রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের আর আট মাসও বাকি নেই। এর মধ্যেই তৃণমূলে কি গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল? সোমবার সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লোকসভার দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
অন্যদিকে, লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের মুখ্য সচেতকের পদ থেকে ইস্তফা দেন কল্যাণ। সোমবার তৃণমূলের সাংসদদের নিয়ে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন মমতা। সেই বৈঠকের পরেই দলনেত্রীর কাছে ইস্তফাপত্র পাঠান কল্যাণ।
ইস্তফার কারণ হিসাবে শ্রীরামপুরের সাংসদ জানিয়েছেন, নেত্রী মমতা তাঁর উপর আস্থা রাখতে পারেননি। তাই তিনি ইস্তফা দিয়েছেন। কিন্তু এটাই কি ইস্তফার একমাত্র কারণ? না কি সাংসদ মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে সংঘাতও রয়েছে এর পিছনে? ইস্তফা দেওয়ার পাশাপাশি মহুয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে এক্স হ্যান্ডলে দীর্ঘ একটি পোস্টও করেন কল্যাণ। সুদীপের পরিবর্তে অভিষেককে লোকসভার দলনেতা করার কারণেই কি তাঁর এই ইস্তফা?
কল্যাণ অবশ্য বলেছেন, অভিষেকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খুবই ভাল। অভিষেকের লোকসভার নেতা হওয়ার সঙ্গে তাঁর ইস্তফার কোনও সম্পর্ক নেই। কল্যাণ ইস্তফা দেওয়ার পর তাঁকে ফোন করেছিলেন অভিষেক। অভিষেক কল্যাণকে বলেন, আগামী তিন-চার দিন আগের মতোই মুখ্য সচেতকের দায়িত্ব সামলাতে। ৭ অগাস্ট দিল্লি যাওয়ার কথা রয়েছে অভিষেকের। দিল্লিতে তিনি কল্যাণের সঙ্গে বসে আলাদা করে কথা বলবেন বলেও জানিয়েছেন।
এর আগেও বেশ কয়েকবার কল্যাণের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দলের সংঘাত হয়েছে। কিন্তু পরে আবার সব মিটেও গিয়েছে। এবারও কি তেমন কিছু ঘটবে? রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, সবকিছু নির্ভর করছে অভিষেকের সঙ্গে কল্যাণের বৈঠকের উপর। তবে কল্যাণকে সমঝোতার পথে যেতে হলে ইস্তফাপত্র ফিরিয়ে নিতে হবে। অভিমানের সুরে কল্যাণ বলেছেন, আমার দরকার ফুরিয়ে গিয়েছে।এ বার দিদিই দল চালান!”
সোমবার দলের সাংসদদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন মমতা। তৃণমূল সূত্রের খবর, ওই বৈঠকে রাজ্যসভার সংসদীয় দলের কাজ নিয়ে মমতা সন্তোষ প্রকাশ করলেও লোকসভার সাংসদদের মধ্যে ‘সমন্বয়’ নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, লোকসভার সাংসদদের মধ্যে সমন্বয় ঠিকভাবে হচ্ছে না। কল্যাণ মনে করেন, এটা আসলে তাঁর দিকেই আঙুল তোলা।
মমতার বৈঠক শেষ হওয়ার ঠিক পরেই ‘এক্স’ পোস্টে মহুয়াকে আক্রমণ করেন কল্যাণ। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে কল্যাণের প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তাঁর নাম না করলেও শূকরশাবকের সঙ্গে লড়াইয়ের পরিচিত উপমার উল্লেখ করেছিলেন মহুয়া। কল্যাণের সেই আচরণ এবং মন্তব্যের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মহুয়া বলেছিলেন, “শূকরশাবকের সঙ্গে কখনও লড়াই করতে নেই। সে চাইবে লড়াই করতে। কিন্তু আপনি করলে নোংরাটা আপনার গায়েও লাগবে।’’ মহুয়া আরও বলেছিলেন, “নারীবিদ্বেষী, হতাশাগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতা সব দলেই রয়েছেন। সংসদেও তার প্রতিফলন রয়েছে।”
সোমবার বিকাল থেকে একটি ভিডিও ফুটেজ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে দেখা যায়, দিল্লির একটি বাংলোর সামনে গাড়ি থেকে নামছেন মহুয়া। সেই সময়েই মূল ফটক দিয়ে হেঁটে ঢুকছেন কল্যাণ। মহুয়াকে দেখেই তাঁকে স্বগতোক্তি করতে শোনা যাচ্ছে, ‘‘আজকে দিনটা গেল রে!’’ যা থেকে স্পষ্ট যে, দু’জনের মধ্যে সংঘাত বিন্দুমাত্র কমেনি।
গত কয়েক মাস ধরে নানা ঘটনায় ইঙ্গিত মিলছিল, লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলে সব ‘ঠিকঠাক’ চলছে না। এর মাঝে কীর্তি আজাদের সঙ্গেও একটি বিষয়ে সংঘাত তৈরি হয়েছিল কল্যাণের। এর মধ্যেই সোমবারের বৈঠকে ‘সমন্বয়ের অভাব’ নিয়ে সরব হন মমতা। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ কল্যাণ সরাসরিই বলেছেন, ‘‘দিদি আমার প্রতি অবিচার করলেন!’’ পাশাপাশি তাঁর এ-ও বক্তব্য, ‘‘মহিলাকেন্দ্রিক দলে মহিলাদেরই প্রাধান্য। পুরুষদের কোনও গুরুত্ব নেই।’’