ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধের প্রায় দু’সপ্তাহ হতে চলল। যেমনটি আশঙ্কা করা হয়েছিল, তেমনটিই ঘটতে চলেছে। অর্থাৎ দিন দিন প্রকট হচ্ছে তেলের সঙ্কট। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত থেকে বাহরিন – আমেরিকা ও ইজরায়েলকে চাপে ফেলতে একের পর এক আরব রাষ্ট্রের খনিজ তেল শোধনাগারগুলিকে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। তার ওপর ইরান হরমুজ প্রণালীও বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে হু-হু করে বাড়ছে তেলের দাম।
এই মুহূর্তে বেশ চাপে পড়ে গিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। গত মাসের শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরই সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল সংস্থা আরামকোর শোধনাগারে হামলা চালায় ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে তেল উৎপাদন এবং সরবরাহ বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব। কাতারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রেও হামলা চালায় ইরানের সেনা। হামলার শিকার হয়েছে আমিরশাহির ফুজাইরাহ তেল শোধনাগারও।
সর্বশেষ ড্রোন হামলা চালানো হয় বাহরিনের অন্যতম বড় তেল শোধনাগার বাপকোয়।
পশ্চিম এশিয়ায় আরব রাষ্ট্রগুলিতে প্রায় প্রতিটি মার্কিন সেনাঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে ইরান। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের কৌশল হল, বিশ্ববাজারে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ২০০ ডলারে নিয়ে যাওয়া। ইতিমধ্যেই তা ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। খনিজ তেলের এই ঊর্ধ্বমুখী দাম মুদ্রাস্ফীতির সূচকে প্রভাব ফেলছে। ভারত সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দর ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ৯ মার্চ ব্যারেল পিছু তেলের দাম ১১৬ ডলারে পৌঁছে যায়। এর ফলে ভারত-সহ একাধিক দেশের শেয়ারবাজারে ব্যাপক ধস নামে। যুদ্ধের জেরে ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের এক পঞ্চাংশ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে পারছে না কোনও পণ্যবাহী জাহাজ। তবে রাশিয়া, চিনের মতো ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির ট্যাঙ্কার চলাচলে ছাড় দিয়েছে ইরান।
বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, লড়াইয়ে কৌশলগত দিক থেকে সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছে ইরান। কারণ, পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশগুলির খনিজ তেল পরিবহণের ব্যস্ততম সামুদ্রিক রাস্তা হল হরমুজ প্রণালী। ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা এবং ৩৩-৩৯ কিলোমিটার চওড়া ওই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক পথটি বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরল সোনা পরিবহণ করে থাকে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে দিনে ১৪ কোটি ব্যারেল খনিজ তেল সরবরাহ করে সৌদি আরব, আমিরশাহি, ইরাক, কুয়েত এবং বাহরিনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলি। সংবাদসংস্থা রয়টার্স সূত্রে জানা গেছে, ইরানি আক্রমণের আতঙ্কে খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে ইরাক।
বিশ্ববাজারে তেলের দর বাড়তে থাকায় আমদানির বিকল্প অনুসন্ধান শুরু করে দিয়েছে কেন্দ্র। বর্তমানে দুনিয়ার মোট ৪০টি দেশ থেকে তেল কিনছে ভারত। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি ছাড়াও এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভেনেজ়ুয়েলার নাম। ফলে ঘরোয়া বাজারে পেট্রল-ডিজ়েলের মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা কম। তবে সমস্যা হতে পারে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে। এত দিন এর সিংহভাগই কাতার থেকে আমদানি করা হত।



