বীরেন। তিনি সেটা চালান।

একটা সময় বীরেন এক দূরসম্পর্কের দাদা নবনীর বাড়িতে থাকছিলেন। সেই সময় নবনীর মেয়ের সঙ্গে তার “মহব্বত” হয়ে যায়। কিন্তু সমাজের সম্পর্কের দিক থেকে দেখতে গেলে বীরেন কাকা হয়ে ভাইজির প্রেমে পড়েছিলেন। ফলে নবনী এবং তাঁর স্ত্রী বীরেনের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের ধারণা হয়েছিল, বীরেন যাঁকে  আশ্রয় দিয়েছেন, সে-ই তাদের ধোঁকা দিয়েছে। ‌ নবনীর মেয়ে এবং বীরেন কেউ কাউকেই ছাড়তে রাজি ছিলেন না। একদিন নবনীর মেয়ে কমলাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বীরেন পালিয়ে যান। এবং নিজের ভাইজিকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর বীরেন কমলার নতুন নাম দেন বেলারানি। ‌ শেষ পর্যন্ত ড্রাফ রোডে ঘর ভাড়া করে কাকা ভাইঝিতে সংসার করতে থাকেন।  একসময় নবনী এবং তার স্ত্রী বিষয়টা মেনে নেন।

কমলা ওরফে বেলারানি দত্তর সঙ্গে বিয়ের পরে বীরেনের একটি ছেলেও  হয়। বীরেনের  ছেলের যখন বয়স ৫, তখন তার জীবনে এলো আরেক নারী। নাম মীরা। ‌ মীরা বীরেনের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়। তাকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে থাকে। বীরেন মীরাকে যেমন বেলারানি দত্ত সম্পর্কে কিছু বলেনি, তেমন বেলারানিকেও মীরা সম্বন্ধে কিছু জানায়নি।একসময় বীরেন মীরাকে একটি ঘর ভাড়া করে দেয়। সেই ভাড়া বাড়ি ছিল হরিশ মুখার্জি রোডে। সে দুই মহিলার সঙ্গেই সম্পর্ক চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু দু-দুটো পরিবারের ভরণপোষণ করতে গিয়ে বীরেনের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়ে। একটা ওষুধের দোকান থেকে দুটো পরিবারের সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বীরেন আস্তে আস্তে খিটখিটে হয়ে পড়ে।

শেষ পর্যন্ত এই কাহিনীতে একটা মোড় আসে যখন বেলারানি বীরেনকে বলে, সে দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হয়েছে। একথা শুনেই বীরেনের মাথাটা ঘুরে যায়। ইতিমধ্যে সে দুটো সংসার চালনা করে সন্তানের প্রতিপালন করতে পারছিল না।  তখন তার মনে হয়, বেলারানির আবার যদি বাচ্চা হয়, তাহলে খরচ সামলাবেন কী করে ? তখন বেলা রানির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবে বলে বীরেন মিথ্যে অভিযোগ করে। ‌ বলে, তোমার এই সন্তান আমার নয়। তোমার সঙ্গে অন্য কোন লোকের সম্পর্ক আছে। তুমি এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। 

এরপর থেকে বীরেন আর বেলা রানির মধ্যে ঝগড়া মারামারি লেগেই থাকত। শেষ পর্যন্ত বীরেন সিদ্ধান্ত নেয়, বেলা রানিকে  পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে । কিন্তু, চিন্তা করে বেলা রানী মারা গেলে তাদের পাঁচ বছরের বাচ্চাকে বীরেন রাখবে কোথায় ? সেটা নিয়ে একটা পরিকল্পনা করে রাখে বীরেন। ‌ মীরাকে গিয়ে বলে আমার এক বন্ধু এবং তার স্ত্রীর পথদুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের একটি বছর পাঁচেকের ছেলে আছে। সে অনাথ হয়ে গেছে। তুমি কি ওই ছোট্ট বাচ্চাটাকে মানুষ করতে পারবে ? ইমোশনাল মীরা বীরেনের মিথ্যে গল্প শুনে বিষয়টা মেনে নেয়। তিনি বলেন হ্যাঁ, আমি বাচ্চাটাকে মানুষ করব। তুমি ওকে সময়মতো নিয়ে এসো।

তখন বীরেনের মনে হয়, বেলা রানির মৃত্যু হলেও তার ছেলে মা হারাবে না। তাঁর নতুন মা হবে মীরা। ছেলে মাথার ওপর ছাদ ফিরে পাবে।  এরপর ২৭ জানুয়ারি রাত দশটা সাড়ে দশটার সময় ওষুধের দোকান থেকে ড্রাফ রোডের ভাড়া বাড়িতে আসে।  ৯ মাসের গর্ভবতী বেলা রানি দত্ত নিজের স্বামীকে রাতের খাবার দেন। সে সময় ছেলে পাশের ঘরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ বীরেন সব্জি কাটার বঁটি দিয়ে বেলা রানির ওপর হামলা করে। বঁটি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে। বীভৎসভাবে নিজের গর্ভবতী স্ত্রীকে নিজের ঘরের মধ্যেই টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে।

সকালে উঠে ছেলেকে বীরেন বলে, আমি তোমার মাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে এসেছি। এবার তুমি মাকে দেখবে চলো।  বলে তাকে এক প্রতিবেশীর ঘরে রেখে আসে। প্রতিবেশীদের বলে, আমার স্ত্রীর গর্ভ যন্ত্রণা শুরু হয়েছে ছেলেকে দু-এক দিনের জন্য রাখতে পারবেন। ওই প্রতিবেশী রাজি হয়ে যান।

২৭ তারিখ নিজের স্ত্রীকে হত্যা করার পর ছেলেকে প্রতিবেশীদের কাছে রেখে দিয়ে চলে যায় নিজের ওষুধের দোকানে। সারাদিন ধরে চিন্তা করে লাশটাকে কি করে লুকিয়ে রাখবে। রাতে সে দোকান থেকে কয়েকটা খবরে কাগজ নিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘরে গিয়ে বেলারানীর লাশ টুকরো টুকরো করে। নারকেল দড়ি দিয়ে ওই শরীরের অংশ গুলো বাঁধে। এবং খবরের কাগজ দিয়ে সেগুলো মুড়ে ফেলে। সেই প্যাকেটগুলো নিয়ে একটা রিক্সা করে কেওড়াতলা শ্মশান এবং কালীঘাট পার্কে যায়। বিভিন্ন জায়গায় এই রিকশাওয়ালাকে দাঁড় করিয়ে রেখে একটু আসছি বলে প্যাকেটগুলো ফেলে আসে। এটা সে করে ২৯ এবং ৩০ জানুয়ারির  মধ্য রাতে। আর ৩০ জানুয়ারি সকালে ওই প্যাকেটগুলোর  ওপর লোকজনের নজর পড়ে। তারপর পুলিশ আছে। এরপর তদন্ত যেভাবে এগোয়, তা আমাদের সকলেরই এখন জানা।

পোস্টমর্টেম করার সময় ডাক্তাররা বলেছিলেন যে, মহিলার মৃতদেহের অংশ পাওয়া গেছে তার পায়ের পাতা সাধারণ মহিলাদের থেকে অনেক বেশি বড়। আরও  বলেছিলেন মৃত মহিলার বা উরুতে একটা কাট মার্ক আছে। বীরেনের গ্রেফতারের পর পুলিশ বেলারানী দত্তের মা-বাবা নবনী এবং তাঁর স্ত্রীকেও ডেকে পাঠায় । পুলিশ দেখে বেলারানী দত্তের মায়ের পাও সাধারণ মহিলার থেকে অনেক বেশি বড়।  মা-মেয়েকে সনাক্ত করেন। মায়ের পায়ের পাতা এবং মেয়ের পায়ের পাতা ম্যানুয়ালি মিলিয়ে দেখা যায় এক।‌ কোর্টে সাক্ষী দেওয়ার সময় কমলা ওরফে বেলারানী দত্তের মা বলেন, আমার মেয়ে ছোটবেলায় খেলতে খেলতে পড়ে যায়। তাতে বা উরুতে একটা গভীর কাট মার্ক হয়ে যায়। ফলে আদালতে প্রমাণ হয়ে যায়, বেলা রানি দত্তকে খুন করেছে বীরেন।

আপনাদের মনে থাকার কথা, ২১ নভেম্বর,১৯৫৩, ১০ জানুয়ারি, ১৯৫৪, ২৫ এবং ২৬ জানুয়ারির খবরের কাগজে লাশ‌ মুড়ে রাখা হয়ে ছিল। নভেম্বর থেকে জানুয়ারির সমস্ত খবরের কাগজ থ্যাকে থাকে জমানো ছিল বীরেনের দোকানে। তার থেকেই খবরের কাগজ বের করে নিয়ে স্ত্রীর লাশ মুড়ে ছিল বীরেন।

শেষ পর্যন্ত নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট হয়ে বীরেন দত্তের ফাঁসির সাজা হয়। এবং বীরেন দত্তকে ১৯৫৬ সালের ২৮ শে জানুয়ারি ফাঁসি দিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালে মোবাইল ট্র্যাকার, সিসিটিভি ফুটেজ ছিল না।‌ ছিল না ডিএনএ টেস্টের ব্যবস্থাও।‌ তবু সে যুগে একদম অন্ধকার থেকে মাত্র এক মাসের মধ্যে যে ভাবে কাটা হাত-পা রহস্যের সমাধান করেছিল কলকাতা পুলিশ, তা অতুলনীয়। সে দিন যদি কাফ সিরাপের খোঁজে লালবাজারের ইন্সপেক্টর সমরেন্দ্র নাথ ঘোষ সাউথ ক্যালকাটা ফার্মেসিতে না যেতেন, তাহলে বেলা রানি মার্ডার কেসের সুরাহাও  হত না।

ডান-বাম-মধ্যপন্থা নয়, আমরা সোজাসুজি পথেই বিশ্বাসী। সংবাদমাধ্যমকে কুক্ষিগত করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল লগ্নি করছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। আর তার জেরে শিকেয় উঠেছে নির্ভীক, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা। বিপন্ন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। আমজনতাই আমাদের শক্তি। তাই আমরা চাই, আপনিও আমাদের পাশে থাকুন। আপনার সামান্য অনুদানও আমাদের চলার পথে সাহস জোগাতে পারে। kolkatanewstoday@gmail.com

সবাই যা পড়ছেন

করোনায় চিকিৎসকদের পরামর্শ, এই ফোন নম্বরগুলি অবশ্যই সঙ্গে রাখুন

দেশে করোনা সংক্রমণ দিন দিন ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে। ইতিমধ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে।কোনওরকম সমস্যা হলে, ফোনে বিনাখরচে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিন। এখানে...

আরও ভয়াবহ! দেশে একদিনে আক্রান্ত ২ লক্ষ ৬১ হাজার, মৃত ১৫০১

দেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৬১ হাজার ৫০০। এ...

বাংলায় দৈনিক আক্রান্ত ৮ হাজারের পথে, মৃত ৩৪, তবু ভোটপ্রচারে লাগাম নেই

নির্বাচনী প্রচারের মধ্যেই রাজ্যে দৈনিক করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এবার প্রায় ৮ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। সেইসঙ্গে সক্রিয় করোনা রোগীর সংখ্যা ৪৫ হাজার...

বাংলায় করোনা ছড়ালে, দায় নিতে হবে মোদী-বিজেপিকে : মমতা

দেশে করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কাঠগড়ায় তুললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয়তার জন্যই দেশে ব্যাপক হারে ছড়াচ্ছে করোনা।...

শীতলখুচিকাণ্ডে মমতার অডিও টেপ ফাঁস বিজেপির, ভুয়ো বলল তৃণমূল

পঞ্চম দফার ভোটের আগের দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরও একটা অডিও ক্লিপ প্রকাশ্যে আনল বিজেপি, যা নিয়ে ফের তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। যদিও এই...