হোমফিচারসেদিন ঠিক কী হয়েছিল?

সেদিন ঠিক কী হয়েছিল?

সেদিন ঠিক কী হয়েছিল?

লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক দেবাশিস ভট্টাচার্য

কাল ২রা মে সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষ। ২৮ বছর আগে ২৩ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। অর্থাৎ মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। সেদিন রাতে তাঁর মৃতদেহ পিস হাভেনে রাখা হয়। পরদিন অর্থাৎ ২৪ এপ্রিল তাঁর দেহ সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত রবীন্দ্র সদনে রাখা হয়। হাজার হাজার মানুষ সেখানে গিয়ে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। ওই চত্বরে গান বাজছিল ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে …. ।’ এর পর মরদেহ আনা হয় কেওড়াতলা শ্মশানে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখভাল করেন তদানীন্তন মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

এই প্রতিবেদক তখন আজকাল পত্রিকার রিপোর্টার। সেদিন বিকেলে শ্মশানেই ডিউটি ছিল। শ্মশানে পুলিশ কাউকে ঢুকতে দেয়নি। মৃতদেহ চুল্লিতে ঢোকানোর পরেই ঘটে এক অবাঞ্ছিত ঘটনা। হঠাৎ এক চব্বিশ পঁচিশ বছর বয়সি যুবক শ্মশানে ঢুকে বুদ্ধদেববাবুর অদূরে গালাগালি দিতে থাকে। পুলিশের সঙ্গে যুবকটির ধস্তাধস্তি শুরু হয়। বুদ্ধদেববাবু তখন ওখানে উপস্থিত নগরপাল বি কে সাহাকে বলেন, ‘কমিশনার সাহেব এসব কি হচ্ছে?’ কমিশনার উঠে গিয়ে ধস্তাধস্তির জায়গায় পৌঁছন। কমিশনারকে দেখে যুবকটি বলে সাহাদা আমাকে পুলিশ মারছে। কমিশনার বলেন, স্বপন তুই বাইরে যা।

কেওড়াতলা শ্মশানে বসে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ওই যুবকের মুখে সাহাদা সম্বোধন শুনে হতভম্ব হয়ে যান। পুলিশ স্বপনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরদিন অর্থাৎ ২৫ এপ্রিল সব কাগজে এই খবর বড় করে বের হয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এই প্রতিবেদককে মহাকরণে ডেকে পাঠান। তিনি বলেন, ‘আপনি তো কালীঘাটে থাকেন, ছেলেটি সম্পর্কে কি কিছু জানেন?’ ওখানে গুন্ডামি হয় কেন? কোন টাকার ভাগাভাগি নিয়ে মারামারি হয়?’ বুদ্ধদেববাবুকে স্থানীয় মানুষ হিসেবে যা জানতাম তা বললাম। শ্মশানে প্রতিদিন গড়ে ষাটটি মৃতদেহ আসে। মৃতদেহ খাটে করে নিয়ে শ্মশানে আনা হতো। তখন হিন্দু সৎকার সমিতি ছাড়া আর কারুর শববাহী যান (হিয়ার্স ভ্যান) ছিল না। চুল্লির সামনে মৃতদেহ নামিয়ে বালিশ বিছানা সমেত খাট শ্মশান কর্মীরা আলাদা করে রেখে দিতেন।

পরদিন সকালে দুটো ম্যাটাডোরে খাটগুলো তুলে ফের বাজারে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। অন্য আর একটি ম্যাটাডোরে বালিশ তোষক সাদা চাদর চলে যেত গোডাউনে। ওইসব খাট পিছু শ্মশান কর্মীরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দেড়শো টাকা করে পেতেন। ব্যবসায়ীরা আবার অন্য মড়া পার্টিকে তিনশো থেকে চারশো টাকায় ওই খাট বিক্রি করতেন। বোম্বাই খাট হলে দাম পড়ত সাতশো থেকে আটশো টাকা। এই ভাবে একই খাট বিভিন্ন মৃতদেহ নিয়ে বারবার শ্মশানে যেত। শ্মশান কর্মীদের থেকে খাট পিছু গুন্ডারা নিত একশো টাকা। ওদিকে গোডাউনের তোষক ও বালিশের ওয়ার খুলে তুলো বের করে নতুন কাপড়ের মোড়কে তা চলে যেত বাজারের বেডিং স্টোর্সে। বালিশ তোষক চাদর বাবদ গোডাউনের ব্যবসায়ী শ্মশানকর্মীদের দিতেন একশো টাকা। গুন্ডারা পেত পঞ্চাশ টাকা। সব শুনে বুদ্ধদেববাবু থ হয়ে যান। তিনি বলেন, ‘এটা বন্ধ করবোই। কি করতে হবে বলুন?’ উত্তরে বললাম, তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবে।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তখন চতুর্থ বামফ্রন্ট সরকারের পুর-নগরোন্নয়ন, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী। তিনি এই প্রতিবেদককে বললেন, মড়ার খাটের ব্যবসা বন্ধে আপনার কি কি প্রস্তাব বলুন। বললাম ১) শ্মশানকর্মীদের যাতে কর্পোরেশনের মাস মাইনের চাকরি হয়, তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ২) মৃতদেহ নামানোর পরে খাট ভেঙে ফেলতে হবে। তোষক বালিশ চাদর ওখানেই পুড়িয়ে ফেলতে হবে ৩) কর্পোরেশনকে শববাহী যান রাস্তায় নামাতে হবে, যাতে খাট ও তোষক বালিশ ইত্যাদির দরকার না পড়ে। তিনি মন দিয়ে শুনলেন। মহাকরণ থেকে বেরিয়ে আজকাল অফিসে চলে গেলাম। সম্পাদক অশোক দাশগুপ্তকে সমস্ত ব্যাপারটা জানালাম। তিনি বললেন, মড়ার খাটের ব্যবসা এবং তোমার তিনটি প্রস্তাব লিখে দাও। লিখে দিলাম।

পরদিন আজকালের প্রথম পাতায় প্রথম লিড হয়ে সংবাদটি প্রকাশিত হলো। লোকের মুখে মুখে আলোচনা শুরু হয়ে গেল। শুনেছিলাম মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু তাঁর আপ্ত সহায়ক জয়কৃষ্ণ ঘোষকে বলেছিলেন, মড়ার খাটের ব্যবসার রিপোর্টটা পড়েছো? বাবার মৃতদেহ যে খাটে শ্মশানে গেল, সেই খাটেই ছেলের মৃতদেহও গেল। কারণ নাতি আবার তার বাবার জন্য বাজার থেকে সেই খাটটাই কিনল। মড়ার তোষক ও বালিশের তুলো নতুন ওয়ার পরিয়ে বেডিংয়ের দোকানে চলে গেল। ফুলশয্যার তত্ত্বের জন্য হয়তো সেই বেডিংই কেনা হলো। জ্যোতিবাবু মহাকরণে গিয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে ডাকলেন। আজকালের ওই রিপোর্ট নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা হলো। তারপর বুদ্ধদেববাবু তদানীন্তন মেয়র প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায়কে মহাকরণে আসতে বললেন। তলব পেয়ে মেয়র সেখানে যান। বুদ্ধদেববাবুর সঙ্গে মেয়রের আলোচনা হয়। এই আলোচনা সেরে মেয়র কর্পোরেশনে ফিরে আসেন।

মেয়রের ঘরে ডাক পড়ে মেয়র পারিষদ (স্বাস্থ্য) ডা. সুবোধ দে-র। কারণ শ্মশান পরিচালনার ভার কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন। মেয়রের ঘরে কমিশনারকেও ডাকা হয়। তারপর কমিশনারের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি অর্ডার বের হয়। তাতে লেখা হয়, ওই দিন বিকেল থেকেই সব শ্মশানে আনা মরার খাট ভেঙে দেওয়া হবে এবং তোষক বালিশ পুড়িয়ে দেওয়া হবে। এরপর মেয়র প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায় ডা. সুবোধ দে ও কমিশনার কেওড়াতলা শ্মশানে যান। স্থানীয় ৮৮ নং ওয়ার্ডের তদানীন্তন কাউন্সিলর স্বদেশ দাশকে খবর পাঠিয়ে আসতে বলা হয়। মেয়র শ্মশান কর্মীদেরকে ডাকেন। তাদেরকে বলেন,আপনাদেরকে কর্পোরেশনের চাকরি দেওয়া হবে। আপনারা খাট ভেঙে ফেলবেন, তোষক বালিশ পুড়িয়ে দেবেন।

এর আধঘন্টা পরে মেয়রের সামনে বিছানা পোড়ানো শুরু হয়। এই প্রতিবেদক সেদিন মহাকরণ, কর্পোরেশন ও শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন। কারণ খবরের টিপ ছিল। এই প্রতিবেদককে সেদিন কেওড়াতলায় সুবোধ দে বলেছিলেন, ‘আজকাল পত্রিকার গুরুত্ব কতটা আজ সেটা বোঝা গেল। আপনার রিপোর্ট সমাজ, সরকার ও পুরসভার চোখ খুলে দিল। মরার খাটের ব্যবসা বন্ধে আপনার রিপোর্ট ইতিহাস হয়ে রইল।’ আঠাশ বছর পর ইদানিং দেখছি মড়ার খাটের কারবার আবার শুরু হয়েছে। সাংসদ ও স্থানীয় কাউন্সিলর মালা রায়কে জানাতে হবে। ওদিকে মড়ার খাট ভাঙ্গার দিনই শুরু হল নতুন এক অধ্যায়। পুলিশ কমিশনারকে ‘সাহাদা’ সম্বোধনে ডাকা নিয়ে আলোড়ন।

সত্যজিৎ রায়কে দাহ করার রাতে কেওড়াতলায় শ্মশান স্বপন গোলমাল করেছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য স্বচক্ষে সব দেখেন। পুলিশ স্বপনকে গ্রেপ্তার করে। ভ্যানে তোলার সময় স্বপন চেঁচায় সাহাদা দেখুন পুলিশ কি করছে। সাহাদা মানে বুদ্ধদেববাবু ও সন্দীপ রায়ের পাশে বসা তদানীন্তন পুলিশ কমিশনার বীরেন কুমার সাহা। স্বপনের মুখে সেই ‘সাহাদা’ ডাক নিয়ে পরের দুদিন অর্থাৎ ১৯৯২ সালের ২৫ ও ২৬ এপ্রিল খবরের কাগজ গুলিতে বিস্তর লেখালেখি হয়েছিল। স্বপন পুলিশ কমিশনারের মত পদাধিকারীকে সাহাদা বলে ডাকায় হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। পুলিশ কমিশনার সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন। সাংবাদিকদের তিনি জানান, শ্মশান স্বপনকে তিনি কোনও দিনই দেখেননি। কেওড়াতলার দক্ষিণে একশো মিটার দূরে ৬৫ পল্লী নামে একটি ক্লাব আছে। সেই ক্লাবের কালীপুজো স্বপনের পুজো বলেই পরিচিত। ১৯৯১ সালে অর্থাৎ সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর আগের বছর সেই পুজোর উদ্বোধন করেছিলেন পুলিশ কমিশনার বি কে সাহা। তিনি আর স্বপন একসঙ্গে প্রদীপ জ্বালান। এই প্রতিবেদক সেই ছবি সংগ্রহ করে আজকাল পত্রিকার সম্পাদককে দেন। পরদিন সেটি আজকাল পত্রিকায় ছাপা হয়। আগুনে ঘি পড়ে। সকলেই বোঝেন যে , পুলিশ কমিশনার আগে কখনো স্বপনকে দেখেননি কথাটা সত্য নয়। ওই ছবির জেরে পরদিন পুলিশ কমিশনার ফের সাংবাদিক বৈঠক ডাকেন। সেখানে সাংবাদিকরা প্রকাশিত ছবিটির কথা তোলেন। তখন পুলিশ কমিশনার বলেন, কিছু অনুষ্ঠানে যেতে হয় পাশে কে দাঁড়িয়ে আছে বা বসে আছে তাকে আমার চিনতে হবে তার কি মানে? তবুও সকালের কাগজ দেখে ছেলেটি সম্পর্কে খোঁজখবর নিই। জানতে পারি ছেলেটির বিরুদ্ধে আগে কখনো পুলিশ কেস হয়নি।

এই প্রতিবেদকের স্মরণে ছিল প্রণব কুমার বর্মন যখন টালিগঞ্জ থানার ওসি ছিলেন, তখন একবার পুলিশ স্বপনকে গ্রেফতার করেছিল। প্রতিবেদক প্রণব বর্মনের সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটা ঝালিয়ে নেন। তার পরেই আজকালে রিপোর্ট বেরোয় পুলিশ কমিশনার ফের অসত্য কথা বললেন। স্বপনের ওই অ্যান্টিসিডেন্ট ছিল। সেই রিপোর্ট বের হতেই জ্যোতি বসু এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য চটে যান। পুলিশ কমিশনার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বীরেন সাহাকে। নতুন পুলিশ কমিশনার হন তুষার তালুকদার। ঘনিষ্ঠ মহলে বি কে সাহা বলেন, ওই রিপোর্টারটা আদাজল খেয়ে লেগেছিল। ওকে আমি দেখে নেব। এদিকে স্বপন জেলে গিয়ে বলতে থাকে রিপোর্টারকে শেষ করে দেব। আজকাল সম্পাদক বলেছিলেন, তুমি মনে করলে অন্য জায়গায় থাকতে পারো। ভাড়া নিয়ে চিন্তা কোরোনা। আজকালের ক্রীড়া সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত বলেছিলেন, আপনার নিরাপত্তা নিয়ে আমি তো বটেই আমার স্ত্রীও চিন্তিত। মড়ার খাটের ব্যবসা বন্ধ করেছেন, গুন্ডারা তো আপনাকে ছেড়ে দেবে না। আজকালের সব সহকর্মীরা এই প্রতিবেদকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন। এলাকার বন্ধুরাও সবসময় নজর রাখতেন।
একদিন সকালে ছফুট দুইঞ্চির বলিষ্ঠ চেহারার এক কৃষ্ণবর্ণ যুবক হঠাৎ এসে ঘরে ঢুকলো। (চলবে)

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img