পশ্চিমবঙ্গে সমাজবিরোধী এবং দুর্বৃত্তদের দমনে ১৩ জুলাই থেকে কার্যকর হয়ে গেল ‘গুন্ডাদমন আইন’। কেন এই আইনের প্রয়োজন ছিল, তা ব্যাখ্যা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “রাজ্যে ১৫ বছর ধরে গুন্ডাদের সরকার ছিল। তার আগে ছিল হার্মাদদের সরকার। ৩৪ বছরের কমিউনিস্ট হার্মাদ এবং ১৫ বছরের তৃণমূলী গুন্ডা, এদের জব্দ করার জন্যই এই আইনের খুব প্রয়োজন ছিল।” নতুন আইনের নাম হল ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ় অ্যাক্ট, ২০২৬’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইন বলবৎ হওয়ার পর পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষমতা অনেকটাই বাড়বে। নতুন এই আইনে অপরাধদমনে প্রশাসনকে এমন কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে বিরোধী শিবিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আইনটির উল্লেখযোগ্য দিক হল, অভিযুক্তকে বিনা বিচারে ১ বছর পর্যন্ত আটক রাখা ও এলাকাছাড়া করার ক্ষমতা। নতুন আইন অনুযায়ী, প্রশাসন যদি মনে করে, কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন কিংবা কোনও বড়সড় সমাজবিরোধী অপরাধের চক্রান্ত করছেন, তবে অপরাধ ঘটানোর আগেই তাঁকে বিনা বিচারে সর্বোচ্চ ১২ মাস অর্থাৎ ১ বছর পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ একে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘জাতীয় নিরাপত্তা আইন’-এর (এনএসএ)-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার’ বা এলাকাছাড়া করার ক্ষমতা। জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার বা ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকেরা যদি নিশ্চিত হন যে, কোনও দাগী অপরাধী বা গুন্ডা নির্দিষ্ট এলাকায় থাকলে অশান্তি ছড়াতে পারে, তবে সেই অপরাধীকে অনধিক এক বছরের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা বা সমগ্র জেলা থেকে ‘বহিষ্কার’-এর নির্দেশ দিতে পারবেন।
নয়া এই আইনে জামিন-অযোগ্য ধারা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থানও রাখা হয়েছে। আইনটিকে আরও নিশ্ছিদ্র করতে এর আওতায় আসা সমস্ত অপরাধকে সম্পূর্ণ ভাবে জামিন-অযোগ্য করা হয়েছে। এর ফলে পুলিশ কোনও পরোয়ানা ছাড়াই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারবে এবং আদালত থেকে সহজে জামিন পাওয়া অপরাধীদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
কোনও ব্যক্তি সমাজবিরোধী বা সিন্ডিকেটের মতো সংগঠিত অপরাধের মাধ্যমে যদি কোনও সম্পত্তি বা টাকা উপার্জন করেন, তবে সেই সম্পত্তিও সরাসরি বাজেয়াপ্ত করা যাবে। নতুন আইনে ‘গুন্ডা’ বা ‘সমাজবিরোধী’ শব্দের সংজ্ঞা ও পরিধি অনেকটাই বিস্তৃত করা হয়েছে।
সিন্ডিকেটরাজ, তোলাবাজি এবং গায়ের জোরে সাধারণ মানুষের জমি বা বাড়ি দখল করা, বেআইনি ভাবে নদী থেকে বালি তোলা, অবৈধ খনি কারবারকে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে গণ্য করা হবে। সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ব্যবসা-বাণিজ্য বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা দেওয়াও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে গণ্য করা হবে। সাইবার অপরাধ এবং বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতিকেও এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
ট্রেন-বাস পোড়ানো, সরকারি ভবনে ভাঙচুর বা পুলিশের উপর হামলার ঘটনা ঠেকাতে এই আইনের পাশাপাশি কার্যকর হচ্ছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। এর অধীনে একটি বিশেষ ‘ক্লেম কমিশন’ গঠন করা হবে।
কোনও দাঙ্গা, বিক্ষোভ বা হিংসাত্মক আন্দোলনের জেরে যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হবে, তার সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ চিহ্নিত অভিযুক্তদের থেকে আদায় করবে এই কমিশন।



