হোমPlot1উপসাগরীয় যুদ্ধ কি বিশ্বকে এক নতুন ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

উপসাগরীয় যুদ্ধ কি বিশ্বকে এক নতুন ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

উপসাগরীয় যুদ্ধ কি বিশ্বকে এক নতুন ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

পুলক মিত্র: তেহরানের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের আনাচকানাচে মুহুর্মুহু শোনা যাচ্ছে বিস্ফোরণের শব্দ। কয়েক লক্ষ মানুষকে গ্রাস করেছে এক অজানা আতঙ্কের ছায়া। মধ্যপ্রাচ্যে এখন যে যুদ্ধ চলছে, তা শুধুমাত্র রণক্ষেত্রের মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। এই সামরিক সংঘাত দ্রুতই একটি বিরাট ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের চেহারা  নিচ্ছে, যার রেশ ছড়িয়ে পড়ছে গোটা বিশ্বে।

ইরানে সামরিক অভিযান মাসের পর মাস নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ করা যাবে, এমনটাই ভেবেছিল আমেরিকা। মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও সেকথা জোরগলায় বলেওছিলেন। তাঁর কথায়, ইরানে মার্কিন অভিযান নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বা তার চেয়েও দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। তাই সঠিক সময়েই অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই অভিযান শেষ করা সম্ভব হবে বলে ওয়াশিংটন আশা করছে। এই লক্ষ্য অর্জনে স্থলবাহিনী ব্যবহারের কোনও প্রয়োজন নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ দিতে মধ্যপ্রাচ্যে কিছু মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন রুবিও। কয়েক সপ্তাহ ধরে আমেরিকা ও ইজরায়েল বলে আসছে যে, ইরানের সামরিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সেদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথও বারবার দাবি করেছেন, ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে ইরানের সামরিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটাই ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। আমেরিকার এখন সাপের ছুঁচো গেলার মতো অবস্থা। কোনও রকমে মুখ রক্ষা করে যুদ্ধ শেষের পথ খুঁজছেন ট্রাম্প। কিন্তু নাছোড়বান্দা ইরান আমেরিকাকে উচিত শিক্ষা দিতে মরীয়া। জানা গেছে, ইরান তাদের দেশ থেকে প্রায় ৩,৮০০ কিলোমিটার দূরত্বে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ ঘাঁটির দিকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। যদিও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দ্বীপে পৌঁছতে পারেনি, তবে এই ঘটনা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতদিন জানা ছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ সীমা দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত।

গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকারী স্থাপনাগুলি ধ্বংস করে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে অভিযান কীভাবে চলছে? কীভাবেই বা এই চাপের মধ্যে ইরান তার সক্ষমতা বজায় রাখছে? একেবারে শীর্ষ স্তর থেকেই অনিশ্চয়তার শুরু। আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনি এবং তার পরিবারের আরও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সদস্য যে হামলায় নিহত হন, সেই হামলাতেই বেঁচে যাওয়া মোজতবা খামেইনি এরপরে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষিত হন। তবে এখনও পর্যন্ত তিনি জনসমক্ষে আসেননি। দুটি লিখিত বার্তা ছাড়া তাঁর কাছে থেকে কিছুই শোনা বা দেখা যায়নি।

ইতিমধ্যেই বিশ্ব বাজারে এই যুদ্ধের প্রভাব ক্রমশ খারাপের দিকে যেতে শুরু করেছে।  অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলেছেন, পারস্য উপসাগরের অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নতুন মাত্রায় পৌঁছতে পারে। কৃষিবাজারেও এই চাপের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্তারাও বলছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমান এই সঙ্কটের ফলে সারের  সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দামও বেড়ে যেতে পারে। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, এই যুদ্ধ কেবল ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার লড়াই নয়, এটি এমন এক অর্থনৈতিক সংঘাত, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যমূল্য, জ্বালানির বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী এক দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ বর্তমান বিশ্বের সামরিক সমীকরণও বদলে দিচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিষয়ক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র কোরীয় উপদ্বীপ থেকে তাদের অত্যাধুনিক ‘সাড’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করেছে।

তবে বড় প্রশ্ন হল, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিকাঠামোর ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে এই যুদ্ধের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে? দশকের পর দশক ধরে অনেক আরব দেশ এই বিশ্বাসের ওপর ভর করে তাদের নিরাপত্তার কৌশল গড়ে তুলেছিল যে, সঙ্কটকালে আমেরিকাই হবে তাদের ত্রাতা। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এ ধারণার মূলে আঘাত করছে। জানা গেছে, বেশ কিছু আরব দেশ আড়ালে ওয়াশিংটনকে অনুরোধ করেছে, যাতে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলি কেবল ইজরায়েল নয়, বরং ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলিকেও সুরক্ষা দেওয়ার কাজে যেন ব্যবহৃত হয়। এ অনুরোধ থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, বর্তমানের এই নিরাপত্তা কাঠামো আরব দেশগুলির জন্য যথেষ্ট নয়।

যুদ্ধ অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ইরানের ড্রোন এবং স্বল্পমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে যখন বহুগুণ বেশি দামের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয় হয়, তখন যুদ্ধের আর্থিক সমীকরণ বদলে যায়। এটি মার্কিন অর্থনীতিকে চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যে কোনও শক্তিশালী দেশের পক্ষে অর্থনৈতিক দিক থেকে একটি অত্যন্ত চাপের বিষয়।

ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা লাতিন আমেরিকার অস্থিরতা যেমন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, এ সংঘাত তাকে আরও উস্কে দিয়েছে। অনেক দেশই এখন বুঝতে পারছে যে, শুধুমাত্র একটি দেশের শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা তাদের দীর্ঘকালীন নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পারবে না। ফলে তারা এখন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে।

এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের ভূমিকার মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘকাল ধরে সামরিক ক্ষমতা ও মৈত্রীর মাধ্যমে তাদের প্রভাব বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, চিন আর্থিক নেটওয়ার্ক ও বাণিজ্যিক পরিকাঠামো তৈরির পথ বেছে নিয়েছে।  চিন তার জ্বালানির বড় একটা অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে থাকে। তাই পারস্য উপসাগরের অস্থিতিশীলতা সরাসরি তাদের উৎপাদন ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণেই চিনের পক্ষ থেকে বারবার সংযম অবলম্বন করার এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলা হচ্ছে।

দীর্ঘ মেয়াদের এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও কমিয়ে দিতে পারে। আঞ্চলিক দেশগুলি হয়তো তখন তাদের নিরাপত্তার জন্য একক কোনও শক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার পথ বেছে নেব। এতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা খর্ব না হলেও, একটি বহুমেরুর বিশ্ব গড়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত হবে।

ইরান এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। যুদ্ধের সমাপ্তি কোন পথে হবে, তার কোনও নির্দিষ্ট সমাধান সূত্রও এখনও পর্যন্ত মেলেনি। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে কে জয়ী হবে, সেটি বড় কথা নয়, বড় কথা হলো, এই সঙ্কট আমাদের বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের মুখে নিয়ে যাচ্ছে, যা এক অনিশ্চিত ও বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img