হোম ফিচার London : লন্ডন যাত্রার ২২ বছর, সম্পূর্ণ হল একটা বৃত্ত

London : লন্ডন যাত্রার ২২ বছর, সম্পূর্ণ হল একটা বৃত্ত

tirthankarতীর্থঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

(২২ বছর আগে এক যুবক বিলেতে গেলেন কলকাতা থেকে। সেই যাত্রার বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো আজ। লন্ডনের বাসিন্দা সেই তরুণের স্মৃতিচারণা শুধুমাত্র এই পোর্টালে।)

সেদিন রবিবার। লর্ডসে বিশ্বকাপ (Lords World Cup) ফাইনালে খেলছে অস্ট্রেলিয়া (Australia) আর পাকিস্তান (Pakistan)। খুব ভোরে হিথরোতে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের প্লেন যখন অবতরণ করলো, তখন বাইরে ঝকঝকে রোদ। রানওয়ের আশপাশের জায়গাগুলো কেমন ভেজা ভেজা।

তখন সরাসরি কলকাতা থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ( British Airways) বিমান লন্ডনে আসতো। মাঝে দিল্লিতে একটু দীর্ঘ স্টপওভার। আমার প্রথম আন্তর্জাতিক যাত্রা।

তার আগে বিমানেই চড়েছি মাত্র একবার। কলকাতা (Kolkata) থেকে বাগডোগরা (Bagdogra)। [কলকাতার নবীন সুচান্তির প্রতিষ্ঠান (নাম মনে নেই এখন) শিলিগুড়ির সিনক্লেয়ার হোটেলে নিয়ে গিয়েছিল। Bussiness Junket। যাওয়া দার্জিলিং মেলে আর ফেরা বাগডোগরা থেকে বিমানে। ]

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের টিকিট পাঠিয়েছিল বিবিসি (BBC)। সঙ্গে আবেদন, উনি চাইলে ওকে দয়া করে জানালার পাশে একটা আসন দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। নীচে স্বাক্ষর লিন্ডা মেবলি। বিলেতে আমার প্রথম HR অফিসার।

আমার সহযাত্রী এক বাঙালি দম্পতি। বয়স্ক। ভদ্রলোক অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক মনে হয়। যাচ্ছেন ছেলের কাছে আমেরিকায়। লন্ডনে ট্রানজিট।।

জানালার পাশে কুঁকড়ে বসে ছিলাম আমি। টেক-অফের সময় মনে হলো এক অন্তহীন অনিশ্চয়তায় ঝাঁপ দিতে চলেছি।

বিমানে আমার সহযাত্রী (গৌরবে বহুবচন) সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee)। ওঁর গন্তব্যও মার্কিন মুলুক। সহপাঠী-সহমর্মী বন্ধু অভ্যুদয় গুহ তখন কেন্দ্রীয় সরকারের আবগারি বিভাগের হয়ে কলকাতা বিমানবন্দরে রয়েছে। সৌমিত্রবাবু বিমানবন্দরে পৌছতেই অভ্যুদয় আমাকে ভিআইপি লাউঞ্জে নিয়ে গেল।

টিকটিকি-র স্রষ্টার সাথে সেই প্রথম আলাপ। আমাদের দুজনের জন্য দামি কফিও এলো। ঠোক্কর না খাওয়া পেয়ালা-পিরিচে।

সৌমিত্রবাবু ক্লাব ক্লাসে। পায়ের কাছে কিঞ্চিৎ বাড়তি জায়গা। তাতেই উনি বিমান লন্ডনে নামার আগে হাল্কা শারীরিক কসরত করে নিলেন। গোগ্রাসে চোখ ভরে দেখলেন ছবির অপুর ফ্যান-কুল।

ওসবে তখন আমার মন নেই। সন্ধের পানীয়, রাতের খাবার, বেশি রাতের খাবার, ভোরের খাবার। সবই গিলছি কিন্তু খাচ্ছি না। ছোট্ট খাবারের ট্রে কিভাবে সমলাব তা নিয়ে অভিজ্ঞ সহযাত্রীর সাথে দুয়েকটা বাক্য বিনিময় মাত্র। বাকিটা আড়চোখে দেখছি, ওঁরা কী করেন।

হিথরোতে নেমেই এক প্রস্থ লাইনে দাঁড়ানো। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ এবং অভিবাসন দপ্তরের অনুসন্ধিৎসু মনগুলোর কৌতূহল নিবারণ করার গুরু দায়িত্ব আমার কাঁধে। বিবিসির ওয়ার্ক পারমিট দেখার পরে কেউ আর বিশেষ কথা বাড়াননি।

এরই মধ্যে জনৈক ভদ্রলোক এসে জানালেন, জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আমাকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করতে হবে। বিবিসি থেকে জনৈক মানসী বড়ুয়া আমাকে নিতে আসবেন। মানসীদির সাথে আগেই আলাপ হয়েছিল। উনি বার কয়েক আমার বেলঘরিয়ার বাড়িতে ফোন করেছিলেন।

কিছুক্ষণ পরে মানসীদি আকর্ণ-বিস্তৃত হাসি নিয়ে এসে পৌঁছলেন। ওর Audi গাড়িতেই আমাকে পৌছে দিলেন বিবিসির গেস্ট হাউসে।

বাড়িটার নাম বমোন্ট হাউস। লন্ডনের অন্যতম আরব প্রধান এলাকা বেসওয়াটারের কাছে। অল্প হাঁটলেই নটিংহিল। বিশ্বসেরা এক কার্নিভালের ধাত্রীভূমি।

রাস্তার উল্টোদিকে কেনসিংটন গার্ডেনস। খানিকটা হেঁটে গেলে সার্পেন্টাইন লেক আর কেনসিংটন প্যালেস। একসময় ডায়ানার বাসস্থান। যেদিন প্রথম পৌঁছলাম বমোন্ট হাউসে, সেদিন এতকিছু জানতাম না।

এক মাস ছিলাম ওখানে। যখন ছিলাম তখন জায়গাটার গুরুত্ব উপলব্ধি করিনি। কোনো সখ্যতাই তৈরি হয়নি জায়গাটার সাথে।

হিথরো থেকে বেরিয়ে মানসীদি একটা লম্বা রাস্তা দিয়ে নিয়ে গেলেন। পরে জেনেছি ওটা গ্রেট ওয়েস্ট রোড। আমার এখনকার বাড়ির কাছে।

হ্যামারস্মিথ ফ্লাইওভারের ডানদিকে জাহাজের মতো একটা বাড়ি। দেশে থাকলে নির্ঘাৎ নামকরণ হতো জাহাজ বাড়ি। পরে জেনেছি ওটা আর্ক হাউস।

মানসীদির গাড়িতে যেতে যেতে একটু অস্বস্তি লাগছিল । কিন্তু কারণ কী তা ঠাওর করতে পারছিলাম না। পরে উপলব্ধি করলাম হর্নের আওয়াজ নেই। বেলঘরিয়ায় চব্বিশ ঘণ্টা রিকশা, অটো, স্কুটার, মোটরসাইকেল, ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার, লরি, ট্রাকের অনন্ত কনসার্ট থেকে এসে এমন নৈশব্দ নীরবতা নিঃসন্দেহে এক অস্বস্তিকর অবস্থা।

গেস্ট হাউসে পৌছে স্নান করেই ঘুমিয়ে পড়লাম। কিছু খাওয়ার ইচ্ছে বা মানসিকতা কোনোটাই ছিলো না। মাঝে দেশে ফোন করতেই আমার কাকিমা উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলেন, বিলেতে ভাত পাওয়া যায় কি না।

যখন ঘুম ভাঙলো তখন ঘড়িতে নটা বাজে। অথচ বাইরে ঝকঝকে রোদ। রোদের আলোর এমন রোশনাই দেখে বেশ ঘাবড়ে গেলাম। তাহলে কি তখন পরের দিনের সকাল নটা বেজে গেছে? বা আমি কি চব্বিশ ঘণ্টারও বেশি ঘুমিয়েছি? শুনেছি এ ব্যাপারে ফুটবলার অরুণ ঘোষের (Arun Ghosh) রেকর্ড আছে।

সোমবার সকাল নটায় বিবিসির অফিস বুশ হাউসে আমার রিপোর্টিং। বাড়িটা ভারতীয় দূতাবাস, ইন্ডিয়া হাউসের লাগোয়া।

রাত ৯টায় দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ দেখে ভয় পেয়ে সোজা রিসেপশনে ফোন। আমি দিন আর তারিখ জিজ্ঞাসা করতেই ভদ্রলোক বুঝলেন, গুলিয়ে ফেলেছি। আশ্বস্ত করলেন, রবিবার আছে রবিবারেই। তখনও সোমবার হয়নি।

ওঁর কথায় নিশ্চিন্ত হয়ে জুতোর কালি আর ব্রাশ কিনতে বের হলাম। ঐ দুটো দেশ থেকে নিয়ে আসতে ভুলে গেছি। প্রায় মাইলখানেক হেঁটেও কিছুই পেলাম না। এর মধ্যেই শুনলাম স্টিভ ওয়া‘র অস্ট্রেলিয়া পাকিস্তানকে ফাইনালে হারিয়ে দিয়েছে।

কাছের এক সিলেটি রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম ভাতের আশায়। নিরামিষ তরকারি আর ডালটা চলে যায়। কই মাছ বলে আমাকে যেটা দেওয়া হলো, তার সাথে দেশি কই-এর কোনো মিলই নেই। পেল্লায় সাইজের মাছটির উৎস কোথায়? জিজ্ঞাসা করতে ম্যানেজার বললেন, স্পেন থেকে এই কই-এর আমদানি।

যখন গেস্ট হাউসে ফিরলাম তখনো সূর্য ডোবার নামগন্ধ নেই। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় কেয়ারটেকার ঘরের পর্দাটা টেনে দিতে বললেন। “না হলে আলোয় ঘুম হবে না।” সোমবার সকালে সাড়ে সাতটা থেকে ব্রেকফাস্ট। মনে করালেন সেই কথাও।

ঘরে ফিরে মনে হলো একটা ঝকমারি বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো। আজ ২০শে জুন, রবিবার। ঐ বৃত্তের বাইশ বছর পূর্তি।

সবাই যা পড়ছেন

Akash-BYJU’S: ২ হাজার দুঃস্থ পড়ুয়াকে নিখরচায় NEET, JEE-এর কোচিং ও বৃত্তি

স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষপূর্তিতে 'আজাদি কা অমৃত মহোৎসব'-কে সামনে রেখে 'সবার জন্য শিক্ষা' প্রকল্প চালু করল দেশের প্রথম সারির বেসরকারি কোচিং সংস্থা আকাশ...

Modi: প্রধানমন্ত্রী মোদির সম্পদের পরিমাণ ২.২৪ কোটি টাকা

২০২১-২২ অর্থবর্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে ১৩ শতাংশ। তাঁর হাতে নগদ রয়েছে ৩৫ হাজার ২৫০ টাকা। পিএমও...

Tagore: তোমার সৃষ্টির চেয়েও তুমি যে মহৎ

ড. বিকাশ পাল, লন্ডন আজ ২২শে শ্রাবণ। তিনি যত বছর আমাদের পৃথিবীতে ছিলেন, ঠিক তত বছরই হল এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।...

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬১-তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

সৈকত কুমার বসু: ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম রসায়ন শিল্প ক্ষেত্র তৈরির কারিগর, রসায়নের জনক, বেঙ্গল কেমিক্যালসের রূপকার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী...

কম খরচে বাংলার পড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিচ্ছে পাঞ্জাবের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

রাজ্যের পড়ূয়াদের কম খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে এসেছে ভাতিন্ডায় পাঞ্জাব সরকারের বিশ্ববিদ্যালয়  মহারাজা রঞ্জিত সিং পাঞ্জাব টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (MRS-PTU)। সঙ্গে রয়েছে আকর্ষণীয়...