হোমPlot1দেবী দুর্গার বাহন সিংহ কেন?

দেবী দুর্গার বাহন সিংহ কেন?

দেবী দুর্গার বাহন সিংহ কেন?

ডঃ শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
যাঁর নাম প্রসঙ্গে কাশীখণ্ডে বলা হয়েছে :
“অদ্য প্রভৃতি যে নাম দুর্গেতি খ্যাতিমেষ্যতি।
দুর্গাদৈত্যস্য সমরে পাতনাদতিদুৰ্গমাৎ।।
যে মাং দুর্গাং শরণগা ন তেষাং দুর্গতিঃ কচ্চিৎ।
দুর্গাস্তুতিরিয়ং পুণ্যা বজ্রপঞ্জরসংজ্ঞিকা।”
(৭২ অ: ৭১-৭১ শ্লোক)

সেই দেবীরই বাহন সিংহ। কিন্তু সিংহ কী করে হন মায়ের বাহন? সিংহবাহিনী দেবী দুর্গার প্রতিমা দেখে এমন প্রশ্ন মনে জাগেই। শাস্ত্র ও পুরাণ খুঁজলে, পৌরাণিক গল্পে এর উত্তর মেলে। 

চণ্ডীতে আছে, ইন্দ্রাদি দেবগণ শুম্ভ নিশুম্ভ বধের জন্য যখন হিমালয়ে দেবীর কাছে উপস্থিত হন, তখন দেবীর শরীর কোষ কৌশিকী নামে এক দেবী নিঃসৃত হন। এর ফলে দেবী পার্বতী কৃষ্ণবর্ণের হয়ে যান এবং কালিকা নামে প্রসিদ্ধ হন। অবশ্য অন্য কাহিনিও আছে। সেই মত অনুসারে – দেবাদিদেব মহাদেবকে স্বামী রূপে পাওয়ার জন্য দেবী পার্বতী দীর্ঘ তপস্যা করলে তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব বিবাহ করেন দেবীকে। 

এদিকে ঘোর তপস্যার কারণে দেবী অন্ধকারে মিশে গিয়েছিলেন। তাই মহাদেব পার্বতীকে কালী বলে সম্বোধন করলে, দেবী অভিমানে কৈলাস ত্যাগ করেন এবং আবার তপস্যায় মগ্ন হন। তপস্যা শেষে দেবী পার্বতী গঙ্গায় স্নান করলে আর্বিভাব হয় দেবী কৌশিকীর। এই দেবী সিংহকে তাঁর বাহন রূপে গ্রহণ করেন।

আবার চণ্ডী অনুসারে, দেবতাদের ঘনীভূত তেজের রূপে দেবীর আবির্ভাব হলে, দেবতারা দেবীকে নিজের নিজের অস্ত্র প্রদান করেন। হিমবান্ তাঁকে প্রদান করেন সিংহ।

দেবী জগদ্ধাত্রী, দেবী কাত্যায়নী, দেবী স্কন্ধমাতাকেও সিংহের ওপরেই অবস্থান করতে দেখা যায়। আর দেবী দুর্গার প্রচলিত মূর্তিতে তো দেখাই যায় দেবীর দক্ষিণ পদ সিংহের ওপর এবং বামপদ মহিষাসুরের ওপর স্থাপিত, মহিষাসুর ছিন্ন শির মহিষের ভেতর থেকে বের হচ্ছেন।

অনেক বনেদি বাড়িতে অবশ্য দেবী দুর্গার বাহন সিংহের বদলে ঘোড়া। কোথাও আবার দেবীর বাহনের মুখ ঘোড়ার মতো হলেও শরীর সিংহের মতোই। একে ‘ঘোড়াদাবা’ সিংহ বলা হয় – দাবা খেলার ঘোড়ার ঘুঁটির মতো মুখ বলে। জনশ্রুতি, নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রবর্তিত ঐতিহ্য সামনে রেখেই শুরু হয়েছিল বাংলায় শরৎকালীন দুর্গাপুজোয় দেবীর বাহন হিসেবে ঘোটকমুখী সিংহের উপস্থিতি।

অনেকে মনে করেন এই রীতির পেছনে রয়েছে ফেলে আসা সময়ের ছাপ। ক্ষত্রিয়রা যে অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করতেন – তার সঙ্গে এর অবশেষগত সম্পর্ক। কারণ অশ্বমেধ যজ্ঞ করলে সমস্ত পাপের ক্ষয় হয় যেমন, তেমনই স্বর্গ ও মোক্ষ লাভ হয়। কিন্তু ব্রহ্মপুরাণ – ইত্যাদি মতে তো কলি কালে অশ্বমেধ যজ্ঞ নিষিদ্ধ। তাই কলিতে বিজয় কামনায় দুর্গাপুজো এবং সেই জন্যই অশ্বের সংযোগ। আবার অনেকের ধারণা – দেবী তো যোদ্ধাবেশী। যুদ্ধে বাহন হিসেবে ঘোড়া ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত। তাই দেবীর বাহন সিংহের সঙ্গে ঘোড়া মিশে গিয়েছে।

মার্কণ্ডেয় এবং বামন পুরাণের মতে, দেবী যেমন সর্বতেজ সম্ভূত তেমনই তাঁর সিংহ সর্বদেবময়। দেবীপুরাণ মতে, দেবীর এই বাহনকে নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং বিষ্ণু এবং সেই বাহনের মধ্যে অবস্থান করেছিলেন সমস্ত দেবতা।

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img