নয়ন বিশ্বাস রকি
বিশ্বজুড়ে ইরান যুদ্ধের আঁচ পড়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল-গ্যাসের দাম নিম্নমুখী। কিন্তু বাংলাদেশের ছবি পুরোপুরি বিপরীত। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানির দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে গিয়েছে।

১ জুন থেকে খুচরো বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮% বাড়িয়েছে বিইআরসি। কোনও কোনও স্তরে ১৯.৯৪% পর্যন্ত বেড়েছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে খুচরা দাম গড়ে ৮.৫% বা ৭০ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানে গড় দাম ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা ৯৫ পয়সা, যা আগে ছিল ৮ টাকা ২৫ পয়সা। সেচে ৪ টাকা ৮২ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫ টাকা ২৫ পয়সা। উচ্চ চাপ শিল্পে ৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৭৫ পয়সা।
জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে লুটপাট চলছে। বর্তমান সময়ে আর জনগণের চোখে ধুলো দেওয়া হচ্ছে। ১ জুন দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে। কেরোসিন ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা লিটার। ডিজেল অপরিবর্তিত ১১৫ টাকা। এর আগে ১৯ এপ্রিলও ১০-১৫% বাড়ানো হয়েছিল। তখন পেট্রোল ১১৬ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছিল।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মেলে না। তবু বাড়তি টাকা আদায় করা হচ্ছে। অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শেখ হাসিনার আমলে জ্বালানির ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ছিল এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল। এখন তা সাধারণের ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে কোনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, বিদ্যুৎ-গ্যাস অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। দাম বাড়লে সব ক্ষেত্রে খরচ বাড়ে, মূল্যস্ফীতি হয়। গ্রীষ্মে চাহিদা বাড়ায় গ্রামে-মফঃস্বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।অথচ নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ৫৯,১৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
কৃষি, শিল্প, পরিবহন ‐ সব ক্ষেত্রে খরচ বাড়ায় মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৯.০৪ শতাংশে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন তলানিতে। সরকার বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে। মার্চ-জুনে শুধু জ্বালানি ও এলএনজিতে ৩১,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি লাগবে। দৈনিক ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার।
দেশবাসীর প্রশ্ন হল, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে বাংলাদেশে বাড়ে কেন? ৩ মাসে ২ বার জ্বালানি ও ১ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে কোন জনস্বার্থ রক্ষা হচ্ছে? ১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং দিয়ে বাড়তি বিল কেন?
বাংলাদেশের অর্থনীতির এখন শোচনীয় অবস্থা। দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের যে প্রবাহ থাকা উচিত, তা দেখা যাচ্ছে না। টানা তিন বছর ধরে মোট অভ্যন্তরীণ (জিডিপি) কমেছে। সরকারি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও, বেসরকারি লগ্নিতে স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বেসরকারি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২২.৩ শতাংশ। গত ১০ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে জিডিপি-র পরিমাণ ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা।
কোনও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি থাকা প্রয়োজন, যা উৎপাদন ক্ষেত্র ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বিনিয়োগ প্রবাহ কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পথ রুদ্ধ হয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হল, কীভাবে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট উৎপাদনে বড় বাধা। গ্যাস-সংযোগের কারণে কারখানা চালু করতে না পারলে উৎপাদন বিঘ্নিত হবে।
(নয়ন বিশ্বাস রকি, প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা, সমাজসেবী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মী)



