হোমPlot1নিশ্চিহ্ন হবে তৃণমূল? মমতা কি অস্তাচলে?

নিশ্চিহ্ন হবে তৃণমূল? মমতা কি অস্তাচলে?

নিশ্চিহ্ন হবে তৃণমূল? মমতা কি অস্তাচলে?

হতে পারতেন তিনি বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সর্বকালের সেরা মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে ধিকৃত, নিন্দিত, ঘৃণিত এবং কলঙ্কিত ব্যক্তির নাম হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যে বিপুল জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কালক্রমে তিল তিল করে তিনি নিজেই ধ্বংস করেছেন তাঁর সেই ভাবমূর্তিকে।

রাজনৈতিক মহলে এখন যে প্রশ্নগুলি বারবার উঠে আসছে, তা হল, এখন মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী? তিনি কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন? তৃণমূল কি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে? নাকি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটা বড় অংশের মতে, মমতার পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো অত্যন্ত কঠিন। এর পিছনে কয়েকটি কারণকে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

প্রথমত হল, তাঁর বয়স এবং শারীরিক সক্ষমতা। তাঁর বয়স সত্তর পেরিয়ে গিয়েছে। বয়সের কারণে আগের মতো দৌড়ঝাঁপ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এবারের ভোটপ্রচারের সময় তা বিশেষ নজরে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, শারীরিক কারণে মমতা যদি অভিষেক ব্যানার্জিকে নেতৃত্বে তুলে আনেন, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে? নেতা হিসেবে দলের নেতাদের কাছে অভিষেকের গ্রহণযোগ্যতা এখনও সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশেষত দলের প্রবীণ নেতারা অভিষেককে নেতা হিসেবে মানতে নারাজ। ইতিমধ্যেই একাধিক ঘটনায় তা স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে।

নির্বাচনে শোচনীয় বিপর্যয়ের পর দলের নেতাদের একাংশ অভিষেকের বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও শুরু করেছেন। অভিষেক মমতার অঘোষিত উত্তরসূরী হতে পারেন। কিন্তু তাঁর দল পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিষেক কর্পোরেট স্টাইলে দল চালানোয় বিশ্বাসী। তাই আইপ্যাকের মতো পরামর্শদাতা সংস্থার হাতে তিনি যেভাবে তৃণমূলের কর্তৃত্ব তুলে দিয়েছেন, তা দলের সাধারণ নেতা কর্মীদের একেবারেই না-পসন্দ। সেইসঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগ। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার আগামী দিনে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে টআশ্চর্য হব না।

মমতার কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, দলকে অক্ষত রাখা। কিন্তু তিনি তা পারবেন কি? আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলে, তাতে আশ্চর্য কিছু থাকবে না। ইতিমধ্যেই বিজেপি জানিয়ে দিয়েছে, তারা তৃণমূলের কোনও নেতাকর্মীকে দলে নেবে না। সেক্ষেত্রে দল ছেড়ে তৃণমূলের নেতা, বিধায়ক বা সাংসদরা কংগ্রেসের দিকে পা বাড়াতে পারেন। বিরোধী দলের নেতাদের ভাঙিয়ে এনে  তৃণমূলের পতাকা হাতে ধরানোর যে সংস্কৃতি মমতা চালু করেছিলেন, এখন তাঁকে তার মাশুল গুনতে হবে।

সবচেয়ে বড় কারণটি হল, মমতার বিশ্বাসযোগ্যতায় চিড় ধরেছে। একসময় বাংলার মানুষের যে আস্থা তিনি অর্জন করেছিলেন, একের পর এক ঘটনা সেই বিশ্বাসের ভিত টলিয়ে দিয়েছে। এবারের ভোটের ফলই তার বড় প্রমাণ। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, একের পর এক চুরি, দুর্নীতি থেকে রাজ্যজুড়ে অরাজকতা, গুন্ডারাজ কায়েম, সবকিছুর পিছনেই মমতার প্রশ্রয় বা মদত রয়েছে। তা না হলে, শাহজাহান, জাহাঙ্গিরদের মতো দুর্বৃত্তরা তৈরি হল কী করে? বাংলার গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায় তৈরি হয়েছে শত শত শাহজাহান, জাহাঙ্গির। প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে তিনি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। তাই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে গ্রামবাংলার অত্যাচারিত মানুষ উজাড় করে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।

১৯৭৭-এ কংগ্রেসের পতন ঘটিয়ে রাজ্যে বামশাসনের সূচনা হয়েছিল। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পথ ধরে ২০১১তে সেই বামেদের ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন মমতা। এবার সেই মমতাকেই বিপুল ভোটে হারিয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে,  এই রাজ্যের মানুষ কোনও দলকে একবার ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেললে, তাদের আর ক্ষমতায় ফেরায় না।

বলতে গেলে, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সায়াহ্নে চলে এসেছেন মমতা। এই মুহূর্তে তাঁর দলে ৮০ জন বিধায়ক, লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে ৪২ জন সাংসদ রয়েছেন। ক্ষমতা হারানোর পর ১০ বছরের মধ্যেই অত্যন্ত সংগঠিত দল সিপিএমের আসন সংখ্যা শূন্যে নেমে এসেছিল। যদিও এবারের বিধানসভায় তাদের একজন বিধায়ক রয়েছেন। সিপিএম ব্যক্তিনির্ভর দল নয়। তাই তাদের ক্ষেত্রে আগামী দিনে যতটুকু ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে, তৃণমূলের পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ, তৃণমূল পুরোপুরি মমতা-কেন্দ্রিক দল।

নিজের অস্তিত্ব যে বিপন্ন হতে চলেছে, তা নিজেই আঁচ করতে পেরেছেন মমতা। তাই সম্ভব নয় জেনেও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর শপথ গ্রহণের দিনেই তিনি দেশের বাম, অতিবাম ও জাতীয় শক্তিগুলিকে একজোট হওয়ার ডাক দিয়েছেন তিনি, যা তৎক্ষণাৎ বাতিল করে দেয় বাম ও কংগ্রেস।

অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের টানা ৩৪ বছরের একটানা শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা, যা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। সিপিআইএম রাজ্যে একচ্ছত্র দলীয় শাসন কায়েম করেছিল। সেই দলকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব, তা ভাবনার অতীত ছিল। বলতে গেলে, একার হাতে সেই অসাধ্যসাধন করেছিলেন মমতা, যা তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করা হয়। সেই ঘটনার পনেরো বছরের মাথায় যেভাবে মমতা বিরোধী মঞ্চ গড়ার আহ্বান জানালেন, তা থেকে স্পষ্ট, নির্বাচনী বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে তিনি আবার নিজের মতো করে ঘর গোছানোর চেষ্টার পাশাপাশি রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন।

দক্ষিণ কলকাতার যোগমায়া দেবী কলেজের ছাত্রী সংগঠনের মাধ্যমে কংগ্রেসি রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি। তারপর পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংসদীয় ও পরিষদীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন। ১৯৭৬ সালে মমতা যখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহিলা কংগ্রেস (আই)-এর সাধারণ সম্পাদক হন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১ বছর। কয়েক বছর পর তিনি হন নিখিল ভারত যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক। লড়াকু মানসিকতা এবং প্রবল পরিশ্রম করার ক্ষমতাই তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি। রাজনৈতিক জীবনে বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়েছেন। ২০০১ সালে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে হারের পর তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু নিজের নেতৃত্ব-গুণে সেইদলকে পুনর্গঠিত করেন তিনি।

১৯৮৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর কেন্দ্রে সোমনাথ চ্যাটার্জির মত প্রবীণ সিপিএম নেতাকে হারিয়ে রাজনীতির জগতে নজর কেড়ে নিয়েছিলেন মমতা। হয়ে উঠেছিলেন ভারতের কনিষ্ঠতম সাংসদদের অন্যতম। মমতার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার সেই শুরু। দ্রুত তিনি দিল্লিতেও তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নজরে পড়ে যান।

এর পর ১৯৮৯ সালে নির্বাচনে যাদবপুরে হেরে যান তিনি। ১৯৯১এ আবার কলকাতা দক্ষিণ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে লোকসভার সদস্য হন।  ২০১১ পর্যন্ত তিনি লোকসভার সদস্য। ওই বছর তৃণমূল রাজ্যে ক্ষমতায় এলে, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৯১-এ পি ভি নরসিমা রাওয়ের আমলে কেন্দ্রে প্রতিমন্ত্রী হন মমতা। আর প্রথম পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব পান ১৯৯৯ সালে। তখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার।

কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে মমতা তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাম-শাসিত পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয় তৃণমূল। ২০০৫ থেকে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প স্থাপনের জন্য কৃষিজমি অধিগ্রহণের ঘটনাকে ঘিরে গণঅসন্তোষ তৈরি হতে থাকে। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে কৃষকদের জমি রক্ষায় পাল্টা আন্দোলন গড়ে তোলেন মমতা। নন্দীগ্রামে আন্দোলনরত জনতার ওপর পুলিশের গুলিতে ১৪ জনের নিহত হওয়ার ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার-বিরোধী মনোভাব জোরদার হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের চেয়ে বেশি আসনে জয়ী হয় তৃণমূল। এর দু’বছর পর বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে তৃণমূল ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটায়।

মমতা হলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী। ২০১৬ এবং ২০২১এর বিধানসভা নির্বাচনেও বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয় তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১১ পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূলত বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায়।  পশ্চিমবঙ্গ থেকে বামফ্রন্টকে হঠানোই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। আর এর পরবর্তী ১৫ বছর তিনি ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। মুখ্যমন্ত্রিত্বের এই পনেরো বছরে দুর্নীতির অভিযোগ তাঁকে ও তাঁর দলকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। তবে শুধু দুর্নীতিই নয়, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও তিনি শিল্প টানতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। গত দেড় দশকে রাজ্যে কোনও বড় শিল্প গড়ে ওঠেনি, কোনও বড় লগ্নিও আসেনি।

যাই হোক, নিজের রাজনৈতিক জীবনের এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মমতা। এখন দেখার বিষয়, দলের কোন্দল তিনি কতটা সামাল দিতে পারেন এবং দলকে কতটা অটুট রাখতে পারেন। তবে একটা কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, মমতার পক্ষে খুব দ্রুত কিছু করা অসম্ভব। সবে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তাদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আর মমতার ওপর বাংলার মানুষের সেই বিশ্বাসযোগ্যতাও নেই, যা তাঁকে হারানো জমি ফিরে পেতে সহায়তা করতে পারে।

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img