হোম দেশ গুজরাতে 'ভুয়ো' এনকাউন্টারে তরুণী খুন, আজও রহস্যই রয়ে গেল

গুজরাতে ‘ভুয়ো’ এনকাউন্টারে তরুণী খুন, আজও রহস্যই রয়ে গেল

(CRIME REPORTER : এই পর্বে শোনানো হবে নানান অপরাধ কাহিনী। বিভিন্ন রহস্যজনক ঘটনার নেপথ্য কাহিনী। বিখ্যাত গোয়েন্দা এজেন্সিগুলোর তদন্তের রোমহর্ষক গল্প। বিভিন্ন দেশের গুপ্তচর সংস্থাগুলোর গোপনে খবর সংগ্রহের গল্প আড্ডার মত করে উঠে আসবে বিশিষ্ট সাংবাদিক হীরক কর -এর কলমে।)

হীরক কর : নন্দীগ্রামে ভোটের পর থেকে একজন আইপিএস অফিসার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নাম নগেন্দ্র ত্রিপাঠী, যিনি পয়লা এপ্রিল নন্দীগ্রামে ভোটের দিন শার্টের কলার বের করে তাঁর মুখ্যমন্ত্রীর মুখের উপর বলে দিয়েছিলেন, “উর্দিতে ‘দাগ’ লাগতে দেব না ম্যাডাম।” কারণ, তিনি জানেন, ভারতে বহু আইপিএস অফিসারের উর্দিতে দাগ লেগেছে। যেমন লেগেছিল গুজরাতে।

তাই, আজ বলব এক তরুণীকে এনকাউন্টার করার গল্প। যাকে ঘিরে বহু বিতর্ক তৈরি হয়েছে দেশজুড়ে। ‌ তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ইস্যু। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে গুজরাতের নাম।‌ জড়িয়ে গেছে পুলিশ অফিসার ডিজি বানজারার নাম, যাঁর নাম উঠে আসে সোহরাব‌উদ্দিন এবং তুলসীরাম প্রজাপতির এনকাউন্টার কেসের সঙ্গে। ডিজি বানজারা ২০০২ থেকে ২০০৫-এর মধ্যে গুজরাতে কম করে কুড়িটি এনকাউন্টার করেছিলেন। তখন তিনি ছিলেন এটিএস প্রধান।

পরবর্তীকালে তদন্তে জানা যায়, সবকটি এনকাউন্টারই ছিল ভুয়ো। সমস্ত এনকাউন্টার হয়েছিল খুব ভোরে। প্রত্যেকটায় ছিল সন্দেহজনক। ফলে, ডিজি বানজারা খাকি উর্দিতে দাগ থেকেই গেছে।

‌২০১৩-তে বানজারা আচমকা অবসর নেন। ‌ বলেন, গুজরাত সরকার কিছুই করছে না। বানজারার মত ছিল,  যাদের বিরুদ্ধে ফেক এনকাউন্টারের অভিযোগ আছে, সেইসব পুলিশ আধিকারিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না সরকার। সোহরাবউদ্দিন এনকাউন্টার মামলায় আট বছর জেলে ছিলেন বানজারা। এই মহিলাকে এনকাউন্টার করার জন্য জেলে গিয়ে লাগাতার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ইশরাত জাহান মুম্বইয়ের ১৯ বছরের তরুণী। আদতে বিহারের বাসিন্দা। মহারাষ্ট্রের থানের  মুমব্রায় মুসলিম প্রভাবিত রশিদ কম্পাউন্ডে থাকতেন ইশরাত। পরিবারের সাত সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। মুম্বইয়ের গুরু নানক খালসা কলেজে বিএসসি পাঠক্রমে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। ওঁর বাবা একটা ছোটখাটো কন্সট্রাকশনের ব্যবসা করতেন। নাম, মহম্মদ শামিম রেজা। ইশরাতের মা একটি মেডিসিন প্যাকেজিং কোম্পানিতে কাজ করতেন। স্বামী স্ত্রী মিলে সাত সন্তানকে মানুষ করছিলেন। ২০০২-তে ইশরাতের বাবার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারে অর্থের যোগান দিতে প্রাইভেট টিউশন ও সেলাইয়ের কাজ করতে থাকেন এই তরুণী।

এই সময় মুম্বইয়ের থানের কাছে যেখানে ইশরাত টিউশন পড়াতেন, সেখানে কেরলের বাসিন্দা জাভেদ শেখের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে জানা যায়, জাভেদ শেখের আসল নাম ছিল প্রাণেশ পিল্লাই। ধর্মান্তরিত হয়ে নিজের নাম রাখে জাভেদ শেখ। এর মাঝেই জাভেদ গালফ দেশগুলোতে ঘুরে এসেছিলেন। ইশরাত জাহান ও জাভেদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়।‌ বন্ধুত্ব পরিণত হয় ঘনিষ্ঠতায়। কেউ কেউ বলেন তাঁরা বিয়েও করেছিলেন। ‌ কিন্তু তার কোনও প্রমাণ নেই। প্রাণেশ পিল্লাইয়ের বাবা বলেছিলেন,  ওরা দুজনে বিয়ে করেছিল। কিন্তু ইশরাতের পরিবারের লোকেরা একথা মানতে চায়নি।

যাই হোক, ইশরাত জাহান কলেজে পড়ছিলেন।‌ পাশাপাশি টিউশন করতেন। প্রাণেশ পিল্লাই ওরফে জাভেদ শেখের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছিল। জাভেদ শেখের হয়ে পার্টটাইম কাজ করছিলেন। তাঁর অ্যাকাউন্টস দেখাশোনা করতেন ইশরাতই । এটা তাঁর পরিবারের লোকেরা জানতেন। ‌কিন্তু জাভেদ শেখের সঙ্গে ইশরাতের ঘনিষ্ঠতা পছন্দ করতেন না। কর্মসূত্রে ইশরাত জাভেদের সঙ্গে মুম্বইয়ের বাইরেও যেতেন। তাতে পরিবারের লোকেদের আপত্তি ছিল।

২০০৪-এর ১১ জুন জাভেদ শেখের সঙ্গে ইশরাত জাহান নাসিক যান। নাসিক বাস স্ট্যান্ড থেকে বাড়িতে ফোন করে ইশরাত জানায়, “আমি নাসিকে আছি। জাভেদ একটা কাজে গেছে। ও ফিরে এলে একসঙ্গে দুজনে বেরিয়ে যাব।” কিছুক্ষণ পরে ইশরাত মাকে আবার ফোন করে‌ন। বলেন, “জাভেদ তো ফিরে এসেছে। কিন্তু তার সঙ্গে কয়েকজন বিচিত্র লোক আছে, যাদের দেখে আমার প্রচন্ড ভয় হচ্ছে।” সেটাই ছিল ইশরাতের শেষ ফোন। এরপর বাড়িতে ইশরাতের আর কোনো কল আসেনি। ফলে ফোনে কথাবার্তাও হয়নি।

১৫ জুন, ২০০৪। আমেদাবাদের শহরতলী এলাকায় ডিজি বানজারার নেতৃত্বে গুজরাত পুলিশের এসটিএফ একটি গোপন অপারেশন করে। সঙ্গে ছিল ক্রাইম ব্রাঞ্চ। হঠাৎই সেখানে এনকাউন্টার হয়। তাতে চারজন মারা যায়। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ইশরাত জাহান। যে চারজন মারা গিয়েছিলেন, ইশরাত জাহান ছাড়াও তাঁদের মধ্যে ছিলেন জাভেদ শেখ ওরফে প্রাণেশ পিল্লাই। গুজরাত পুলিশের কথামতো বাকি দুজন আমজাদ আলি রানা আর জিসান চৌহান। পুলিশের দাবি, এরা পাকিস্তানি নাগরিক ছিল। এরা চারজন একসঙ্গে ছিল।

এই এনকাউন্টারের পরে পুলিশ প্রেস কনফারেন্স করে। বলে, এই চারজন লস্কর-ই-তৈবার মডিউল ছিল। ভারতে লস্করের হয়ে কাজ করছিল । গুজরাটের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে খতম করার জন্য আমেদাবাদে লস্কর এদের পাঠিয়েছিল। গোপন সূত্রে খবর জানতে পেরে গুজরাত পুলিশ লস্করের মিশন বানচাল করে দেয়।

কিন্তু গুজরাত পুলিশের এই দাবির প্রতিবাদ শোনা যায় কেরল থেকে। জাভেদ শেখ ওরফে প্রাণেশ পিল্লাইয়ের বাবা-মা দাবি করেন, তাঁদের ছেলে কখনই এরকমটা ছিলেন না। গুজরাত পুলিশ মিথ্যে বলছে। ইশরাত জাহানের পরিবারের লোকেরা টিভিতে খবর দেখার পর সামনে আসেন। ইশরাতের মা শামিমা কাইজার বলেন , “ইশরাত কখনোই এরকম ছিল না। একজন সাদাসিধে মেয়ে। তাঁর সঙ্গে লস্করের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। তাকে ফেক এনকাউন্টারে মারা হয়েছে।” এই ভুয়ো হত্যা মামলায় সিবিআই তদন্ত দাবি করেন তিনি।

দুই পরিবার প্রতিবাদ করায় এটা এক সময় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, এর আগে গুজরাতে বেশ কয়েকটি এনকাউন্টার নিয়ে পুলিশের দিকে আঙুল উঠেছিল। পুলিশি তদন্তের পর ইশরাত জাহানের দেহ তাঁর পরিবারের লোকেদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। জাভেদের ডেড বডিও তার পরিবারের কাছে কেরলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু যারা পাকিস্তানি বলে পরিচিত বাকি দুজনের মৃতদেহ কেউ দাবি করেনি। ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে পুলিশ তাদের কবর দিয়ে দেয়।

ইসরাত জাহানের মৃতদেহ যখন মুম্বই আনা হয়, তখন এই বিষয়টা মানুষের মনের আঁচে টগবগ করে ফুটছে। থানে এলাকায় তাঁর বাড়ির কাছে পৌঁছলে ১০-১২ হাজার লোকের জমায়েত হয়। মানুষ বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, গুজরাত পুলিশ এনকাউন্টার করেনি, খুন করেছে। সিবিআই তদন্তের দাবি করা হয়। মামলা আদালতে যায়।

এক বছর পর অন্য একটি সংঘর্ষের মামলায় গ্রেফতার করা হয় বানজারাকে। সে ঘটনায় সোহরাবুদ্দিন শেখকে হত্যা করা হয়েছিল।

আদালত গুজরাতের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসপি তামাংকে ওই এনকাউন্টারের তদন্তের দায়িত্ব দেয়। তিনি তদন্তের জন্য পাঁচ বছর সময় নেন। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৯-এ তদন্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দেন। ২৪৩ পাতার তদন্ত রিপোর্টে এসপি তামাং বলেন, “এটা কোনও এনকাউন্টার ছিল না। ছিল ‘কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার’। পুলিশ এই চারজনকে হত্যা করেছে।” এর জন্য গুজরাত পুলিশের এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট ডিজি বানজারাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ১৪ জুন নয়, এর আগেই ওই চারজনকে গ্রেফতার করেছিল গুজরাট পুলিশ। এদের পুলিশ হেফাজতে গুলি করা হয়নি। এদের পাশে রাখা গোলা-বারুদ একে ফরটিসেভেন সবই পুলিশের সাজানো। এদের সঙ্গে লস্কর-ই-তৈবা কোনও সম্পর্ক ছিল না।

এই রিপোর্টকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে হইচই বেঁধে যায়। রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যায় গুজরাতের তদানীন্তন নরেন্দ্র মোদীর সরকার। হাইকোর্ট একটি স্পেশাল ইনভেস্টিগেটিভ টিম ‘সিট’ গঠন করে। বলে, এই মামলার পুনঃতদন্ত করবে “সিট’। ‘সিট’ এই মামলার ফের তদন্ত করে । ২০১১-র ২১ নভেম্বর, ‘সিট’ তাদের রিপোর্ট হাইকোর্টে পেশ করে। তারাও রিপোর্টে বলে এনকাউন্টার ফেক ছিল। এর জন্য তারা প্রায় কুড়ি জন পুলিশ অফিসার এবং আইপিএসকে দায়ী করে।

এরপর হাইকোর্ট ইশরাত জাহানের পরিবারের দাবি অনুযায়ী, এই মামলার তদন্তভার দেয় সিবিআইকে। সিবিআই পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে কোর্টে চার্জশিট পেশ করে। শেষ পর্যন্ত সিবিআই তদন্তে প্রকাশ পায়, ২০০৪ সালের ১৫ জুন, যে চারজনকে পুলিশ মেরেছিল সেটা কোনওভাবেই এনকাউন্টার ছিল না। বরং সেটাকে বলা চলে ফেক এনকাউন্টার। নির্ভেজাল খুন। সিবিআই এ ব্যাপারে গুজরাত পুলিশ এবং ইন্টালিজেন্স ব্রাঞ্চ, দু’পক্ষকেই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে।

প্রথম বার এ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় ২০০৯ সালে, যখন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসপি তামাং বলেন, এই  সংঘর্ষ ভুয়ো ছিল এবং শুধুমাত্র পুরস্কার ও পদোন্নতির জন্য এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। সিবিআই চার্জশিটে বলে, ১১ জুন, ইশরাত জাহান মুম্বই থেকে নাসিকের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, এই ঘটনা সত্যি। কিন্তু ১২ জুন ইশরাত জাহান এবং জাভেদ শেখকে গুজরাতের আনন্দ জেলার বাসাত এলাকার টোল বুথ থেকে গুজরাত পুলিশ পাকড়াও করে। এরা দুজন এমএইচ ০২/৪৬৮৬ নম্বরের একটি গাড়িতে ছিল। এদের পাকড়াও করে গুজরাত পুলিশ আমেদাবাদের শহরতলী এলাকার একটি ফার্ম হাউসে নিয়ে যায়। যেটা ন্যাশনাল হাইওয়ের খুব কাছেই। আদালতে পেশ না করেই জোর করে তাদের হেফাজতে রেখে দেয়। ১২ জুনের আগেই পুলিশ আরো দুজনকে তুলে ফেলেছিল। যারা ওই এনকাউন্টারে মারা গিয়েছিল।

১৩ জুন পুলিশ আমজাদ আলি ও জিশানকে ওই ফার্ম হাউসে নিয়ে আসে। যেখানে আগে থেকেই ইশরাত জাহান এবং জাভেদ শেখ ছিল। ওখানেই বানজারার নেতৃত্বে পরিকল্পনা হয় ? ১৫ জুন এই ৪ জনকে মেরে ফেলা হবে। ১৪ জুন আমেদাবাদের এসআইবি অফিস থেকে লিখিতভাবে অস্ত্রশস্ত্র নেওয়া হয়। ওই হাতিয়ারগুলো নিয়ে এসআইবি টিম ওই ফার্ম হাউসে পৌঁছায়। যেখানে এই চারজনকে বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়েছে।

২০০৪ সালের ১৫ জুন, সাতসকালেই এই চারজনকে ফার্ম হাউস থেকে বের করে একটি শুনশান জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সিবিআই চার্জশিট অনুসারে, এমকে আমিন নামে এক পুলিশ অফিসার একটি নাইন এমএম পিস্তল থেকে ৫ রাউন্ড গুলি চালায়। আরেক পুলিশ অফিসার জেজি পরমার নিজের রিভলভার থেকে চার রাউন্ড গুলি চালায়। তরুণ বারোট নিজের রিভলবার থেকে ৬ রাউন্ড, আরেক পুলিশ অফিসার আইকে চৌহানের রিভলবার থেকে তিন রাউন্ড গুলি চালায়। মোগন কালাসভা একে ফরটি সেভেন থেকে ৩২ রাউন্ড গুলি চালায়। ১০ রাউন্ড গুলি চালায় এক কমান্ডো মোহন নান্দীকার । অনুজ জীবন চৌধুরী নিজের স্টেনগান থেকে ১০ রাউন্ড গুলি করে। মোট ৬৯ রাউন্ড গুলি চলে। যাদের কাছে কোনো রকম অস্ত্র ছিল না, সেই চারজনকে মারার জন্য ৬৯ রাউন্ড গুলি সকলের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়। এরপর মিডিয়া আসে। খবর ছড়ায়। চারিদিকে হৈ চৈ শুরু হয়।

সিবিআই তাদের চার্জশিটে ২০ জন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে হত্যা ও অপরাধমূল ষড়যন্ত্র এবং অস্ত্র আইনে অভিযোগ আনে। এদের মধ্যে ছিল গুজরাটের ডিজিপি কেআর কৌশিকের নামও। চার্জশিট ফাইল করা হয় গুজরাট পুলিশের ৮ অফিসারের বিরুদ্ধে। বানজারা এবং আমিন ছাড়া অন্য যাঁদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছিল, তাঁরা হলেন, পিপি পাণ্ডে (গুজরাত পুলিশের প্রধান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত), জিএল সিংহল, তরুণ বারোট, অনুজ চৌধরি, জেজি পারমার, এবং মোগন কালাসভা (২০০৭ সালে মৃত)। এঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল হত্যা, অপহরণ, প্রমাণ লোপাট ও অন্যান্য। এ ছাড়া চারজন আইবি আধিকারিক – অবসরপ্রাপ্ত স্পেশাল ডিরেক্টর রাজিন্দর কুমার (সংঘর্ষের সময়ে তিনি গুজরাতের এসআইবি-র জয়েন্ট ডিরেক্টর ছিলেন), টি মিত্তল, এম কে সিনহা এবং রাজীব ওয়াংখাড়ের বিরুদ্ধে। এঁদের বিরুদ্ধে অপহরণ এবং ভুয়ো সংঘর্ষে মৃত চারজনকে বেআইনিভাবে আটক রাখার অভিযোগ আনা হয়েছিল। এঁদের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি দেয়নি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, সিট, সিবিআইয়ের তিনটি রিপোর্টে একটা জিনিস কমন, এই এনকাউন্টার “ফেক”। এদের আগেই পাকড়াও করে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। সিবিআই চার্জশিটে বলে,  কোনভাবেই ইশরাত জাহানের সঙ্গে লস্করের সম্পর্ক প্রমাণ করা যায় না। ‘সিট’ এই   সম্পর্কে কিছু বলতে পারেনি। লস্কর সম্পর্কের কথা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটও উড়িয়ে দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে আন্ডার সেক্রেটারি ছিলেন আরবিএস মনি। ২০১৭-তে তিনি অভিযোগ করেন, ইশরাত জাহানের রিপোর্ট সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে বদলে দেওয়ার জন্য ওনার উপর চাপ দেওয়া হচ্ছিল। আমেদাবাদ হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে যখন ‘সিট’ তদন্ত করছিল তখন এই আন্ডার সেক্রেটারি আরবিএস মনিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় । বলা হয়, তুমি হলফনামা দিয়ে বল ইশরাত জাহান লস্কর-ই-তৈবার সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নয়। ২০১৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ওই মুখপাত্র দাবি করেন, তাঁকে জোর করে দ্বিতীয় রিপোর্ট লেখানো হয়েছিল, যে রিপোর্ট থেকে লস্কর জঙ্গি যোগাযোগের কথা মুছে ফেলা হয়েছিল। ওই আধিকারিক বলেন, হাইকোর্ট নিযুক্ত বিশেষ তদন্ত দলের সদস্য আইপিএস অফিসার সতীশ শর্মা তাঁর ওপর অত্যাচার চালিয়ে দ্বিতীয় রিপোর্ট দিতে বাধ্য করেন।

ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো অর্থাৎ আইবির প্রাক্তন অধিকর্তা ছিলেন রাজিন্দর কুমার। এই ফেক এনকাউন্টার নিয়ে তাঁর দিকেও আঙুল উঠেছিল।

২৬/১১-র ঘটনায় পাকিস্তান এবং আমেরিকার নাগরিক ডেভিড হেডলি গ্রেফতার হয়েছিল। এখন সে আমেরিকার জেলে আছে। আমেরিকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে মুম্বই আদালতে চলে ২৬/১১ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ। নিজের বয়ানে বিস্ফোরক হয়  ডেভিড হেডলি। ইশরাত জাহান আত্মঘাতী লস্কর জঙ্গি ছিল বলে জানায়  সে। তাকে একথা জানিয়েছিলেন লস্করের  কমান্ডার জাকিউর রহমান লাকভী। সে পাকিস্তানে রয়েছে, যাকে ‘চাচা’ বলা হয়। পরে অবশ্য হেডলি বলেছিল, লাকভী তাকে কখনোই বলেনি যে, ইশরাত জাহান লস্কর-এর সঙ্গে যুক্ত। এটা সে জানতে পেরেছিল মিডিয়া থেকে। তবে লস্করের মদতপুষ্ট লাহোরের একটি সংবাদপত্র ইশরাতকে লস্করের জঙ্গি বলেই দাবি করেছিল। কিন্তু, ২০০৭-এ সেই দাবি থেকে পিছু হটে লস্কর। জানায়, ওটা জনৈক সাংবাদিকের ভুল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো ইশরাত জাহান আদৌ কি লস্করের ফিঁদায়ে ছিলেন?  এনকাউন্টার যে চারজন মারা গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে আমজাদ আলি রানা, জিসান চৌহান পাকিস্তানের সিটিজেন ছিল। তাই তাদের মৃতদেহ কেউ দাবি করেনি। এদের সঙ্গে লস্করের সম্পর্ক ছিল এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। বাকি রইল দুজন। প্রাণেশ পিল্লাই ওরফে জাভেদ শেখ এবং ইশরাত জাহান। একজন কেরলের অন্যজন মুম্বইয়ের। দুজনেই ইন্ডিয়ান। কিন্তু এনকাউন্টারে মৃত ওই দুই লস্করের লোকের সাথে তাদের কী সম্পর্ক ?

এটা ঘটনা, গুজরাত দাঙ্গার পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল পাকিস্তানের কিছু জঙ্গি সংগঠন। ‌ওই দাঙ্গার জন্য তারা দায়ী করে নরেন্দ্র মোদীকেই । তাই তারা চাইছিল বদলা নিতে। এই নিয়ে আইবি-র রিপোর্ট ছিল। ওই সময় আইবি-র খবরের ভিত্তিতে কাশ্মীরে এক সন্ত্রাসবাদীকে গ্রেফতার করা হয়। সে জানিয়েছিল, নরেন্দ্র মোদীকে হত্যা করার জন্য আমাদের কিছু লোক গুজরাটে জড়ো হয়েছে। আইবি এই ইনপুট গুজরাট পুলিশকে দিয়েছিল। তখন আইবি-র কর্তা ছিলেন রাজিন্দর কুমার । যাকে সিবিআই বলেছিল ওই এনকাউন্টারের ঘটনায় তিনিও শামিল হয়ে থাকতে পারেন।

আসল ঘটনা হলো, ইশরাত জাহান এবং প্রাণেশ পিল্লাই আইবি-র ‘ব্ল্যাক অফ’-এর অংশ ছিল। ব্ল্যাক অপারেশনের। কিন্তু এই ব্ল্যাক অপারেশন কী ? আইবি-র কাছে খবর ছিল, ইশরাত জাহান এবং প্রাণেশ পিল্লাই লস্করের সঙ্গে যুক্ত। আইবি তাদের দু’জনকে ট্র্যাপ করে। বলে, তোমরা আমাদের হয়ে কাজ করো। আমরা তোমাদের কিছু করবো না। না হলে জেল খাটবে নতুবা গুলি খেয়ে মরবে। সাধারণত গুপ্তচর সংস্থায় এরকম হয়।

এরপর এরা দুজনেই আইবি-র হয়ে কাজ করতে শুরু করে। তারা খোঁজ করতে শুরু করে গুজরাতে কারা কারা এসেছে নরেন্দ্র মোদীকে হত্যা করার জন্য। বিভিন্নভাবে জঙ্গি সংগঠনের নেটওয়ার্কের মধ্যে তারা প্রবেশ করে। পৌঁছয় লস্করের খুব ঘনিষ্ঠদের কাছে। যাদের মধ্যে একজন, জিসান চৌহান, অন্যজন আমজাদ আলি রানা। ইশরাত এবং জাভেদের ফাঁদে পা দেয় এই দুজন। তখন প্রথমে আমজাদ এবং জিসানকে পাকড়াও করা হয়। তারপরে ইশরাত ও জাভেদকে ধরা হয়। এবং এনকাউন্টার করে দেওয়া হয়। তাই রাজেন্দ্র কুমারকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করায় সিবিআই।

কিন্তু ইশরাতের সঙ্গে লস্করের সম্পর্ক ছিল কিনা আজও কেউ জানে না? তিন তিনটি তদন্তকারী দল কোনো প্রমাণ পায়নি। কিন্তু একটা কথা প্রমাণিত, ওই এনকাউন্টার ছিল “ফেক”। পুলিশ হেফাজতে মারা হয়েছিল। ‌ পুলিশ-হেফাজত ছিল বেআইনি। কারণ রিমান্ড নেওয়া হয়নি। রিমান্ড নিলে হয়তো এনকাউন্টার হতো না। সোহরাবউদ্দিন কেসে বানজারা জেলে ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিট এবং সিবিআই তাকে জেলের বাইরে নিয়ে আসে। আমেদাবাদের জেরা করে। তাতেই ক্ষেপে গিয়ে বানজারা পুলিশ সার্ভিস থেকে ইস্তফা দেন।

ইশরাত জাহান হত্যার পর ১৫ বছর কেটে গেছে। অভিযোগ, ভুয়ো সংঘর্ষে এই তরুণীর মৃত্যু ঘটেছিল। এ ঘটনায় দুই প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিক ডিজি বানজারা এবং এনকে আমিনকে মুক্তি দিয়েছে আমেদবাদের বিশেষ সিবিআই আদালত। ঘটনায় মূল অভিযুক্ত বানজারা সে সময়ে আমেদাবারে ডিটেকশন অফ ক্রাইম ব্রাঞ্চের ডিসিপি ছিলেন। এনকে আমিন  ছিলেন ওই বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার। কোনও সরকারি চাকুরে যদি কোনও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা অনুসারে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। গুজরাত সরকার সে অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেছে । প্রধানত সে কারণেই এই মুক্তি। শোহরাব উদ্দিন শেখ ও তুলসীরাম প্রজাপতি সংঘর্ষ মামলাতেও  খালাস পেয়ে গিয়েছেন বানজারা। সেহরাবুদ্দিন মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন এনকে আমিন। তিনিও ছাড়া পেয়ে গেছেন। যদিও সেদিন কিন্তু গুজরাত পুলিশের খাকি উর্দিতে ‘দাগ’  লেগেছিল।

ডান-বাম-মধ্যপন্থা নয়, আমরা সোজাসুজি পথেই বিশ্বাসী। সংবাদমাধ্যমকে কুক্ষিগত করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল লগ্নি করছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। আর তার জেরে শিকেয় উঠেছে নির্ভীক, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা। বিপন্ন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। আমজনতাই আমাদের শক্তি। তাই আমরা চাই, আপনিও আমাদের পাশে থাকুন। আপনার সামান্য অনুদানও আমাদের চলার পথে সাহস জোগাতে পারে। kolkatanewstoday@gmail.com

সবাই যা পড়ছেন

করোনায় চিকিৎসকদের পরামর্শ, এই ফোন নম্বরগুলি অবশ্যই সঙ্গে রাখুন

দেশে করোনা সংক্রমণ দিন দিন ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে। ইতিমধ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে।কোনওরকম সমস্যা হলে, ফোনে বিনাখরচে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিন। এখানে...

আরও ভয়াবহ! দেশে একদিনে আক্রান্ত ২ লক্ষ ৬১ হাজার, মৃত ১৫০১

দেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ চেহারা নিচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৬১ হাজার ৫০০। এ...

বাংলায় দৈনিক আক্রান্ত ৮ হাজারের পথে, মৃত ৩৪, তবু ভোটপ্রচারে লাগাম নেই

নির্বাচনী প্রচারের মধ্যেই রাজ্যে দৈনিক করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এবার প্রায় ৮ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। সেইসঙ্গে সক্রিয় করোনা রোগীর সংখ্যা ৪৫ হাজার...

বাংলায় করোনা ছড়ালে, দায় নিতে হবে মোদী-বিজেপিকে : মমতা

দেশে করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কাঠগড়ায় তুললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয়তার জন্যই দেশে ব্যাপক হারে ছড়াচ্ছে করোনা।...

শীতলখুচিকাণ্ডে মমতার অডিও টেপ ফাঁস বিজেপির, ভুয়ো বলল তৃণমূল

পঞ্চম দফার ভোটের আগের দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরও একটা অডিও ক্লিপ প্রকাশ্যে আনল বিজেপি, যা নিয়ে ফের তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। যদিও এই...