হোমPlot1নবপত্রিকা কী? কেন গণেশের পাশে অধিষ্ঠান? কলা বউ কি সত্যিই গণেশের স্ত্রী?

নবপত্রিকা কী? কেন গণেশের পাশে অধিষ্ঠান? কলা বউ কি সত্যিই গণেশের স্ত্রী?

নবপত্রিকা কী? কেন গণেশের পাশে অধিষ্ঠান? কলা বউ কি সত্যিই গণেশের স্ত্রী?

ডঃ শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
মাতৃ আরাধনার এক অপরিহার্য অংশ নবপত্রিকা বা কলা বউ। এই প্রতীকটি কী এবং কেন, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই ভুল ধারণা রয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এই কলা বউ হল গণেশের স্ত্রী। কারণ, এই কলা বউয়ের অবস্থান সিদ্ধিদাতা গণেশের ঠিক পাশেই। কিন্তু এই ধারণা বহুল প্রচলিত হলেও, তা পুরোপুরি ভুল।

এই নবপত্রিকার অভিষেক এবং অধিবাস করা হয়। বেলতলায় যেমন দেবীর অধিবাস হয়, তেমনই নবপত্রিকারও অধিবাস হয়। নবপত্রিকা প্রবেশের আগে পত্রিকার সামনে দেবী চামুণ্ডার আবাহন ও পুজো করা হয়।

“রম্ভা, কচ্চী, হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্বদাড়িমৌ
অশোকা মানকঞ্চেব ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা”
অর্থাৎ কলা, কচু , হলুদ , জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধান  – এই নয়টি গাছই নবপত্রিকা। পূজার স্থলে নবপত্রিকার প্রবেশের মাধ্যমেই সূচিত হয় দেবীর পূজার মূল অনুষ্ঠান। নবপত্রিকা প্রবেশের পর দর্পণে সম্পন্ন হয় মায়ের মহাস্নান। এর পর অবশিষ্ট দিনগুলিতে নবপত্রিকা প্রতিমার অন্য দেবদেবীদের সঙ্গেই পূজিত হন।

সপ্তমীর দিন সকালে পুজোস্থলের নিকটবর্তী গঙ্গা, কোনও নদী বা কোনও জলাশয়ে নবপত্রিকা স্নান করানো হয়। এই নবপত্রিকা স্নানের জন্য প্রয়োজন হয় তেল-হলুদ, অষ্টকলস, পঞ্চরত্নের জল, পঞ্চ অমৃত, পঞ্চ শস্য, পঞ্চ গব্য, পঞ্চ কষায়, বৃষ্টির জল, ডাবের জল, শিশির, সমুদ্রের জল, তীর্থের জল, আখের রস, বরাহদন্ত মৃত্তিকা, সর্ব ঔষধি, মহা ঔষধি, পদ্মরেণু, চন্দন ইত্যাদি। স্নানের পর নয়টি গাছকে রেশমের দড়ি দিয়ে বাঁধতে হয়। এরপর সেটিকে নিয়ে যাওয়া হয় বেলতলায়। তারপর যে শাখায় জোড়া বেল থাকে, সেই শাখাটিকে কেটে জুড়ে নেওয়া হয় নবপত্রিকার সঙ্গে। এই সমন্বয়ই “পত্রিকে নবদুর্গাত্বম”।

ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবীর অধিবাস, বোধনের পাশাপাশি নবপত্রিকারূপী দেবী দুর্গাকে আবাহন করতে হয়। এই নবপত্রিকার প্রতিটি গাছেই দেবীর অধিষ্ঠান চিহ্নিত — কলায় ব্রহ্মাণী, কচুতে কালী, হলুদে দুর্গা, জয়ন্তীতে কার্তিকী, বেলে শিবা, ডালিমে রক্তদন্তিকা, অশোকে শোকরহিতা, মানকচুতে চামুণ্ডা ও ধানে লক্ষ্মী। এর পিছনে রয়েছে বর্ণ সাদৃশ্য। দেবী হরিদ্রাবর্ণ বলে হলুদে তাঁর দেবীত্ব। ডালিমে অধিষ্ঠান রক্তদন্তিকার।

এক্ষেত্রেও দাড়িমের রং এবং আকারের সঙ্গে সংযোগের সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। অন্যদিকে, তিনি জয়রূপিণী তাই জয়ন্তী। আবার তিনি মান প্রদান করেন বলে মানের সঙ্গে, শোকরহিতা বলে অশোকের সঙ্গে তাঁর যোগ। বেল ভগবান শিবের প্রিয় বলে বেলের সঙ্গে সংযোগে তিনি শিবা। তিনিই জীবের প্রাণ প্রদান করেন – তাই ধান্যরূপা। কোথাও কোথাও অবশ্য সমন্বয় ভাবনা আছে বলেও মনে হয়। কারণ মহিষাসুর বধের সময় দেবী কচু রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। তাই কচু। আবার শুম্ভ, নিশুম্ভ বধে দেবী জয়ন্তী রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। তাই জয়ন্তী।

বিশ্বাস করা হয়, এঁদের মধ্যে আছেন দেবী দুর্গার অষ্ট নায়িকারাও। তাঁর সহযোদ্ধা হিসেবে এই ব্রহ্মাণী, মাহেশ্বরী, বৈষ্ণবী, বরাহী, নারসিংহী, কৌমারী, ঐন্দ্রী ও চামুণ্ডা – তাঁকে সুরক্ষা প্রদান করেন। নবপত্রিকার এই নয় দেবী একত্রে ‘নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা’ নামে পূজিতা হন, যার মূল মন্ত্র – “নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ”।

কিন্তু নবপত্রিকার অবস্থান সিদ্ধিদাতা গণেশের পাশে কেন? এর উত্তর – ভগবান গণেশ অষ্টাদশ ঔষধি বৃক্ষের সৃষ্টিকর্তা। নব পত্রিকার বৃক্ষগুলি ঔষধি বৃক্ষের পর্যায়েই পড়ে। আবার দেবী তো নিজেই শাকম্ভরী। তিনি দুর্ভিক্ষ প্রশমনকারিণী, তিনি বৃষ্টি প্রদায়িনী। তিনিই তো অন্নপূর্ণা। তাই ধরিত্রীমাতা বা শস্যবধূর প্রতীক হিসেবে তাঁর অবস্থান তো ভগবান গণেশের পাশেই মানায়।

অনুমান করা যেতে পারে, একসময় দেবীর চিন্ময়ী রূপের আরাধনা হতো এইসব ঔষধি বৃক্ষ ঘিরেই। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে যে শস্য দেবীর কথা আছে হয়তো তিনিও মিশে রয়েছেন এর সঙ্গে – আমাদের এই দেবী বন্দনায়।

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img