হোমঅন্যান্যচরম অবহেলা, বিশাখাপত্তনমে দুর্ঘটনায় জখম প্রতিভাবান বাঙালি গবেষকের মর্মান্তিক মৃত্যু

চরম অবহেলা, বিশাখাপত্তনমে দুর্ঘটনায় জখম প্রতিভাবান বাঙালি গবেষকের মর্মান্তিক মৃত্যু

চরম অবহেলা, বিশাখাপত্তনমে দুর্ঘটনায় জখম প্রতিভাবান বাঙালি গবেষকের মর্মান্তিক মৃত্যু

লন্ডন থেকে লেখাটি পাঠিয়েছেন প্রয়াত গবেষকের নিকট আত্মীয় ডঃ বিকাশ পাল।
১০ এপ্রিল, বুধবার। কোপেনহেগেন থেকে ফিরে দেখলাম, আমার কাছে একটি ইমেল বার্তা এসে পৌঁছেছে। তাতে যা লেখা ছিল, তার বাংলাটি  কিছুটা এরকম:

প্রিয় দাদা , 
আশা করি ভালো আছেন। আমাকে আপনাদের ট্রাস্টের হাল হকিকৎ জানানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমার খুব ভালো লাগছে যে, আমি আমার যৎসামান্য সাহায্যের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রিয় কাজলবাবুকে সম্মান জানাতে পেরেছি।  আপনি আমায় আশীর্বাদ করুন, যাতে আমি আরও কয়েকটা JACS-এ গবেষনাপত্র প্রকাশ করতে পারি। তাহলে ভবিষ্যতে আপনাদের এই স্বপ্নের প্রকল্পে আরও সাহায্য করতে পারব। আমি সেজন্য গবেষণায় কঠোর পরিশ্রম করছি । আশা করি ছেলেমেয়েরা ভালো আছে। ভালো থাকবেন।
শ্রদ্ধাসহ অতনু।

অধ্যাপক অতনু জানা (জেএ)-কে আমি চিনি ১৫ বছরের মত। সে কানপুর আইআইটি-তে ভৌত রসায়নে পিএইচডি করার পর দক্ষিণ কোরিয়ায় পোস্ট ডক্টরেট করার সময় একদিন আমায় সরাসরি ফোন করল।

“দাদা কেমন আছেন?”
বললাম, “আমি ভালোই আছি।”
“তোমার কী খবর অতনু?”
“দাদা মেরী ক্যুরি ফেলোশিপ পেয়েছি। শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, মানে আপনাদের দেশে আসছি।”

আমি ভীষণ খুশি হলাম। বহু বছর ধরে মেরী ক্যুরী আন্তর্জাতিক ফেলোশিপে সাফল্যের হার মেরেকেটে ৭ থেকে ৮ শতাংশ।  মানে ১০০ জন প্রতিযোগিতা করলে ১০ জনও পায় না। অতনু ২ বছরের জন্য ইংল্যান্ডে এল। চার পাঁচবার লন্ডনে আমাদের সাথে দেখাও হল। আমরাও সপরিবারে ওর শেফিল্ডের বাড়িতে গেলাম। এই ভাবে ধীরে ধীরে আমার ছেলেমেয়েদেরও সে প্রিয় হয়ে গেল। অতনু আমাদের ছেলেমেয়েকে নিয়ে লন্ডন শহর ঘুরে বেড়িয়েছে। দামি জিনিসপত্র উপহার দিয়েছে। তার স্ত্রী মোনালিসা আমার সম্পর্কে আমার স্ত্রীয়ের পিসতুতো বোন। মানে সে আমার আত্মীয়ও। কিন্তু সম্পর্কটা আরও কাছের হয়ে গেল, শুধু তার অমায়িক ব্যবহার আর শান্ত নম্র স্বভাবের জন্য। বিদ্যা দদাতি বিনয়ং। সে আমার ভায়রা থেকে ছোট ভাই হয়ে গেল। রক্তের বন্ধনে নয়, শুধু প্রীতি আর ভালোবাসার অনুভূতির বন্ধনেই।

ইংল্যান্ডে দু বছরের কাজ শেষ করে কিছুদিন কলকাতায় ফিরে চাকরির চেষ্টা করল,  আইআইটি, আইসার-এর মতো প্রতিষ্ঠানে। তারপর সে জাপান চলে গেল আর একটা পোস্ট ডক্টরেট করতে। দেখতে দেখতে অতিমারী শুরু হয়ে গেল। তবে অতনু তার গবেষণার কাজ চালিয়ে গেল। আমাদের নিয়মিত কথাবার্তা হোত। একদিন কলকাতায় বসে সে কাজ করছে। আমার কলকাতার নতুন বাসায় বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য দরখাস্ত জমা দিতে হবে বলে আমায় জানানো হয়েছে। আমি লন্ডনে। অতনু দরখাস্ত আর টাকা জমা দিল আমার হয়ে সিইএসসি-র মান্ডেভিলা গার্ডেন্সের দফতরে। আমাদের বাসায় আলো জ্বলল। অতিমারীতে সে ভয়ানক সংক্রমিত হল । হাওড়া হাসপাতালে সে ভর্তি। মোনালিসাও সংক্রমিত হয়ে ঘরে বন্দি।  তার বাবা মা অন্য দুটি ঘরে বন্দি। গোটা পরিবার কোভিডে আক্রান্ত। সে মেসেজ করল দাদা রেমডেসিভির নেই হাসপাতালে। আমি লন্ডনে। কোলকাতায় ডাক্তার নিরঞ্জনদাকে বললাম । সে যাত্রায় সে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল। তারপর একদিন বলল, গান্ধী ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট  (GITAM)-এ সহকারী অধ্যাপকের কাজে যোগ দিচ্ছে।

সে আস্তে আস্তে আবার দেশে গবেষণার কাজ শুরু করল। তার সুপ্রা-মলিকুলার ল্যাব ৮ কোটি টাকা দিয়ে গীতম বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করল। দেখলাম একেবারে একটা আস্ত ল্যাব তৈরি হয়ে গেল কয়েক মাসেই।  তার ল্যাবে এন এম আর  স্পেকট্রাম আনালাইজার বসাল। কয়েকজন  পিএইচডি  স্কলার ওই ল্যাবে গবেষণা করছে। সেসবের ছবি সে নিয়মিত পাঠাতো। আমি উৎসাহ জুগিয়ে চলেছি। আরো ভালো হবে তোমার অতনু, চালিয়ে যাও। আমার খবরে সে ভীষণ খুশি আর তার খবরে আমিও ভীষণ খুশি। এভাবেই দিন যায়, মাস যায়। দেখতে দেখতে বছরও  ঘুরে যায়। সে আমায় নিয়মিত দুর্গাপূজা, দেওয়ালি, নতুন বছরের প্রণাম জানাতে ভোলে না। ২০২৩- আবার তার গবেষণা জার্নাল অফ আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি বা JACS-এ প্রকাশিত হল। এটিই বিশ্বে সেরা প্রকাশনা ওদের বিষয়ে। দেশের আইআইটি, আইআইএসসি, আইসার-এর প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপকেদেরও JACS-এ একটা গবেষণাপত্র ছাপাতে কালঘাম ছুটে যায়।

গত বছরের শেষদিক, আমি তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গিয়েছি। বক্তৃতা দিচ্ছি, আবার ঘুরেও বেড়াচ্ছি। এমন সময় সে মেসেজ পাঠালো, “দাদা JACS-এ আমার একটা গবেষণাপত্র বেরিয়েছে।  আমি প্রথম একটা কনফারেন্স সিরিজ চালু করলাম – গীতম কেমিস্ট্রি রিসার্চ কনফারেন্স (জি সি আর সি )। আজ তার উদ্বোধন হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ১০ লক্ষ টাকা আমায় ল্যাবের কিছু যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দিয়েছেন। আর ৫০ হাজার টাকা আমায় পেপারের জন্য ব্যক্তিগত পুরস্কার দিলেন। আমি তার থেকে ২০ হাজার টাকা আপনাদের ট্রাস্টে দিলাম । আপনি কাউকে বলবেন না, আমার রসিদ ট্যাক্স ফর্ম, এসব কিছুই চাই না। জানাজানি হলে, আমি বিব্রত বোধ করব। দীপকবাবুও যেন আমায় ধন্যবাদ দিয়ে লজ্জা না দেন।” আমি বললাম, তোমার ইচ্ছাকে সম্মান জানানো হবে। শুধু ট্রাস্টের সভাপতি দীপক বাবু আর আমি ছাড়া কেউ এসব জানল না। তাই অতনুর নামও লেখা হল না ট্রাস্টের দেওয়ালে। হিসাব রক্ষক মানসকে বললাম, হিসেবের স্বার্থে একটা রসিদ আমায় দাও”,  অধ্যাপক জে এ, বিশাখাপত্তনম। ব্যস ঐখানেই শেষ।

ও মাঝে মাঝে বলত, “দাদা আমাদের উপাচার্য আমার ওপর খুব খুশি। একদিন বলল, দাদা আমার প্রমোশন হয়েছে, এখন আমি অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। উনি বলেছেন, অতনু প্রত্যেক JACS পেপারের জন্য তোমার গবেষণাগারের জন্য ১০ লক্ষ টাকার সরঞ্জাম তুমি কিনতে পারবে, আর ৫০ হাজার তোমার পকেট মানি। আমিও একটা JACS হলে, আপনার ট্রাস্টকে সেই পকেট মানির ভাগ দেবো। আপনি শুধু আমাকে আশীর্বাদ করুন দাদা। আমি তখন বললাম, “তোমার জন্য আমার মরাল সাপোর্ট সব সময় ছিল, আছে আর সব সময় থাকবে।”

১৪ এপ্রিল, রবিবার সকালে খবর এল, সে পথ দুর্ঘটনার আহত হয়ে মস্তিকে গুরুতর আঘাত নিয়ে বিশাখাপত্তনম হাসপাতালে ভর্তি। রাস্তায় হাঁটার সময় একটি গাড়ি তাকে জোরে ধাক্কা মারে। অস্ত্রোপ্রচার হয়েছে। লাইফ সাপোর্টে আছে। ডাক্তার চেষ্টা করেছেন সাধ্যমত। কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছে। পরিচয় জানতে না পারায় অন্তত প্রথম ১০ ঘন্টা সরকারি হাসপাতালে তার চিকিৎসাই চালু হয়নি। পরে যখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে পেরে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। শরীরের এক অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। মোনালিসা সোমবার এসে পৌঁছল। কলকাতা থেকে তার ১২ বছরের একমাত্র ছেলে এসে পৌঁছল। তার বয়স্ক বাবা মাও এসে পৌঁছলেন। ছেলে বাবা বাবা বলে ডাকল। তাদের কারোর ডাকে সে সাড়াও দিল না। চোখ মেলেও তাকালো না।

বৃহস্পতিবার দুপুরে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ছেলে, স্ত্রী, বাবা মা আর সব কাছের মানুষগুলিকে চিরবিদায় জানিয়ে চলে গেল অনন্তলোকে, চির ঘুমের দেশে। সে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার সময় একবার আমায় বলেছিল দাদা, “আই হ্যাভ লট অফ কেমিস্ট্রি লেফট ইন মি, আই উইল ডু  দেম ইন ইন্ডিয়া।”

সত্যিই তাই। সে সবে শুরু করেছিল। তার নাম দেশ বিদেশে ছড়াতেও শুরু করেছিল। সে তিন তিনটে JACS পেপার করেছিল। আরো JACS পেপার করার কথা দিয়েছিল।

জেনেছি অতনুর পরিবারের পাশে তার  বিশ্ববিদ্যালয়  কর্তৃপক্ষ দাঁড়িয়েছেন । তাঁরা অতনুর সন্মানে একটা ল্যাব নামাঙ্কন অথবা স্বর্ণ পদক চালু করার  সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের  ধন্যবাদ জানাই। “অতনু এখনও বাজছে তোমার সেই ডাক, দাদা কেমন আছেন ? প্লিজ ব্লেস মি দাদা সো দ্যাট আই ক্যান ডু ক্যাপল অফ মোর জ্যাকস পেপার।

অতনু, তোমার সাথে তোমার দাদার দেখা হবে আবার একদিন । তার আগে তোমার পরিবার বিশেষ করে তোমার বাবা মা আর মোনালিসার কাছে ক্ষমা চাইছি, তোমার ট্রাস্টকে দানের গোপনীয়তা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারিনি বলে। আজ তুমি যেখানে চলে গিয়েছো সেখানে চিরশান্তিতে থেকো। তুমি আনন্দে থেকো।

দাদা
লন্ডন

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img