হোমফিচারজন্মশতবর্ষে বিস্মৃত মোহিনী

জন্মশতবর্ষে বিস্মৃত মোহিনী

জন্মশতবর্ষে বিস্মৃত মোহিনী

সংযুক্তা সরকার সংযুক্তা সরকার

মুক্তির মন্দির সোপান তলে, কত প্রাণ হল বলিদান…..বাঙালি হৃদয় তোলপাড় করা এই গানের স্রষ্টা কবি ও গীতিকার মোহিনী চৌধুরী আজ বিস্মৃতপ্রায়। একের পর পর অবিস্মরণীয় গান লিখে যিনি একসময় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, সেই বিরল প্রতিভাধর মোহিনী চৌধুরীর এ বছর জন্মশতবর্ষ। এ উপলক্ষে বছরভর নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে মোহিনী চৌধুরী জন্মশতবর্ষ উদযাপন কমিটি। শুধু গান নয়, তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রেরও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কলকাতা নিউজ টুডে-র এই বিশেষ প্রতিবেদন। তাঁর জীবনের নানাদিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন আমাদের প্রতিনিধি সংযুক্তা সরকার।

গানের আসরে মান্না দে-র পিছনে দাঁড়িয়ে মোহিনী চৌধুরী। বাঁদিকে।

মনে পড়ে মোহিনী চৌধুরীকে? চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাট দশকের বিখ্যাত গীতিকার! উত্তরটা হলো, না। মনে পড়ে না। অধিকাংশ বাঙালির স্মৃতিতে এই নামটার অস্তিত্ব আজ ক্ষীণ। অথচ তাঁর গানে গলা দিয়েছেন জগন্ময় মিত্র, গীতা দত্ত, শচীনদেব বর্মন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পী। শোনা যায়, তাঁর একটি গান কোরাসে গাইতে গিয়েই নাকি রুমা গুহ ঠাকুরতার প্রেমে পড়েন কিশোরকুমার! ১৯৫৬ সালে মোহিনী চৌধুরীর তৈরি সিনেমাতেই আত্মপ্রকাশ সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের! তাঁরই লেখা সেই কালজয়ী গান ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে’। কানে ভেসে এলে আজও গায়ের রক্ত গরম হয় আপামর বাঙালির?

১৯২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্ম অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ায়। কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক ও আইএসসি পাশ করে
বিএসসিতে ভর্তি হন। সঙ্গীতের প্রতি নেশায় বিএসসি পরীক্ষা অসমাপ্ত রেখে গান লেখার সাথে যুক্ত হন। ১৯৪০ সালে কলকাতা জিপিও- তে চাকরিতে যোগদান করেন। তবে ভাগ্য বিধাতার নির্দেশে মাত্র আট বছর এই চাকরিতে ছিলেন মোহিনী চৌধুরী।

জিপিও-তে চাকরির পাশাপাশি তখনই গান লেখার শুরু।১৯৪৩ থেকে গ্রামোফোন রেডিও এবং চলচ্চিত্রের গীতিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ মোহিনীর। ‘রাজকুমারী ওলো, নয়নপাতা খোলো,সোনার টিয়া ডাকছে গাছে ওই বুঝি ভোর হল’ মোহিনী চৌধুরীর প্রথম গানের রেকর্ড। গানটি গাইলেন কুসুম গোস্বামী, কমল দাশগুপ্তর সুরে। জগন্ময় মিত্রের কন্ঠে, কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘ভালবাসা মোরে ভিখারী করেছে’, ‘আমি দূরন্ত বৈশাখী ঝড়, তুমি যে বহ্নিশিখা’, ছেচল্লিশ-সাতচল্লিশের সেইসব কালজয়ী গান থেকে শুরু করে ‘ভুলি নাই, ভুলি নাই, নয়নে তোমারে হারায়েছি প্রিয়া স্বপনে তোমারে পাই’ -এর গীতিকার? সেই মোহিনী চৌধুরী।

এইচএমভি-তে একটা গানের রেকর্ডিং চলাকালীন হেমচন্দ্র সোম এসে খবর দিলেন, শচীন দেব বর্মণ ডেকে পাঠিয়েছেন মোহিনীকে। হিন্দুস্থান পার্কের বাড়িতে দেখা করতে এলেন মোহিনী। নীতিন বসু তখন ‘বোম্বে টকিজ’-এর ব্যানারে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রজনী’ অবলম্বনে ‘সমর’ নামে একটা ছবি বানাচ্ছেন। তার জন্যই চাই একটা ঝুমুর গান। গানের সুরটা এসে গিয়েছে শচীন দেব বর্মণের মাথায়, কিন্তু ঠিক কী চাই, মোহিনীকে সেটা বোঝাতে ইচ্ছেমতো কয়েকটা কথা বসিয়ে নিলেন— ‘টঙ্গালি গো টঙ্গালি, নাকে মুখে চুনকালি।’ মোহিনী লিখলেন, ‘সুন্দরী লো সুন্দরী, দল বেঁধে আয় গান করি।’ গানটি গাইলেন কিশোরকুমারের ভাই অরুণকুমার আর গীতা দত্ত। কোরাসে ছিলেন কিশোরকুমার, রুমা গুহঠাকুরতা। পরে সুরের এই চলনই ‘অনুসন্ধান’ ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন রাহুল। কথার ধাঁচও এক— ‘ফুলকলি রে ফুলকলি।’ এর পর মোহিনীর একের পর এক গান শচীন দেব বর্মণের সাথে। ‘পিয়া সনে মিলন পিয়াস’, ‘ঝিলমিল ঝিলমিল,’ ‘চৈতি সন্ধ্যা যায় বৃথা’, ‘হায় কী যে করি এ মন নিয়া।’

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘অভিনয় নয়’ ছায়াছবিতে প্রথম গান লেখার সুযোগ পেলে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর লেখা গান ‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখো না বেঁধে আমায়’ কমল দাশগুপ্তের সুরে সত্য চৌধুরীর কন্ঠে আপামর বাঙালিকে আন্দোলিত করেছিলো। এরপরে ‘রায় চৌধুরী’ ছবিতে সহ-পরিচালকের কাজ শুরু করলেন মোহিনী। সেই সঙ্গে চলতে লাগল গান লেখা। এই সময়েই সরকারি চাকরিটাও ছেড়ে দিলেন। শচীন দেব বর্মণ তখন পাকাপাকি ভাবে মুম্বইয়ে থাকেন। মোহিনীকে সেখানে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন তিনি। সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন মোহিনী। কারণ তখন তাঁর ইচ্ছা, নিজে ছবি পরিচালনা করবেন। শুরু করলেন ‘সাধনা’ ছবির কাজ। কিন্তু ছবি শেষ করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হলেন। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স, স্ত্রীর গয়নাগাঁটি, সব চলে গেল। পাওনাদারদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে তাঁর বাবা তাঁকে তাড়িয়ে দিলেন বাড়ি থেকে। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে দেউলিয়া মোহিনী চেতলায় এক ভাড়াবাড়ির এক কামরার ঘরে কোনওরকমে মাথা গুঁজলেন।

১৯৫৪ সালে কলকাতা ছেড়ে মোহিনী চৌধুরী চলে গেলেন দিল্লি— বিজ্ঞানী তথা সাংসদ মেঘনাদ সাহার সংসদীয় সচিবের পদ নিয়ে। ভেবেছিলেন কলকাতা আর এখানকার সংস্কৃতি-জগতের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে দেবেন। কিন্তু মন টিকল না দিল্লিতে। তত দিনে ‘সাধনা’র মুক্তির সময় হয়েছে। সিনেমা ফ্লপ হল। মেঘনাদ সাহাকে কিছু না জানিয়েই হঠাৎ এক দিন চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ফিরে এলেন মোহিনী। ভাগ্যবিপর্যয় পিছু ছাড়ল না। বিখ্যাত শিল্পপতি দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের কাছে চাকরি পেলেন। সামান্য কিছু টাকা আসতে লাগল মাসে মাসে, কিন্তু গান আর ফিরে এল না সেভাবে। এরই মধ্যে দুই বছরের শিশুপুত্র আগুনে পুড়ে মারা গেল। শোকে দুঃখে পাগলের মতো হয়ে গেলেন মোহিনী। আত্মহত্যাও করতে গিয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে হাতে এল স্বামী বিবেকানন্দের ‘রাজযোগ’। ফিরলেন।

দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তখন বেশ কিছু সিনেমার প্রযোজক। পরিচয় করিয়ে দিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। হেমন্ত ‘নায়িকা সংবাদ’ ছবির জন্য দুটো গান লিখতে বললেন মোহিনীকে। উত্তমকুমারের লিপে কোনও গান লিখতে না পারায় মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন গীতিকার। ভেবেছিলেন তাঁর গান শ্রোতাদের মনে ধরবে না। কিন্তু সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গলায় ‘কী মিষ্টি দেখো মিষ্টি কী মিষ্টি এ সকাল’ আর ‘কেন এ হৃদয় চঞ্চল হল’, দুটো গানই সুপারহিট। এর পর ‘শুকসারী’ ছবিতে উত্তমকুমারের লিপে মোহিনীর লেখা গান গাইলেন মান্না দে— ‘সখি চন্দ্রবদনী, সুন্দরী ধনি।।।’

এই গান ক’টিই মোহিনীর লেখা শেষ সাড়া জাগানো গান। শেষ জীবনে অসহনীয় দারিদ্রের মধ্যে চলে মোহিনীর দিন গুজরান। জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বাংলা গানের জগতের জ্যোতিষ্ক ছিলেন এক সময়। ভেবেছিলেন, সেই সময়ের খানিকটা আলো শেষ জীবনে ছুঁয়ে যাবে। সেই আশা পূর্ণ হয়নি। ১৯৮৭ সালের ২১ মে রাতে স্টুডিওতেই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম রূপকার, মোহিনী চৌধুরী।আর কালের নিয়মে স্রোতের উল্টোদিকে হাঁটা, সমস্ত প্রতিকূলতাকে ভুলে গানের কলিতে হারিয়ে যাওয়া একটা লড়াই একটু একটু করে হয়তো মুছে যায় বাঙালির মন থেকে. সকলের অগোচরে।

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img