হোমফিচারহৃদয়ে রবিঠাকুর, মস্তিষ্কে বিবেকানন্দ। জীবন ও সমাজবোধের এক অনন্য মিশেল সোনাতলার সোনার...

হৃদয়ে রবিঠাকুর, মস্তিষ্কে বিবেকানন্দ। জীবন ও সমাজবোধের এক অনন্য মিশেল সোনাতলার সোনার ছেলে

হৃদয়ে রবিঠাকুর, মস্তিষ্কে বিবেকানন্দ। জীবন ও সমাজবোধের এক অনন্য মিশেল সোনাতলার সোনার ছেলে

সংযুক্তা সরকার সংযুক্তা সরকার

জন্মদিনে তাঁকে নিজে হাতে চিঠি লিখে শুভেচ্ছা-বার্তা পাঠান বিল ক্লিন্টন। আবার তাঁর নাম শুনলেই জ্বলজ্বল করে ওঠে আন্দামানের প্রত্যন্ত দ্বীপের গরিব-গুর্বো মানুষগুলোর চোখ।একনিমেষে।মানুষটি কিন্তু, তাঁর ভাষায়, কোনও ‘কেউকেটা’ নন। কোনও ডাকসাইটে নেতা-নেত্রীও নন। বলিউড-টলিউডের নামী তারকা কিংবা বিখ্যাত ক্রিকেটার? একেবারেই নন। তিনি এই রাজ্যের গ্রাম বাংলা থেকে উঠে আসা এক মাটির মানুষ।

একদিন কানাডার সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ আর গুছোনো বর্তমানকে সরিয়ে রেখে অগোছালো অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে, মাটির টানে, নাড়ির টানে, পাড়ি দিয়েছিলেন নিজের দেশে। ফিরে এসেছিলেন সেই চেনা গ্রাম বাংলায়। যেখানে রোদ-জল-বৃষ্টিতে ধুলো কাঁদা মেখে বড় হয়েছিল তাঁর ছোটবেলা। মাত্র কয়েকদিনের সিদ্ধান্তে ছেড়ে এসেছিলেন সুখ, সুস্থিতি। পা ফেলেছিলেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে। পুঁজি বলতে ছিল, কানে বিবেকানন্দের বাণী আর প্রাণে নিঃস্ব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংকল্প। বয়স তখন অল্প। রক্ত গরম। একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেলেছিলেন পেশায় সাংবাদিক, শান্তি রঞ্জন কাঁড়ার। আর সেদিনের সেই চ্যালেঞ্জটা কীভাবে যেন জিতেও গিয়েছেন আজকের প্রতিষ্ঠিত সমাজকর্মী।

জন্ম হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুর থানার সোনাতলা গ্রামে। সেখানেই প্রাথমিক পড়াশোনা। স্কুলের গন্ডি পেরোনো। তারপরে আমতা কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন। সাংবাদিকতার প্রতি ঝোঁক ছিল বরাবর। তাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর করতে গিয়ে বেছে নিয়েছিলেন সেই বিষয়কেই। এম এ পাশ করে সাব-এডিটরের চাকরি পেলেন কানাডার ম্যাকলিন হান্টার পত্রিকায়। এই পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু ভাগ্য দেবতার বোধহয় অন্য অভিসন্ধি ছিল।অফিসের ক্যাফেটিরিয়াতে প্রায়ই চা-কফির আড্ডা চলতো এক খ্রিস্টান মিশনারি বন্ধুর সঙ্গে।তাঁর কথাতেই একদিন চোখ খুলে গেল। নতুন করে ভাবনা শুরু সেই। উল্টো পথে। যে পথ জীবনের চিরাচরিত ‘বড়’ হওয়ার ধারণাটাকে বদলে দিলো।ভেঙেচুরে দিলো প্রথাগত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার, বড়লোক হওয়ার, নির্ঝঞ্ঝাট ও নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলোকে।তাঁর বদলে মনের ভেতর দানা বাঁধলো নিজের দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছে। অদম্য টান। মাটির প্রতি। দেশ-মায়ের প্রতি। পরিবারের অনেকে শুনে রে রে করে উঠেছিল সেদিন। কিন্তু কোনও ‘না’ তিনি শোনেননি।

দেশে ফিরে গ্রামেরই কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে তৈরি করলেন ক্লাব, ‘ফ্রেন্ডস সোসাইটি’। ব্রত হলো আর্ত, দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের সুখ-দুঃখের সাথী হওয়া। সেদিন সেই গ্রাম থেকে শুরু হওয়া সমাজসেবার আলো একের পর এক কাঁটাতার, সীমান্ত পেরিয়ে আজ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। কালক্রমে এনজিও হিসেবে ইউনাইটেড নেশনসের স্বীকৃতি পেয়েছে ‘ফ্রেন্ডস সোসাইটি সোশ্যাল সার্ভিস। টিম নিয়ে কখনও ছুটে গেছেন সুদান, নেপাল, আন্দামান। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা, দেশ, বৈষম্যের কোনও পাঁচিলের তোয়াক্কা না করেই অসহায় মানুষের সাহায্য করে চলেছেন নিয়মিত। কখনও অর্থনৈতিক মন্দা ও গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সুদানে, কখনও সুনামি পরবর্তী আন্দামানে। বনগাঁর বন্যা হোক কিংবা ওডিশার সুপার সাইক্লোন, মায়ানমারের বিধ্বংসী ঝড়ের তান্ডব। সবসময় সবার আগে ত্রাণ নিয়ে হাজির থেকেছেন শান্তিবাবু ও তাঁর বন্ধুরা। বাঁধাও এসেছে কখনও কখনও। সবদিক সামাল দিতে গিয়ে অর্থ সংকটে হাতের গয়না খুলে দিযেছেন স্ত্রী, স্নিগ্ধা কাঁড়ার। শুধু তাই নয় এই কর্মযজ্ঞে রীতিমতো সামিল হয়েছেন স্নিগ্ধা দেবী। ভয়কে জয় করেছেন। স্বামীর সঙ্গী হয়েছেন একের পর এক বিপদসঙ্কুল এলাকায়। কোমড় বেঁধে নেমেছেন আর্তজনের সেবায়।

জীবনের সেই চর্যাপদ, সেই মানবতার পাঠ পড়াতেই এবারে ব্রিটেনের উদ্দেশে যাত্রা করলেন শান্তিবাবু। সেখানকার তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়; ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ হ্যাম্পটন, রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন, ডে মন্টফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে (লেস্টার ) ছাত্রছাত্রীদের সামাজিক কর্ত্যব্যের শিক্ষা দেবেন বাংলার এই গ্রামের ছেলে। নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। থাকবে বিজনেস এথিক্স বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পনসিবিলিটির মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা, প্রশ্নোত্তর।

জীবনে আজ আর কোনও খেদ নেই। কোনও আফসোস নেই।কানাডায় ফেলে আসা সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের মায়া ভুলিয়ে দিয়েছে নেপালে দেখা সেই বৃদ্ধার হাসি। ২০১১-র সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর যাঁর হাতের থালায় একমুঠো ভাত-ডাল তুলে দিয়ে শান্তি পেয়েছিলেন শান্তি কাঁড়ার। টানা তিন-চারদিন উপোসের পর ওই খাবারের সঙ্গেই যেন ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন সেই বৃদ্ধা। জীবন-মৃত্যুর থেকেও সেই অশীতিপর মানুষটির দৃষ্টির আকুতি আরও বড় কোনো প্রাপ্তি এনে দিয়েছিলো শান্তিবাবুর ঝুলিতে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পাড়ি দিয়েছিলেন আফ্রিকার সুদান। ইউনাইটেড নেশনসের বিশেষ বিমানে পৌঁছেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায়। মনে পড়ে আন্দামানের নেইল দ্বীপের গ্রামবাসীদের সেই সরল, সহজ মুখগুলো। ঢাক-কাঁসর, ফুল-মালা নিয়ে যাঁরা তাঁর পথ চেয়ে থাকতো। কীভাবে যেন তাঁদের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন। জীবনের ছন্দেই জীবন আর জীবিকা কবে যে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বুঝতে পারেননি। শুধু এটুকু খুব স্পষ্ট বুঝেছেন, ওপরওয়ালা একজন আছেন। আর তিনিই সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রক। নাহলে হয়তো তাঁর জীবনের গল্পটাও অন্য খাতে বইতো।

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img