এক মাস পেরিয়ে গেলেও, ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধ সমাপ্তির এখনও পর্যন্ত কোনও আশা দেখা যাচ্ছে না। ইরানের দাবি, যুদ্ধে ৮০০ মার্কিন সেনা এবং ১৩২১ জন।ইজরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। ইরানের হামলায় পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার ১৩টি সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই তথ্য জানিয়েছে, মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। ঘাঁটি ছেড়ে মার্কিন সেনারা এখন অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের দাবি অনুযায়ী, যে ১৩টি সামরিক ঘাঁটি ধ্বংসের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে কুয়েতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কুয়েতের পোর্ট শুয়াইবা, আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটি এবং বুয়েরিং সামরিক ঘাঁটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আকস্মিকভাবে যৌথ হামলা চালাতে শুরু করে আমেরিকা ও ইজরায়েল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৭ দিনে মৃত্যুর সংখ্যা তুলে ধরেছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। ইরানের উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলী জাফরিয়ান জানিয়েছেন, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৯৩৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৪০ জন নারী এবং ২১২ জন শিশু। এছাড়া প্রায় ৪ হজার নারী ও ১ হাজার ৬২১ জন শিশুসহ ২৪ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে কমপক্ষে ৩,৩০০ জন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি বলেছে, নিহতদের মধ্যে ১,৪৬৪ জন সাধারণ নাগরিক, যাদের মধ্যে অন্তত ২১৭ জন শিশুও রয়েছে।
ভয়াবহ এই যুদ্ধের কারণে ইরানের বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৩২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এটি ইরানের মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশেরও বেশি। প্রাণভয়ে সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে শুরু করায় বড় ধরনের শরণার্থী সঙ্কটের আশঙ্কায় রয়েছে ত্রাণ সংস্থা ও ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলি।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে আরও ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন। তেহরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রস্তুতির পাশাপাশি সামরিক শক্তি ও বিকল্পগুলো আরও বাড়াতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পদক্ষেপ নিতে পারেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এরই মধ্যে লেবাননে প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,১১৬ জনে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়েছে। শুধু প্রাণহানিই নয়, যুদ্ধের এই তীব্রতায় আহতের সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। লেবাননের বিপর্যয় ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দপ্তর জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত আহত হয়েছেন ৩,২২৯ জন।
শনিবার জানা গেছে, ইরান তাদের দেশ থেকে প্রায় ৩,৮০০ কিলোমিটার দূরত্বে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ ঘাঁটির দিকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। যদিও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দ্বীপে পৌঁছতে পারেনি, তবে এই ঘটনাটিতে ইরানের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতদিন বিশ্বাস করা হত যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ সীমা দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত।
তেহরানের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের আনাচকানাচে কিছুক্ষণ পরপর শোনা যাচ্ছে বিস্ফোরণের শব্দ। মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ চলছে, তা এখন আর শুধু রণক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এই সামরিক সংঘাত দ্রুতই একটি বিশাল ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের রূপ নিচ্ছে।



