হোমসাহিত্য-সংস্কৃতিগল্প : সমুদ্র মানুষ

গল্প : সমুদ্র মানুষ

গল্প : সমুদ্র মানুষ

দেবদাস কুণ্ডু

আপনি কে?

আমি সমুদ্র গুপ্ত। পিতা রাজেন্দ্র লাল গুপ্ত। ঠিকানা –

থামুন। বললেন, আনন্দ কেতন গোস্বামী। অবসর প্রাপ্ত ফিলোজফির প্রফেসর। জ্যোতিষ
বিদ্যায় ডিপ্লোমা।

বললেন, আপনি কে সেটা বলুন?

আমি লীনা গুপ্তের স্বামী।

হলো না।

সমুদ্র গুপ্ত সমস্যায় পড়লেন। এক বছর ধরে
তিনি একটা সমস্যায় ভুগছেন। তার সঙ্গে কারো বনিবনা হচ্ছে না। না বাড়িতে, না অফিসে।

স্ত্রীকে একটা কথা বললে, বলে—তুমি কি বোঝো? সমুদ্র গুপ্ত অবাক হয়ে বলেন, “আমি কি বুঝি মানে? আমি ব্যাঙ্ক ম্যানেজার। এত বড় অফিস চালাই। আমি বুঝি না?”

-না। তুমি এসব কিছু বোঝো না। শুরু হয় ঝগড়া। অশান্তি।

সেদিন মেয়ে রাস্তায় একটা ছেলের হাত ধরে যাচ্ছিল।

তিনি রাতে বাড়িতে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, ছেলেটি কে?

মেয়ে বলল, আমার পার্সোনাল ব্যাপারে তুমি কেন কথা বলছো?
আমি তোমার বাবা। আমি জানতে চাইবো না তুমি কার সঙ্গে মেলামেশা করছো?

আমি অ্যাডাল্ট। তুমি তা পারো না, বলে মেয়ে উঠে গেল।

সেদিন কী নিয়ে ছেলের সঙ্গে তর্ক বেঁধেছিল।

ছেলে বলল, তুমি এই সময়ের সমস্যা বুঝতে পারবে না। তুমি ব্যাকডেটেড।

কি! আমি ব্যকডেটেড? আমি এমএসসি পাশ। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার। কলকাতার নামী ক্লাবের সদস্য। আমি কিছু বুঝি না? যত বোঝো তোমরা?

অফিসের স্টাফরা একটা কথা বললে মান্যতা দেয় না। মহা সমস্যা। সবার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটা চলতে পারে না।

বাস্তবিক আগাগোড়া সবার সঙ্গে তাঁর মিল হতো না। এই জন্য আজ সে বন্ধু হীন। কিন্তু এই মধ্য বয়সে এই সংকট নিয়ে বাঁচা কঠিন। তাঁর স্ত্রী তাকে এখানে নিয়ে আসেন।

আপনি কে?

আবার সেই প্রশ্নে সচেতন হলেন সমুদ্র গুপ্ত।

আমি কন্যা অদিতি গুপ্তের পিতা।

এবারও হতাশ করলেন আপনি।

সমুদ্র গুপ্তের অস্বস্তি হতে লাগলো। তিনি জানেন জোতিষী হাত দেখে বিপদের কথা বলবেন। সমস্যার সমাধানে পাথর নিতে বলবেন। তিনি এসবে বিশ্বাস করেন না।

কিন্তু লীনা বিশ্বাস করে। ফলও পেয়েছে। তিনি সব সমস্যার কথা বলে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। তাকে আশ্চর্য করে আনন্দ কেতন বললেন—হাত আমি এখন দেখবো না।

আগে আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রশ্নটা হল, আপনি কে?
সমুদ্র গুপ্তর যেন হঠাৎ মনে পড়ল, উঁচু গলায় তিনি বলে উঠলেন, এবার মনে পড়েছে স্যার। আমি ইউকো ব্যাঙ্কের বড় বাজার শাখার ম্যানেজার।

– না
– এতো মহা সমস্যা। তিনি এমএসসি পাশ। সামান্য এই প্রশ্নটার উত্তর দিতে পারছেন না। নিজেকে অসহায় লাগছে। তাহলে কি প্রশ্নটা কঠিন?
–আজ আপনি বাড়ি যান। ভালো করে ভাবুন।

বড় সমস্যা। ঘুম নেই। খিদে নেই।
তীব্র যন্ত্রণা। আমি কে? তাই যদি না জানতে পারি তাহলে এই জীবনের কি মূল্য?

তিনি গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন আনন্দ কেতনের বাড়ি। অসহায় গলায় বললেন, আপনি এর উত্তর দিন। আমাকে মুক্ত করুন।
আমার জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
আনন্দ কেতন গীতা পাঠ করছিলেন।
তিনি বললেন, শান্ত হয়ে বসুন।
আধঘণ্টা পার। কতখন শান্ত হয়ে বসা যায়? তবে কি বাড়ি ফিরে যাবো? কিন্তু উত্তর?

আনন্দ কেতন গীতাপাঠ শেষ করে চেয়ারে
এসে বসলেন। এ কি করেছেন চেহারার? আমি
তো আপনাকে খুব সহজ প্রশ্ন করেছি। উত্তরও
সহজ। আপনি এতো টেনশন নিয়েছেন কেন?

আমাকে উত্তরটা জানতেই হবে। আপনি বলুন।

আপনি বলবেন, আমি একজন মানুষ। বাহিরে আপনার নানা রূপ।
আসল পরিচয় আপনি একজন মানুষ। ব্যাস
আর কিছু করতে হবে না।

সমুদ্রের চোখে আপার বিস্ময়। বাড়ি ফিরলেন পাখির মতো হালকা মন নিয়ে।

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img