হোম ফিচার উত্তর কলকাতার নকুবাবুর "অতীতের আশ্রয়" জেগে উঠবে বোলপুরে

উত্তর কলকাতার নকুবাবুর “অতীতের আশ্রয়” জেগে উঠবে বোলপুরে

অমিত মিত্র
এই লেখার শুরুতেই বলে রাখা ভালো, এ লেখা নিছক প্রতিবেদন নয়। এর মধ্যে মিশে থাকবে লেখকের ব্যক্তিগত পরিসরও। এক কথায় বলতে গেলে, নিজের অনুভবকে ব্যক্ত করতে না পারলে সুশীলকুমার চট্টোপাধ্যায় ওরফে নকুবাবুকে প্রকাশ করা অন্তত আমার মতো লিখিয়ের পক্ষে সম্ভব নয়।

সুশীলকুমার চট্টোপাধ্যায় আর তাঁর অতীতের আশ্রয়কে খুঁজে পেয়েছিলাম বছর দেড়েক আগে। সেই সময় যুক্ত ছিলাম একটি ওয়েব চ্যানেলে। সুশীলবাবু ওরফে নকুবাবুর অতীতের আশ্রয়কে নিয়ে একটা ফিচার নিউজ বানাবো, ইচ্ছা ছিল সেটাই। বানালাম এবং তা ছড়িয়ে পড়ল আন্তর্জালের দুনিয়ায়। ভাইরাল হল সেই ভিডিও। লক্ষ মানুষের উৎসাহ, কৌতুহল, ভালোলাগা পেরিয়ে আমি, আত্মিক সম্পর্কে আবিষ্ট হয়ে গেলাম ছিয়ানব্বই বছরের ঋষিতুল্য এক দার্শনিকের সঙ্গে।

উত্তর কলকাতার শ্যাম মিত্র লেন। গলিপথ ঘুরে পুরনো কলকাতাকে ধরে রাখা এক তিনতলা বাড়ি। সেই বাড়ির দোতলায় উঠে বাঁ দিকের একটা ঘর। দরজার বাইরে এক টুকরো কাগজে লেখা- “অতীতের আশ্রয়”। ঘরটিতে ঠিকমতো পা ফেলার জায়গা নেই বললেই চলে। নানান বিচিত্র জিনিসে ঠাসা সেই ঘরের মাঝ বরাবর এক ফালি জায়গায় একটা বসার চেয়ার। আর উল্টো দিকে কাঠের একটা টুল, অতিথির জন্য। এই একটি ঘরে ওই অপরিসতার মধ্যেই যেন একই সঙ্গে বন্দী ও মুক্ত হয়ে আছে একটা মানুষের আজীবনের স্বপ্ন, সাধনা। দুর্লভ, কিংবা বলা ভালো, অমূল্য সব সম্পদের খনি যেন। আমরা যাকে বলি ‘অ্যান্টিক’।

দেশ-বিদেশের বড়ো বড়ো যাদুঘরেও এ ধরনের অ্যান্টিকের দেখা মেলা ভার। কী নেই এ ঘরে! রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মুভি ক্যামেরা থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত মেসেজ রিসিভার। আর সেখানেই ধরা আছে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলীন, হিটলার এবং রুজ্ভেল্টের কণ্ঠস্বর। আছে পুরনো দিনের সব লন্ঠন, রেলের সিগন্যাল, ১৮৮৫ সালের পোল্যান্ডের তৈরি পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ান, স্প্যানিশ সূর্যঘড়ি, ১৮৮৭-র বৃটিশ কলিংবেল, ৩৫ মিলিমিটার পোর্টেবল প্রোজেক্টর- এমনই হাজারো দুর্লভ সংগ্রহ। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে সামনে থেকে দেখেছিলেন। রয়েছে নেতাজীকে নিয়ে কিছু দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহও। তবে প্রথাগত এক সংগ্রাহকের থেকে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী। কেন? এবার আসছি সেকথায়; যা ব্যক্তিগত এবং এক আত্মিক যোগে এই লেখকের অনুভব থেকে উঠে আসা।

শব্দ এবং ধ্বনির পরিমণ্ডলে অতিবাহিত হয়েছে তাঁর জীবন। এই শব্দ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন- প্রকৃত শব্দই হল সৃষ্টি আর অপ্রকৃত শব্দ হল ধ্বংস। বলতেন, “জানো, এই মহা বিশ্বে শব্দতরঙ্গের সঙ্গে আমাদের জীবন তরঙ্গের এক মহাযোগ আছে।” এইসব পুরনো, হারিয়ে যাওয়া জিনিস আপনার সংগ্রহে এলো কী ভাবে- আমার এই প্রশ্নে বলেছিলেন, “এরা নিজেরাই এসেছে আমার কাছে। একটা কথা কী জানো, সকালে আমি যখন তিনতলা থেকে দোতলায় নেমে আমার এই ঘর খুলি, তখন ঘরে আলো পড়তেই ওরা যেন কেমন নড়েচড়ে ওঠে। আমি সেটা বুঝতে পারি। তারপর যখন এদের ঝাড়ামোছা করি, ওরা খুশিতে যেন ঝলমলিয়ে ওঠে। আমার সঙ্গে কথা বলে। ওদের শব্দহীন নীরব ভাষা আমি বুঝি।” এদের প্রত্যেকের মধ্যেই যেন প্রাণের সঞ্চার পেতেন সুশীলবাবু। আপনার মৃত্যুর পর কী হবে এদের- প্রশ্নটা অনিবার্যই ছিল আমার। উত্তরে বলেছিলেন, “আমার মতো করে এদের যে বা যারা ভালোবাসবে, এরা সেখানেই চলে যাবে। এদের মধ্যেই তো বেঁচে থাকবো আমি।”

এরপর থেকেই কী এক অমোঘ টানে বারবার পা রেখেছি তাঁর অতীতের আশ্রয়ে। বুঝেছিলাম, একটা মনের যোগ তৈরি হচ্ছে দুতরফেই। সেটাই দেখা দিলো সত্যি হয়ে। এরই মধ্যে ঘটলো আরও এক আকস্মিক-যোগ। বাংলার সংগীত জগতের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় শিল্পী শুভেন্দু মাইতি খুঁজছিলেন সুশীলবাবুর সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তা। মিলল রাস্তা। সাক্ষাৎ হল দুজনের। কথা হল মনের টানে। এই পরিসরেই পরিচয় ঘটলো সুশীলবাবুর বড় পুত্র গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। শুভেন্দু মাইতি বোলপুরে গড়ে তুলবেন তাঁর এক স্বপ্নের প্রকল্প, সেখানেই সংরক্ষণ করতে চান সুশীলবাবুর এই আজীবনের ঐশ্বর্যকে! প্রস্তাব রাখলেন ছিয়ানব্বই ছোঁয়া যেন এক বটবৃক্ষের কাছে। তখন তিনি শেষের প্রহরে। বাকশক্তি স্তিমিত। ফিসফিসিয়ে বললেন, “কথা দিলাম। আমার কথার নড়চড় হবে না।” এর অনতি দিন পরেই জীবন ছেড়ে তাঁর অতীতের আশ্রয়ে চলে গেলেন নকুবাবু।

বোলপুরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে প্রারম্ভিক কাজ। বিশ্বের দরবারে উন্মুক্ত হবে সুশীলকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংগ্রহশালা। তাঁর ভালোবাসারা ভালোবাসার টানেই এবার স্থান পাবে রবি ঠাকুরের আপন দেশে। এই কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন গৌতমবাবু। শুধু তাই নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি আজ অতীতের আশ্রয়ে সংগ্রাহকের ভূমিকা নিয়েছেন। তবে বোলপুরের ঠিকানায় যাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনিই এই সংগ্রহশালাকে নিজের হাতে রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। আর একটি কথা সবিনয় সহযোগে বলার; যা একান্তই ব্যক্তিগত- বোলপুরে সুশীলবাবুর অতীতের আশ্রয়কে প্রতিদিনের যত্নে লালন করে রাখতে, এই প্রতিবেদককেই স-প্রশ্রয়ে দায়িত্ব দিয়েছেন স্বপ্নের রূপকার শুভেন্দু মাইতি। সুশীলবাবুও সস্নেহে এমনটাই চেয়েছিলেন।

আমাদের পাশে থাকুন

আমজনতাই আমাদের চালিকা শক্তি। আপনার সামান্য অনুদান আমাদের চলার পথে সাহস জোগাতে পারে।

ইচ্ছুকরা এই অ্যাকাউন্টে অনুদান পাঠাতে পারেন :
Bank Name : Bank of Baroda
A/C Name : Kolkata News Today
A/C No. 30850200000526
IFSC Code : BARB0MADHYA

GSTIN : 19AJEPM5512C1ZI
Email : kolkatanewstoday@gmail.com

সবাই যা পড়ছেন

Award : “Times Power Icon” পুরস্কার পেলেন অনির্বাণ আদিত্য

শিক্ষা এবং ক্রীড়াক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে Times Power Icon" পুরস্কার পেলেন আদিত্য গ্রুপের চেয়ারম্যান অনির্বাণ আদিত্য। ১৯৮৪ সাল...

Editorial : সোনিয়ার কৌশলী ঘোষণায় কোণঠাসা বিদ্রোহীরা

দলে বিক্ষুব্ধদের মুখ বন্ধ করতে নিজেকেই কংগ্রেসের পূর্ণ সময়ের সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন সোনিয়া গান্ধী (Sonia Gandhi)। কিন্তু তাতে কি জি-২৩ অর্থাৎ...

দেশে এখন বিমানের জ্বালানির চেয়ে পেট্রোলের দাম ৩৩ শতাংশ বেশি

প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে পেট্রোল (Petrol), ডিজেলের দাম। রবিবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দেশে এখন পেট্রোলের দাম বিমানের জ্বালানিকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। রবিবারের হিসেব অনুযায়ী,...

বাংলাজুড়ে টানা ৩ দিন দুর্যোগের পূর্বাভাস, সতর্কতা জারি

নিম্নচাপের জেরে এবার টানা ৩ দিন বাংলায় দুর্যোগের পূর্বাভাস দিল আলিপুর আবহাওয়া দফতর। আজ রবিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে মাঝারি থেকে...

সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন, লণ্ঠনের আলোয় উমাকে বিদায় সংখ্যালঘুদের

দেবাশিস পাল, মালদহ : সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এ এক অনন্য নিদর্শন। লণ্ঠনের আলোয় দেবী দুর্গাকে বিদায় জানালেন সংখ্যালঘুরা। প্রতি বছরের মতো এবারও এই...