হোম আন্তর্জাতিক CRIME REPORTER : করোনার আতঙ্কে এখনও ঘরবন্দি দাউদ ইব্রাহিম

CRIME REPORTER : করোনার আতঙ্কে এখনও ঘরবন্দি দাউদ ইব্রাহিম

(CRIME REPORTER : এই পর্বে শোনানো হবে নানান অপরাধ কাহিনী। বিভিন্ন রহস্যজনক ঘটনার নেপথ্য কাহিনী। বিখ্যাত গোয়েন্দা এজেন্সিগুলোর তদন্তের রোমহর্ষক গল্প। বিভিন্ন দেশের গুপ্তচর সংস্থাগুলোর গোপনে খবর সংগ্রহের গল্প আড্ডার মত করে উঠে আসবে বিশিষ্ট সাংবাদিক হীরক কর -এর কলমে।)

হীরক কর : ২০২০ সালের প্রায় পুরো সময়টাই  লকডাউনে ফেঁসে ছিল সারা পৃথিবী। লকডাউনে বন্ধ ঘরে চলছিল মানুষের জীবনযাত্রা। বিশ্বে এমন কোনও সেক্টর বা জীবিকা ছিল না, যেখানে করোনার থাবার আঁচ পড়েনি। এই পরিস্থিতিতে আন্ডারওয়ার্ল্ডই কীভাবে থাকবে করোনা হানার বাইরে ?

ঠিক এই সময়, গত মার্চ মাসে মুম্বাইয়ে এক প্রোমোটারের কাছে এক আন্ডারওয়ার্ল্ড ‘ডন’- এর ফোন কল আসে। প্রোমোটারকে হুমকি দিয়ে ডন বলে, আমাকে পাঁচ কোটি টাকা দাও। সাধারণ দিন হলে ওই প্রোমোটার এই তোলাবাজি নিয়ে ডনের সঙ্গে দরদাম করতেন। পাঁচ কোটি টাকার অংকটা কমাবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু লকডাউনের পরিস্থিতিতে তার অবস্থা বেশ খারাপ ছিল। তাই তিনি সরাসরি বলে দেন, “আমি এক পয়সাও দিতে পারব না। তোমরা যা পারো করে নাও। কারণ, করোনা আক্রমণে আতঙ্কিত দেশ। ব্যবসা বন্ধ। লকডাউন শুরু হয়ে গেছে। হালচাল খারাপ। নিজেই বাঁচবো কি বাঁচবো না, তার ঠিক নেই। তার ওপর আপনি ৫ কোটি টাকা চাইছেন। আমার কাছে এক কোটি টাকাও নেই। আগামী দিন আরও খারাপ হবে। তাই আপনি যা করতে পারেন করুন। আমি টাকা দিতে পারবো না।”

প্রোমোটারের এই বক্তব্য শোনার পর মোবাইল ফোনের ওপার থেকে কোন জবাব আসে না। কিছুক্ষণ মোবাইল তরঙ্গের শূন্যতা থাকে। হঠাৎই ওই ডন বলে, হ্যাঁ আমি বিষয়টা বুঝতে পারছি। এই সমস্যার মধ্যে আমিও পড়েছি। আচমকা ফোন কেটে যায়। এরপর ওই প্রোমোটারের কাছে আর কোনও ফোন আসেনি। মোবাইল কলারের নাম আনিস ইব্রাহিম। দাউদের ভাই।

করোনার থাবা কোথায় কোথায় পড়েছিল, এটা তার ঝলক। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের জগতেও করোনার প্রভাব পড়েছিল। ২০২০ সালের ১৫ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল, প্রায় ২৫ দিনের পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায়। ২০১৯, ২০১৮, ২০১৭তে যা অপরাধ হতো, তার থেকে গত বছর ভারতের সব মেট্রো শহরেই ক্রাইমের গ্রাফ নিচের দিকে চলে গিয়েছিল। দিল্লিতে যেখানে তিন-চারটে খুন হত, দুই-একটা ধর্ষণের ঘটনা ঘটতো, চুরি-ডাকাতি রুখতে গিয়ে পুলিশ পরিশ্রান্ত হয়ে পড়তো। ক্রাইমের গ্রাফ আচমকা পড়ে যায়। পথ দুর্ঘটনা, খুন কমে গিয়েছিল। ওই সময় সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা একটাও ঘটেনি। গাড়ি চুরি হয়নি বললেই চলে। এর কারণ সব মানুষই নিজের আপন আপন পরিবারের সঙ্গে ঘরে ছিলেন। যারা ক্রিমিনাল, তারাও করোনার ভয়ে ঘর থেকে বের হয়নি। কারণ, সরকার বারবার সামাজিক দূরত্বের কথা প্রচার করে গেছে। বায়ুদূষণও কমে গিয়েছিল। আকাশ ছিল পরিষ্কার। তাই, কাঞ্চনজঙ্ঘা শুধু দার্জিলিং বা গ্যাংটক নয়, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, এমনকি রায়গঞ্জ এমনকি  ইসলামপুর থেকেও দেখা গিয়েছিল।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের কারবার লকডাউন স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ফোন করে হুমকি দিয়ে তোলাবাজি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফোন করে পয়সা উসুল করতে চাইলেও সেই টাকা কোথায় কীভাবে পৌঁছনো যাবে, লকডাউনের মধ্যে তা ভেবে পাচ্ছিলেন না ক্রাইম জগতের বাদশারা। কারোই ব্যবসা চলছিল না। তাই আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনেরা চুপ হয়ে গিয়েছিল।

২০২০-র জানুয়ারি মাসে এক আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ইজাদ লকরওয়ালাকে পাটনা থেকে গ্রেফতার করা হয়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে তাকে জবরদস্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে রবি পূজারি নামে এক আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনকে সেনেগাল থেকে নিয়ে আসা হয়। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুম্বই, দিল্লি সহ বিভিন্ন শহরের বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে তোলাবাজি করে  মোটা রকমের টাকা চেয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনদের ফোন কল আসতো। কিন্তু মার্চের পর থেকেই সমস্ত রকম ফোন কল বন্ধ হয়ে যায়।  ইজাদ লকরওয়ালা, রবি পূজারি, প্রসাদ পূজারি, সুদেশ পূজারি, হুমকি দিয়ে ফোন কল করতো। এই সময়টাতেই তারা চুপ হয়ে যায়। আনিস ইব্রাহিম, ছোটা শাকিল, ‘ডি’ কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। ভারতের বাইরে থেকে এদের হুমকি ফোন আসতো। তারাও ফোন করা বন্ধ করে দেয়।

এই সময় খবর ছড়িয়ে পড়ে, করোনায় মৃত্যু হয়েছে ১৯৯৩-এর মুম্বইয়ের ধারাবাহিক বিস্ফোরণের মূল অভিযুক্ত দাউদ ইব্রাহিমের!  শোনা যায়, করোনায় আক্রান্ত হয়ে সস্ত্রীক দাউদ করাচির সেনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একই সঙ্গে দাউদের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী এবং কয়েকজন কর্মীও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে শোনা যায়।  আরও এক ধাপ এগিয়ে দাউদ ইব্রাহিমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে নেট দুনিয়ায়!

২০১৭ সালের এপ্রিল নাগাদ খবর ছড়ায়, দাউদ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। অবস্থা আশঙ্কাজনক! কিন্তু সে সময় দাউদ ঘনিষ্ঠ ছোটা শাকিল দাবি করেছিল, সুস্থ রয়েছে দাউদ! খবর ভিত্তিহীন। এ বারেও অবশ্য দাউদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে তার ভাই আনিস ইব্রাহিম। 

শুধু ভারতেরই নয় বিশ্বেও মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় নাম রয়েছে দাউদের। কুখ্যাত ডনকে আশ্রয় দিয়েছে পাকিস্তান। পাক প্রশাসনের একটি সূত্র জানাচ্ছে, গত জুন মাসে দাউদ ও তার স্ত্রীর চিকিৎসা চলেছে করাচির সেনা হাসপাতালে। যদিও অন্য একটি সূত্র পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে উদ্ধৃত করে বলছে, ওই দম্পতিকে সেনা হাসপাতালেই কোয়ারেন্টাইনে রাখা  হয়েছিল। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টেও এই খবরের সত্যতা স্বীকার করা হয়েছিল।

দাবি করা হয়, মুম্বই অন্ধকার জগতের একদা ‘বেতাজ বাদশা’ দাউদ সস্ত্রীক করাচির সেনা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। কোভিড-১৯ টেস্ট রিপোর্ট পজিটিভ আসার পরেই তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। দাউদের অন্ধকার জগতের ব্যবসা সামলানোর দায়িত্ব এখন আনিসেরই হাতে। গোপন অবস্থান থেকে ফোনে আনিস জানিয়েছিল, করোনা ভাইরাস মহামারীর আকার নিলেও দাউদ ইব্রাহিম ও তাঁর গোটা পরিবার সুস্থই রয়েছেন। যদিও এতে দাউদের করোনা আতঙ্ক আরও বেড়েছে । পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দাউদের করাচিতে অবস্থান অস্বীকার করলেও এই সেনা হাসপাতালে ভর্তি প্রমাণ করে দেয় দাউদ আছে পাকিস্তানেই।

খবর হলো, দাউদ ইব্রাহিম খোদ করাচিতে আছে। ‌ এক ধরনের আইসোলেশনে। ওর কারবার সারা পৃথিবীর এক ডজন দেশে ছড়িয়ে আছে। তাই তাকে রোজ মিটিং করতে হতো। তার কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সামনাসামনি বসে ব্যবসার আলাপ-আলোচনা সারতে হতো। কিন্তু যেই পাকিস্থানে করোনা হানা দিল, সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান সরকার সবাইকে সতর্ক করে সামাজিক দূরত্বের পরামর্শ দিল। তখনই দাউদ ইব্রাহিম নিজেকে আইসোলেশনে নিয়ে যায়। দাউদ ইব্রাহিম নিজের পরিবারের লোকেরা ছাড়া শুধুমাত্র বাছাই করা কয়েকজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করে। বাকি সব জিনিস ফোনেই হয়। কিন্তু, আন্ডারওয়ার্ল্ডের কারবার বন্ধ হয়ে যায়। ভারত ছাড়াও বিভিন্ন আফ্রিকান দেশ, আরব আমিরশাহী, দুবাইতে বাজার বন্ধ। এর সরাসরি প্রভাব দাউদ ইব্রাহিমের দুনম্বরী ধান্দার ওপর পড়ে। প্রপার্টি ডিলিং, কনস্ট্রাকশনের ওপর করোনার প্রভাব পড়ে। দাউদের কারবার ‘জিরো’ হয়ে যায়।

দাউদ ইব্রাহিমের আইসোলেশনে যাবার আরেকটি কারণ হলো, গত ডিসেম্বরে দাউদ ৬৫ বছর পূর্ণ করেছে। ১৯৫৫ সালে তার জন্ম। করোনার ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের সরকারের সর্তকতা ছিল ষাটোর্ধ্ব লোকেদের সাবধানে থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি। এটাও দাউদের আইসোলেশনে যাওয়ার অন্যতম কারণ। সামাজিক দূরত্ব এখনও সে বজায় রেখে চলেছে। ‘ডি’ কোম্পানির খুব কম লোকই তার সঙ্গে দেখা করতে পারছে। ছোটা শাকিল মনে হয় দাউদের আশেপাশে নেই। ‘ডি’ কোম্পানির পৃথিবীর বারোটি রাষ্ট্রে তাদের যে দুই নম্বরি ব্যবসা আছে, সবই এখন বন্ধ। তোলাবাজি হচ্ছে না। ‌ হুমকি ফোন যাচ্ছে না। এখনো পর্যন্ত এই করোনার জন্য কোথা থেকে কোনো রোজগারের ব্যবস্থা দাউদ করে উঠতে পারেনি।

‘ডি’ কোম্পানিকে রুখতে দুনিয়ার বড় বড় পুলিশিং এজেন্সি যা করতে পারেনি, তা করে দেখিয়েছে ‘করোনা’ নামে একটা ভাইরাস। যাকে দেখা যায় না, সেই করোনা ভাইরাস ‘ডি’ কোম্পানিকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বলতে গেলে করোনা ভাইরাস ‘ডি’ কোম্পানির পুরো দুনম্বরী ব্যবসায় তালা লাগিয়ে দিয়েছে।

২০১৮-তে ‘ফোবর্স’-এর একটি তালিকা এসেছিল। তাতে দেখা যাচ্ছে, ওই সময়ের হিসাবে দাউদ ইব্রাহিম বা ‘ডি’ কোম্পানির মোট কারবার ৬ হাজার ৭০ কোটি ডলারের। মানে ভারতীয় টাকার হিসাবে ৪৩ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। দু বছরে ‘ডি’ কোম্পানির পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। বিশ্বের ১২টি দেশে তাদের কারবার। কনস্ট্রাকশন, স্মাগলিং, সোনা পাচার, জাল নোট, ড্রাগস, বেটিং, তোলাবাজি, কী নেই তাদের দু’ নম্বরি ব্যবসায় । সব মিলে ৫০ হাজার কোটি টাকার মালিক দাউদ ইব্রাহিম। যেমন করে লকডাউনের সময় শেয়ার মার্কেট পড়ে গিয়েছিল, পৃথিবীর সব দেশে একই হাল ছিল। ‌ সেই একই অবস্থা দাউদ ইব্রাহিমের।‌ সে এখনো করাচিতে নিজেকে বাড়িতে বন্দি করে রেখেছে। কারণ পাকিস্তানে করোনার দাপট আবার বাড়ছে।

সবাই যা পড়ছেন

Akash-BYJU’S: ২ হাজার দুঃস্থ পড়ুয়াকে নিখরচায় NEET, JEE-এর কোচিং ও বৃত্তি

স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষপূর্তিতে 'আজাদি কা অমৃত মহোৎসব'-কে সামনে রেখে 'সবার জন্য শিক্ষা' প্রকল্প চালু করল দেশের প্রথম সারির বেসরকারি কোচিং সংস্থা আকাশ...

Modi: প্রধানমন্ত্রী মোদির সম্পদের পরিমাণ ২.২৪ কোটি টাকা

২০২১-২২ অর্থবর্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে ১৩ শতাংশ। তাঁর হাতে নগদ রয়েছে ৩৫ হাজার ২৫০ টাকা। পিএমও...

Tagore: তোমার সৃষ্টির চেয়েও তুমি যে মহৎ

ড. বিকাশ পাল, লন্ডন আজ ২২শে শ্রাবণ। তিনি যত বছর আমাদের পৃথিবীতে ছিলেন, ঠিক তত বছরই হল এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।...

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬১-তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

সৈকত কুমার বসু: ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম রসায়ন শিল্প ক্ষেত্র তৈরির কারিগর, রসায়নের জনক, বেঙ্গল কেমিক্যালসের রূপকার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী...

কম খরচে বাংলার পড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিচ্ছে পাঞ্জাবের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

রাজ্যের পড়ূয়াদের কম খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে এসেছে ভাতিন্ডায় পাঞ্জাব সরকারের বিশ্ববিদ্যালয়  মহারাজা রঞ্জিত সিং পাঞ্জাব টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (MRS-PTU)। সঙ্গে রয়েছে আকর্ষণীয়...