বিকাশ পাল
রবীন্দ্রনাথ হলেন ভারতের শেক্সপিয়ার। এই কথাটার ইংরেজি অনুবাদ করতে বললেন আমাদের ক্লাস এইটের ইংরেজির স্যার কানাইবাবু। চোখে মোটা আর কালো ফ্রেমের চশমা। একটু বেঁটেখাটো চেহারা। সব সময় সরু কালো পাড়ের সাদা ধুতি আর ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবী পরে ক্লাসে আসতেন। বাড়ি ফেরার সময় সাধারণত হাতে লম্বা ছাতা আর কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগ থাকত।
ক্লাসের প্রায় সবার নামই মনে রাখতেন। তাই নাম ধরে ধরে পড়া জিজ্ঞেস করতেন। সব ছেলেমেয়েদের নাম মনে রাখা শিক্ষকের এক বিশেষ গুণ। ইংরেজি প্রবন্ধ আগে নিজে পড়তেন। বলতেন সবাই ভালো করে শোন্। যাতে আমরা বুঝতে পারি, তার জন্য স্যারের কত চেষ্টা আর কত নিষ্ঠা।
আমার এখনও তাঁর ক্লাসের পড়ানোর সেই দিনগুলোর স্মৃতি একটুও আবছা হয়নি। আমায় বললেন, “বিকাশ পাল , এইটার ইংরেজি বল আর শেক্সপিয়ারের ইংরেজিতে বানান বল।” যথারীতি ভুল বললাম। Sexpeare. অমনি মনে মনে বিরক্ত হয়ে চোখ বড় করে কিছুক্ষণ আমাকে দেখলেন। কিছু বললেন না। তারপর সঙ্গে সঙ্গে নিজের মনকে সংযত করে এক হাতে হাত ঘষে বললেন এই ভাবে মনে রাখবি বানানটা Sha(শ) kesh(কেশ) pear( পিয়ার) e ( ই) – শ-কেশ-পিয়ার-ই ।
আমি প্রায় বিশ বছরের বেশি Shakespear-এর দেশের বাসিন্দা । বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি আর এখন পড়াচ্ছি। ইংরেজি ভাষায় ততটা তুখোড় না হলেও কাজ চালাতে পারি । আর সেসব করতে গিয়ে এখনও আমার অনেক বানান ভুল হয়। কিন্তু Shakespeare বানান কোনোদিন ভুল হয় না। এটাই আমার জীবনে কানাইবাবুর দান।
কানাইবাবুর ছেলে অসীম আমাদের সাথে পড়ত। কানাইবাবুর মেয়ে লিপিকাদি আমাদের চেয়ে এক ক্লাস ওপরে পড়ত। অন্নপূর্ণার বাসস্টপ থেকে নেমে ঘন সবুজ কচুরীপানায় ভরা খালের সরু বাঁধ রাস্তা ধরে ২০০-৩০০ মিটার মত হাঁটলে অসীমদের সিমেন্টের খুঁটি কাঠের কাঠামো আর টালি আ্যসবেসটস দিয়ে ছাওয়া দক্ষিণদুয়ারী দোতলা বাড়ি। সে সময় ময়নায় এই ধরনের শক্ত পোক্ত বাড়ি সাংসারিক স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতীক। কানাইবাবু ভীষণ ভদ্র, মিতবাক আর নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ।
সেই সময় (১৯৮১-৮৪) একবার আমার মুকসুদপুরের বাড়ি থেকে স্কুলের হস্টেলে যাচ্ছি, প্রায় ৬০ কিমি রাস্তা। যান্ত্রিক গোলোযোগের কারণে রাস্তায় বাস বিকল হয়ে যাওয়ায় পরের বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। তখন ময়নায় বাস ঘন ঘন ছিল না, তাই অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হোত। অন্নপূর্ণা পৌঁছনোর অনেক আগেই প্রায় জলচকের কাছাকাছি সন্ধ্যা নেমে এল । যখন বাস থেকে নামলাম চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার । দু’একটি ছোটখাট দোকান পাট, লন্ঠন হ্যারিকেনের আলো টিম টিম করে জ্বলছে। সেই আলোয় খালের রাস্তা ভালো করে ঠাহর করতে পারছি না। সরু রাস্তা। হাঁটতে গিয়ে একটু পা ফসকালেই একেবারে পিছলে পানা হদের মধ্যে চলে যাবো। সংগে বই জামা কাপড় আর মুড়ির ব্যাগ। কিন্তু ১০০ মিটার পরে সেসব দোকানপাট নেই, আলোও নেই । কিন্তু রাস্তা দেখতে অসুবিধা হচ্ছে না। কিছুক্ষণ অন্ধকারে চোখ খোলা রাখলে সে নিজেকে মানিয়ে নেয়। তখন আঁধারের মধ্যেই আলোর অনুভুতি হয়। ঠিক যেন অরূপের মধ্যে রূপের দর্শন।
রাস্তার উপর সরু সরু বাঁকা হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা অর্জুন গাছের পাতায় জোনাকীর আলোয় রাস্তা এবার বেশ স্পষ্ট। কিন্তু আমার আবার সাপকে ভীষণ ভয়। তাই প্রায় দেড় দু’মাইল রাস্তা ওইভাবে যেতে সাহস হচ্ছিল না। একা কী করি? জানতাম ১০০ মিটারের মধ্যে অসীমদের বাড়ি। তাই কাঠের তক্তা পাতা পোল না পেরিয়ে খালের দক্ষিণ দিকের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম। বাড়ির কাছাকাছি আসার পর দেখতে পেলাম দোতালায় হ্যারিকেনের আলো জ্বলছে। একেবারে নীচে আলকাতরা মাখানো বাঁশের বাতা দিয়ে বাড়ির উঠোনের গেট। ডাক দিলাম অসীম বাড়ি আছিস্ ?
কে এসে দরজা খুলেছিলেন মনে নেই আজ। বোধ হয় স্যারের স্ত্রী। মনে আছে দোতলায় গিয়ে বারান্দায় কানাইবাবুর সাথে দেখা হল। টেবিলে বসে বই পড়ছিলেন হ্যারিকেনের আলোয়। তিনি শিক্ষক তাও রাত্রে কীসব পড়াশোনা করছেন। তখন ভাবিনি । এখন ভাবলে অবাক হই । এই প্রজন্মের স্কুলের ছেলেমেয়েরা বাড়িতে বিদ্যুতের কত উজ্জ্বল আলোতেই আজকাল পড়তে চায় না। বাড়িতে কোনও কিছুরই অভাব নেই। তাই জীবনে তাগিদও নেই। এখন ছেলেমেয়েদের জীবনে অভাবেরই বড্ড অভাব। সময়ের সাথে জীবন বদলে যায়। মানুষের অভ্যাস বদলে যায়। এটাই সময়ের নিয়ম, এটাই জীবনের নিয়ম।
সেদিন কানাইবাবু বুঝতে পারলেন রাতে স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছি । বললেন রাতে আমাদের বাড়িতে থেকে যা। কাল সকালে মুড়ি খেয়ে যাবি। রাতে কই মাছের ঝোল দিয়ে রাঙা চালের ভাত। কত পুষ্টিকর খাওয়ার। আমি ছাত্র , কিন্তু অতিথি । তাই বড় কাঁসার থালায় সুন্দর গোল করে সাজানো ভাত আর আলু ভাজা। বাটিতে মাছের ঝোল। পরের দিন সকাল সকাল হস্টেলে পৌঁছে গেলাম।
২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর রাতে আবার অন্নপূর্ণা থেকে নেমে স্কুলে যাচ্ছি। সেদিন আমার সাথে বিশ্বজিৎ মাল। সে অনেক পরে স্কুল থেকে পাশ করেছে। হাল আমলে তার সাথে আলাপ হয়েছে। কেন জানি না সে আমায় বেশ মানে। সে আমায় গাড়ি নিয়ে অন্নপূর্ণায় নিতে এসেছে । এখন অন্নপূর্ণা আলোয় আলোকময় । কত বড় বড় সুন্দর সুন্দর সব পাকা বাড়ি। কত গাড়ি । মানুষের কত হাঁক ডাক আর কত আয়োজন । কাঠের সেই পোল আর নেই । প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার দৌলতে সব রাস্তা এখন পাকা। কত কালভার্ট তৈরি হয়েছে। সেই সব অর্জুন গাছও আর খুব একটা চোখে পড়ল না। ঠিক ১০০ মিটারের মধ্যে কালভার্ট পেরিয়েই দেখি অসীমের দোকান। সে গ্রামেই থেকে গেছে। গাড়ি দাঁড় করিয়ে তাকে আমার নাম বললাম। সে তখন সারাদিনের বেচাকেনার হিসাব সারতে ব্যস্ত। তবু ৪০ বছর পর সহজেই চিনতে পারল। স্যারের কথা জিজ্ঞেস করলাম। বলল, বাবা বয়সের ভারে কোথাও তেমন একটা বেরোন না। বাড়িতেই থাকেন। জানতে চাইলাম কালকে স্কুলের অনুষ্ঠানে কি উনি আসবেন?
অসীম বলল, বাবাকে নেমত্তন্ন করেছেন কমিটির থেকে । কিন্তু এই শরীরে বাবা কাল যাবে না । আমি বললাম, “দেখা করে প্রণাম করতে পারবো আজ? দেখলাম অসীম হঠাৎ এই প্রস্তাবে খুব একটা উৎসাহিত বোধ করল না। বলল বাবা এখন হয়ত শুয়ে পড়েছেন রে । স্বাভাবিক ৮৮ বছর বয়স। আমায় শেক্সপিয়ারের বানান শেখানো মাস্টারমশাই কানাইবাবুর সাথে আর দেখা হল না। বিশ্বজিৎ আর আমি গাড়ি নিয়ে স্কুলে পৌঁছে গেলাম। সেদিন রাতে কানাইবাবু, রাস্তার দুপাশে অর্জুন, বাঁশ কলাগাছ , দীপশিখা ক্লাবের মাটির টালির বাড়ি কিছুই আর দেখা হল না। সত্যিই তাঁদের ১৯৮০-৮৪ তে যেমন দেখেছিলাম তেমন তো তারা আর নেই, তাই আফসোস করে কী করবো। জীবনের নামই তো গতি। পেছনের দিকে তাকিয়ে কী করি এখন।
কিন্তু বয়স নয় নয় করে ষাটের কাছে। তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। এই বয়সে গতির চেয়ে স্থিতিই ভালো। বিশেষ করে চংরাচকের যে তিন চার বছর ছিলাম সেই জীবন ছিল আমার সাধনা আর আরাধনার জীবন। সেই সাধনায় কতটা সিদ্ধিলাভ করেছি সেটা আমি বলতে পারবো না। কিন্তু এখন যা কিছু করি বা করতে পারি সে সবই আমি সেই সাধনার ফল হিসেবে দেখি। আমার যে সাধনায় ইন্ধন যুগিয়েছেন কানাইবাবুর মত মানুষেরা। চংরাচকের আলো , আকাশ , বাতাস, মাটি , জল , রাস্তা আর গ্রামের গাছ গাছালি , তাই আমার জীবন জুড়ে আছে।
গত শনিবার লন্ডন থেকে কিছুদিনের জন্য কাজে চিনদেশের কয়েকটি শহরে এসেছি । সোমবার চঙ্কিঙ্ শহরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতায় ব্যস্ত ছিলাম । দুপুরে ফোনে দেখলাম বিশ্বজিৎ কানাইবাবুর চলে যাওয়ার দুঃসংবাদটি পাঠিয়েছে। শ্রদ্ধেয় এন সি মাল-দাও পাঠিয়েছেন । সাততলার প্রেক্ষাগৃহ থেকে সব শ্রোতাদের বিদায় জানিয়ে কিছুক্ষণ বিষণ্ণ চিত্তে গাড়িতে হোটেলে ফিরলাম। বিকেলে অন্য কাজ। পুরনো দিনের কথা মনে পড়ল। সেই কানাইবাবুর হাতের তালুতে হাতে ঘষে ইংরেজি বোঝানোর সচেষ্ট আর সনিষ্ঠ চেহারাটা চোখের সামনে ভোরের শুকতারার মতই ভেসে উঠল। হোটেলের ১৬ তলার উপর থেকে চঙচিং শহরের আকাশ সীমা , অট্টালিকার সারি , দূরের পর্বত মালা আর ইয়াং সিকিয়াং নদীর যুগ-যুগান্তর ধরে বিরামহীন জলধারা আজ আমার অতীতকে ফিরে দেখার সাক্ষী হয়ে থাকল।
“সমুখে শান্তি পারাবার
ভাসাও তরণী হে কর্ণধার”
রবীন্দ্রনাথ
লন্ডন-প্রবাসী ডঃ বিকাশ পাল ইম্পিরিয়াল কলেজের ফ্যাকাল্টি। বর্তমানে তিনি ইলেকট্রিক পাওয়ার সিস্টেমের অধ্যাপক। এছাড়া, আইইইই, রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (ব্রিটেন), চাইনিজ সোসাইটি অফ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (আইএনএই)-এর মতো বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে ফেলোর সম্মানে সম্মানিত।



