হোমফিচারএত বিষ, এত বিদ্বেষ, এত ক্রোধ এল কোথা থেকে?

এত বিষ, এত বিদ্বেষ, এত ক্রোধ এল কোথা থেকে?

এত বিষ, এত বিদ্বেষ, এত ক্রোধ এল কোথা থেকে?

হিংসা,হানাহানিতে জ্বলছে দেশের রাজধানী দিল্লি। এই বিষ-বাষ্প এল কীভাবে? নিজের একান্ত অনুভূতির কথা লিখেছেন সাংবাদিক অনিমেষ বৈশ্য।

এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়।
হ্যাঁ, আমারই দেশ। আজকাল মারীতে গন্ডার মরলেও কেউ লেখেন, এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়।
তবে কার দেশ হে?
আমার দেশ না-হলে ভালো হতো। কিন্তু আমারই দেশ। আজ নয়, সেই কতকাল থেকে। ছোটবেলায় কালীপুজোয় পকেটে বন্দুক থাকত। আর থাকত রিল ক্যাপ। লাইন দিয়ে ফোঁড়ার মতো বারুদ। ফটাফট ফাটছে। আমার দেশ এখন রিল ক্যাপ। ফিতের মতো লম্বা বিষে ভরা বারুদ। ধর্মের বিষ, জাতের বিষ। মাঝে মাঝেই কেউ ফাটিয়ে দিচ্ছে। লোক মরছে ফটাফট। যেন পোল্ট্রিতে মড়ক। আর আমি বলছি, এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়। মিথ্যা মিথ্যা। আমারই দেশ।
এত বিষ ছিল কোথায়? কোথায় আবার? এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরেই ছিল। আমরা বুঝিনি। গান লিখেছি। সম্প্রীতির গান। একই বৃন্তে দুটি কুসুম ফুটিয়েছি, সাম্যের গান গেয়েছি। তার পর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছি। পাগলা মেহের আলির ডাক শুনিনি, সব ঝুট হ্যায়।

একদিনে এই বিষ আসেনি। বহুদিন কুলুঙ্গিতে ছিল বিষের কৌটো। হরিনাম করেছি, একটু বিষ ঢেলেছি। নমাজ পড়েছি, একটু বিষ ঢেলেছি। মুসলমান মরলে ভেবেছি, একটা ‘বিষ’ গেল। হিন্দু মরলে ভেবেছি, একটা আপদ গেল। আমরা কেউ কাউকে চিনিনি। চেনার চেষ্টাই করিনি।মুসলমান আমার কতকালের পড়শি। কিন্তু আমি কি জানি, কী করে মুসলমানের বিয়ে হয়, কী করে শ্রাদ্ধ হয়? জানি না। জানার চেষ্টাই করিনি। কোন মুসলমান দুর্গাঠাকুরের শোলার কাজ করেন, কোন মুসলমান অমুক পুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট–এসব লিখে নিজেকে বড় তালেবর ভেবেছি। টেরই পাইনি, শুধু কুলুঙ্গিতে বিষ জমেছে।
সেদিন এক বাবা বলছিলেন, আমার ছেলে মৌলানা আজাদ কলেজে ভর্তি হয়েছে। আমি বললাম, ‘ওটা তো খুব ভালো কলেজ। ভালোই হয়েছে।’ সেই বাবা বললেন, ‘ভালো, কিন্তু আমার ছেলে মুসলমান দেখতে পারে না।’ ছেলে দেখতে পারে না? নাকি বাবা পারে না? মৌলানা আজাদ কে, বাবা জানে? জিজ্ঞেস করিনি। কুলুঙ্গিতে বিষের ভাণ্ড। জিজ্ঞেস করে হবে কী! একই কথা কোনও মুসলমান বাবাও কি বলেন? নিশ্চয় বলেন। না হলে এত বিষ এল কী করে?

সেদিন একটা ছবি দেখলাম। একুশের বইমেলায় নমাজ পড়া হচ্ছে। বইমেলা কি নমাজ পড়ার জায়গা? না। কলকাতা বইমেলাতেও একটা হিন্দু দলের স্টল ছিল। বইমেলা কি ধর্ম নিয়ে বাওয়াল করার জায়গা? না। আসলে লোককে দেখানো, আমি আছি, আমরা আছি। যত আছি, বারুদের ফিতে তত লম্বা হচ্ছে।

তবু এমন তো সবাই ছিল না। কেউ কেউ ছিল। আমার বাড়ির উঠোনে মহরমের লাঠি খেলা হতো। মুসলমান শিক্ষক নিজ হাতে ধুয়ে দিতেন শিবমন্দিরের চাতাল। তবু এত বিষ?
ধর্ম আদৌ না-থাকলে কী হয়? মুসলমানের দাড়ি, হিন্দুর টিকি না-থাকলে কী হয়? দেখি না কী হয়! অন্তত কিছুকাল।
মন্দির নেই, মসজিদ নেই, গির্জা নেই—শুধু মানবের বাসা, শুধু পাখির ডাক, শুধু নদীর গান। হবে না জানি। তবু…

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img