হোমPlot1আজকের সমাজে বিয়ের গুরুত্ব কি ক্রমশ কমছে?

আজকের সমাজে বিয়ের গুরুত্ব কি ক্রমশ কমছে?

আজকের সমাজে বিয়ের গুরুত্ব কি ক্রমশ কমছে?

ডাঃ সুভাষ মাইতি
তিনদিন আগে ফেসবুকে একটা লেখা পড়ে একটু চমকে গেলাম। আজকাল বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে কম বয়সী ছেলেমেয়েদের বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করা হয় বিভিন্ন কনজিউমার প্রোডাক্ট বা ভোগ্যপণ্য কিনতে। তার মধ্যে যেমন সাজগোজের জিনিসপত্র থাকে, তেমনই এমন কিছু জিনিস থাকে, যেগুলো সরাসরি যৌনতার সঙ্গে যুক্ত। ফেসবুকের লেখাটিতে এক মহিলা বলছেন, আমাদের দেশে মোটামুটি মেয়েরা ১৫ বছরে এবং ছেলেরা ১৮ বছরে যৌনজীবনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। কিন্তু সরকার বিয়ের বয়স মেয়েদের ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর নিয়ম করে রেখেছে। ওনার বক্তব্য, একজন ছেলে বা মেয়ের পড়াশোনা শেষ করতেই ২৫-২৬ বছর হয়ে যায়, তারপর পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে আরও কয়েকবছর। তাহলে কি ছেলেমেয়েরা অতদিন অতৃপ্ত যৌনতা নিয়ে জীবন কাটাবে? মহিলার ইঙ্গিত সমাজে অবাধ যৌনতাকে প্রশ্রয়ের দিকে মনে হয়।

আমরা যখন জন্ম নিই, সাথে করে নিয়ে আসি দুটি প্রবৃত্তি, একটি হল,  self procreation আর অন্যটি self protection। বংশগতির ধারাকে অক্ষুন্ন রাখার তাগিদে প্রকৃতি আমাদের মধ্যে যৌনতার উন্মেষ ঘটায়। বিয়ের বয়স যখন নিরূপণ করা হয়, তখন ছেলে বা মেয়ের মানসিক ও শারীরিক পরিপক্কতাকে মাথায় রেখেই তা করা হয়। যদি সেই পরিপক্কতার অভাব ঘটে, তবে পরবর্তী প্রজন্ম হয়ে পড়ে দুর্বল, জীবনধারণে অক্ষম, তাতে প্রকৃতির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে পড়ে।

সামাজিকভাবে প্রজননের সাথে আধুনিক সময়ে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর ফলে সামাজিক এবং পারিবারিক পরিবেশ সংরক্ষিত হয়। অবশ্য অনেকক্ষেত্রেই এর ব্যতিক্রম দেখা দেয়, যখন পরিবার এবং সমাজে শোষণ, নিপীড়ন এবং অত্যাচার মাথাচাড়া দেয়। কিন্তু সেগুলোকে ব্যতিক্রম হিসাবেই ধরাই ভালো।
আজকের সমাজে অবশ্য বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ক্ষীয়মান। নারীর পেশাগত জীবন, নারীপুরুষের জীবনে সময়ের অভাব, দায়িত্ব গ্রহণে অনীহা, সবকিছু মিলে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে পিছনের সারিতে ঠেলে দিয়ে লিভ টুগেদারকে নিয়ম হিসেবে ধীরে ধীরে মেনে নিতে বর্তমান প্রজন্মকে প্রলুব্ধ করছে।

সন্তানধারণকে বিলম্বিত করতে সহযোগিতা করছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি। আর তার ফলে প্রশ্রয় পাচ্ছে লাগামছাড়া যৌনতা; সমাজের বন্ধনও আর সেই প্রবণতাকে আটকে রাখতে পারছে না। মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মতই প্রকৃতির ফসল। প্রকৃতি চিরকাল নিয়মনিষ্ঠ, সংযত ও উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে স্থির। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা তখনই শুরু হয়, যখন আমরা মানুষেরা প্রকৃতির উপর অন্যায়ভাবে চাপ সৃষ্টি করি। তার ফলেই গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়ন, হ্রাসমান মেরুবরফ, খামখেয়ালি আবহাওয়া, বিভিন্ন রোগের প্রকোপ ও নতুন রোগের সৃষ্টি হতে থাকে। প্রকৃতি নিয়মের ব্যতিক্রম বরদাস্ত করে না।

প্রজননের সাথে মানসিক ও শারীরিক পরিপূর্ণতা, দায়িত্ববোধ সবসময়েই প্রকৃতিতে বিদ্যমান। তাই প্রাণীকুল বছরভর প্রজনন করে না। নির্দিষ্ট সময়, অনুকূল পরিবেশ, খাদ্যের যোগান, দায়িত্ববোধ, সবকিছুই সে প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। প্রাণিজগতে প্রজনন আমোদ বা সময় কাটানোর ব্যাপার নয়। প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার তাগিদে প্রাণিদের মধ্যে যৌনতার উন্মেষ ঘটে।

বৃহৎ অর্থে মানুষ ও পশু, যার চিন্তা করার ক্ষমতা আছে, নিজেদের মধ্যে ভাবের আদানপ্রদান করতে পারে।আমাদের ধর্ম বলে মনুষ্য জন্ম নাকি বহু সাধনার ফল। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগে আমরা উন্নত হচ্ছি, না কি আমাদের অধোগতি হচ্ছে।

কোন পশু ক্ষিদে না পেলে খায় না এবং তার জন্য শিকারও করে না, অহেতুক মারামারি হানাহানি করে না, অন্যের উপর যৌন নির্যাতন করে না, কাউকে সাজা দিতে বা ক্ষমতা প্রদর্শন করতে ধর্ষণ করে না। কিন্তু মানুষ এ সব কিছুই করে। তাহলে আমারা কিসে শ্রেষ্ঠ? প্রাণিজগতের দু একটি উদাহরণ দিলে হয়তো বোঝা যাবে।

১) জল মাকড়সার আস্তানা পদ্মপাতার নীচের অংশে। সেখানে পদ্মপাতার উল্টোদিকে আঁকড়ে থাকা জলজ অতি ক্ষুদ্র প্রাণিদের খেয়ে ওরা বাঁচে। কিন্তু মুস্কিল হল বিনা অক্সিজেনে ওরা বেশীক্ষণ জলের তলায় থাকতে পারে না। তাই জলের তলায় ওদের বাসা একটা উপুড় করা গেলাসের মত, যেখানে ওরা বাতাসের বুদবুদ সঞ্চয় করতে পারে। মাকড়সা যখন জলের উপরে আসে, তখন পিছনের দুটি পা এবং পেটের খাঁজে বাতাসের একটা বুদবুদকে আটকে জলের নীচে নিয়ে গিয়ে বাসায় সেটা সঞ্চয় করে। বাপ মাকড়সা এবং মা মাকড়সা দুজনেই ক্রমাগতভাবে সেই ভালো বাসায় বাতাস সঞ্চয় করতে থাকে,খাবার তো যত্রতত্র পাওয়া যায়।

এইভাবে কয়েক সপ্তাহ ক্রমাগতভাবে হবু বর, বউ তাদের বাসায় বাতাসের বুদবুদ সংগ্রহ করতে থাকে। যখন সেই বাতাসের পরিমাণ  ভবিষ্যতের সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত মনে হবে, তখনই ওরা বাসর পাতবে। কুমারী অবস্থায় এই সঞ্চয়টুকু না সেরে ওরা দৈহিক মিলনে সম্মত হয় না। আশ্চর্য সংযমের পরিচয় দেয়।

অবশেষে মা মাকড়সা ডিম পাড়ে, ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। তার কিন্তু অক্সিজেনের অভাব হয় না। বাবা মায়ের সঞ্চয় তাদের জীবনের প্রথম পর্যায় পাড়ি দিতে সাহায্য করে। একটু বড় হলেই বাবা মা তাড়া লাগায় “বুড়ো ধাড়ি ছেলে, নিজের অক্সিজেন নিজে রোজকার করতে পারো না “? তাড়া খেয়ে খোকন বাসা ছাড়ে,ধীরে ধীরে নিজেই শিখে যায় বাতাসের বুদবুদ সংগ্রহের কৌশল।

২) শিকারী বোলতা
মা বোলতা বংশেরক্ষার তাগিদে মাটি দিয়ে বাসা বানায়, তাতে থাকে অনেকগুলো সুড়ঙ্গ। তার ভেতরে বোলতা ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে যখন বাচ্চা বেরোবে তখন খাবে কি? বোলতা বাসার মুখটা বন্ধ করার আগে সে গর্তে কিছু মশা, মাছি রেখে দেয়। সেগুলো কিন্তু মৃত নয়, মৃত মশা মাছি তো কয়েক সপ্তাহে পচে যাবে। বোলতা কোন মশা বা মাছি যখন শিকার করে, তখন তার হুলের বিষে সেগুলো অসাড় হয়ে যায়। বোলতা সেগুলোকেই গর্তে রেখে দেয়। বোলতার ডিম ফুটে যখন লার্ভা বেরোবে, তখন এই অসাড় মশা, মাছিরাই খাদ্যের যোগান দেবে।

এভাবেই দেখা যায় প্রাণিজগতের প্রতিটি প্রজননক্রিয়ার সাথে জড়িয়ে থাকে পরিণতবোধ, দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা। যৌনতা শুধুমাত্র দায়িত্বজ্ঞানহীন আমোদ নয়। প্রাণিজগত যদি সেই নিয়ম মেনে চলতে পারে, নিজেদের সর্বোত্তম প্রাণি বলে গর্বিত মানুষ কেন পারবে না। ইন্দ্রিয় সংযম পরিপূর্ণ হলে সৃষ্টি ব্যাহত হবে, সে পথ আধ্যাত্মিক পথের পথিকদের জন্য। কিন্তু সাধারণের জীবনকে শোভন, সুন্দর করে গড়ে তুলতে হলে যৌনতার সাথে একইসাথে অনুশীলন করতে হবে সংযম, দায়িত্বজ্ঞান, সময়জ্ঞান আর নিজের প্রস্তুতির। তা না হলে সমাজ অরাজকতার অতলে তলিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: না মানুষের পাঁচালী (নারায়ণ সান্যাল)।

ছবি সংগৃহীত

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img