নয়ন বিশ্বাস রকি
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সুইস ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক SNB-এর সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। ২০২৫ সালে সুইস ব্যাঙ্কগুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক ও ব্যাঙ্কগুলির জমা অর্থের পরিমাণ ৪১.৪৯% বেড়ে ৮৩৪.২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ বা প্রায় ১২,৭৬৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি ২০২১ সালের ৮৭১.১ মিলিয়ন ফ্রাঁর পর গত এক দশকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমানত।

আগে বলা হত শেখ হাসিনার আমলে টাকা পাচার হয়। এখন ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সহযোগী ২ বছরে ৪১% বৃদ্ধি কীভাবে প্রচার হচ্ছে? এই টাকা কারা পাচার করছে? সুইস ব্যাঙ্কে টাকা কারা রাখে, তা কি দেশবাসী জানেন না?
. তথ্য-উপাত্তে চিত্রটা কী বলছে?
সালসুইস ব্যাঙ্কে বাংলাদেশি আমানতের পরিমাণ:
2021 ৮৭১.১ মিলিয়ন CHF ১৩,৩০ কোটি টাকা, সর্বকালীন রেকর্ড
2023 ১৭.৭ মিলিয়ন CHF ২৬৪ কোটি টাকা ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন
2024 ৫৮৯.৫ মিলিয়ন CHF ৮,৮৩৪ কোটি টাকা ৩ গুণ বৃদ্ধি
2025 ৮৩৪.২ মিলিয়ন CHF ~১২,৭৬৩ কোটি টাকা ৪১% বৃদ্ধি, ২য় সর্বোচ্চ
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: SNB-এর ২০২৫ রিপোর্ট বলছে, মোট আমানতের ৯৮.৬% বা ৮২.৭ মিলিয়ন CHF রেখেছে বাংলাদেশি ব্যাঙ্কগুলি। ব্যক্তি গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট কমেছে ১০%। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাঙ্কের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, “ব্যাঙ্কগুলোমি রিটার্ন ও বিনিয়োগের সুযোগ দেখে বিভিন্ন দেশে ফান্ড রাখে। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়”।
. আগে বনাম এখন: প্রচারের ধরন পাল্টালো কীভাবে?
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সুইস ব্যাংক ইস্যু আসলেই বিরোধীরা “লুটপাট, পাচার” বলে প্রচার চালাত। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০২৫ সালের জুনে বলেছিলেন, “সুইস ব্যাঙ্কে আমানত বৃদ্ধি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজ মাফিয়া চক্রের লুটপাটের মাত্রা দেখাচ্ছে।”
কিন্তু ২০২৪ সালে ৩ গুণ এবং ২০২৫-২৬ সালে আরও ৪১% বৃদ্ধির পর এখন প্রশ্ন উঠছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই পাচার কে করল? অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ নিজেই ২ জুন ২০২৫-এ বলেছেন, “বাংলাদেশি তহবিলের পরিমাণ উদ্বেগজনক। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছি। দুদক ও বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক তদন্ত করবে, কে টাকা পাঠাচ্ছে”। তিনি আরও বলেন, “৫ জানুয়ারি ২০২৪ নির্বাচনের পরপরই বড় অঙ্কের টাকা সরানো হয়েছে”।
একুশে টেলিভিশন, আরটিভি, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বিডি প্রতিদিনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাম্প্রতিক দিনগুলিতে SNB রিপোর্ট নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
. ২৪ থেকে ২৫-২৬ সাল টাকা কারা রাখে সুইস ব্যাঙ্কে? শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় নেই।
SNB স্পষ্ট করেছে, এই পরিসংখ্যানে শুধু “বাংলাদেশের নামে দায়” হিসেব হয়। এর মধ্যে আছে:
. বাংলাদেশি ব্যাঙ্কের বিদেশি মুদ্রা রিজার্ভ ও করেসপন্ডেন্ট ব্যাঙ্কিং – ট্রেড সেটেলমেন্ট, এলসি, ফরেক্স ম্যানেজমেন্টের জন্য।
. বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিক, যাঁরা ইউরোপ-আমেরিকায় কাজ করেন, তাদের বৈধ অ্যাকাউন্টও এর মধ্যে পড়ে।
. ব্যক্তি গ্রাহক : ২০২৫-এ ব্যক্তি আমানত কমে ১.৪ মিলিয়ন CHF হয়েছে।
বিশ্বব্যাঙ্কের প্রাক্তন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, “ট্রেড এলসির কারণে এত বড় বৃদ্ধি সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সুইজারল্যান্ড থেকে বেশি আমদানি করে না। এই লেনদেন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার আগেই হয়ে থাকতে পারে।”
. লুটপাটের মহা উৎসব? নাকি ব্যাঙ্কিং অপারেশন?
একদিকে অর্থনীতিবিদদের অভিযোগ “দেশে বৈধভাবে বিদেশে অর্থ জমার আইনি সুযোগ নেই। তাই পুরোটাই পাচার।” আবার ব্যাংকাররা বলছেন, “৯৮.৬% টাকাই ব্যাঙ্কের, যা আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং অপারেশনের অংশ।
বাস্তবতা: সুইস ব্যাঙ্ক আর আগের মতো গোপন নয়। ২০১৮ থেকে AEOI Automatic Exchange of Information চালু হয়েছে। ২০২৪-এ ১০৮ দেশের সাথে ৩৭ লাখ অ্যাকাউন্টের তথ্য শেয়ার করেছে সুইজারল্যান্ড। বাংলাদেশ AEOI-তে যুক্ত হয়নি এখনো। ফলে অবৈধ টাকা শনাক্ত করা কঠিন।
. জনতার আদালত কী চায়?
দেশবাসীর প্রশ্ন একটাই, আগে “হাসিনার সময় পাচার” বলে প্রচার হতো। ইউনূসের আমলে বর্তমানে যে দল ক্ষমতায় আছে তৎকালীন সময়ে ইউনূসের সাথে তারাও ক্ষমতার স্বাদ উপভোগ করেছিল দেশের জনগণ দেখেছে। ৪১% বৃদ্ধি হলেও প্রচারের সুর নরম কেন? টাকা পাচারের জন্য দায়ী কারা, নামের তালিকা জনগণকে কেন জানানো হচ্ছে না? বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইউ ৬৭ জন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়েও সুইজারল্যান্ড মাত্র ১ জনের তথ্য দিয়েছে। কিন্তু সংখ্যাটা অনেক বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, “যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ হয় না, তা বাড়তেই থাকে। চুরি করা টাকা ফেরত আনার নজির না থাকাই মূল কারণ”।
শেষ কথা: দেশ এভাবে চলতে পারে না। অর্থ পাচার ও লুটপাটের মহা উৎসব বন্ধ করতে হবে। আজকে যাঁরা ব্যাঙ্কিং অপারেশন বলে চালিয়ে দিচ্ছেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, ইতিহাস তাঁদের ক্ষমা করবে না। সঠিক তথ্য গোপন না রেখে জনতার আদালতে যথাসময়ে পরিষ্কার জবাবদিহি করতে হবে। নইলে জনগণের আস্থা হারাবে রাষ্ট্র।
তথ্যসূত্র: সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক SNB বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫, প্রকাশ ১৮ জুন ২০২৬; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বিডি প্রতিদিন।
- নয়ন বিশ্বাস রকি প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজসেবক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মী



