নয়ন বিশ্বাস রকি
তোফায়েল আহমেদ, এশিয়া উপমহাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তোফায়েল আহমেদের লড়াই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ৯ বার সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন। ছিলেন মন্ত্রীও।

তিনি দীর্ঘদিন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। সেই মুমূর্ষু অবস্থাতেও তথাকথিত বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার খড়গ তাঁর ওপর নেমে এসেছিল। মিথ্যা মামলা আর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এক অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকারে পরিণত করা হয়েছিল। হাসপাতালের বেডে যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখনও তাঁর নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছিল। এই হলো বিএনপির তথাকথিত আইনের শাসন, যেখানে মৃত্যুপথযাত্রীকেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভেবে দমন করা হয়।
মৃত্যুর পরও নিস্তার মেলেনি। তাঁর জানাজা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাধার সম্মুখীন হয়েছে। লাঠিয়াল পুলিশ বাহিনী দিয়ে জানাজার মাঠ ঘিরে ফেলা হয়েছিল। সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ৬০ জন নেতাকর্মীকে বিনা অভিযোগে, অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়।
আজ জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন, এই কি সেই বাংলাদেশ? এই কি আইনের শাসন? এই পুলিশ বাহিনী কি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের, নাকি জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে?
শত বাধা, শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল জানাজায়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছে ঢাকার রাজপথ। শোকাহত মানুষের অশ্রুসিক্ত চোখ আর বজ্রকণ্ঠের স্লোগান প্রমাণ করেছে, তোফায়েল আহমেদ শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি ইতিহাস, একটি অনুভূতির নাম। বাংলার অলিগলি, পথে-প্রান্তরে তাঁর স্মৃতি, তাঁর সংগ্রাম মিশে আছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন তিনি। ১৯৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয় আন্দোলনে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা তোফায়েল বাঙালি জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন। অথচ আজ রাষ্ট্র তাঁকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ।
লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের দাবি ছিল, মহান জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হোক। এই ন্যূনতম সম্মানটুকুও এই সরকার দেয়নি, বরং নির্লজ্জভাবে বাধা সৃষ্টি করেছে। পরিবারের অভিযোগ, বিনা চিকিৎসায় বন্দি রেখে, সুচিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আজ দেশবাসীর মনে প্রশ্ন জাগে, আইনের শাসন কি বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত? নাকি তা দলীয় লেজুড়বৃত্তির কাছে জিম্মি? মানবাধিকার কি তবে কবরে? বাকস্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করে কালো কানুনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রমকে অবৈধভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
যে আওয়ামী লীগের কোটি কোটি কর্মী-সমর্থক আছে, যে দলকে দেশের ৬০% মানুষ সমর্থন করে, যে দল বারবার জনগণের রায় নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, উন্নয়নের রোল মডেল সৃষ্টি করেছে, সেই দলকে নিষিদ্ধ করার দুঃসাহস দেখানো হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বেতন হয় সর্বস্তরের মানুষের রক্ত-ঘামের করের টাকায়। তাঁদের পরিবার চলে জনগণের অর্থে। ইতিহাস সাক্ষী, যাঁরা জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করে না। তাদের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা ভবিষ্যতই বলে দেবে।
সময় চিরস্থায়ী নয়। আজ যাঁরা ক্ষমতার মসনদে বসে দম্ভ আর অপব্যবহারের মহোৎসব করছে, তাঁরা অতীত ও বর্তমানের ইতিহাস বিস্মৃত হয়েছে। কিন্তু তাদের কলঙ্কিত অধ্যায় ইতিহাসের পাতায় কালো কালিতে লিপিবদ্ধ থাকবে। জনগণ, দেশবাসী তাদের ক্ষমা করবে না।
এই দেশে আবারও গণবিপ্লব হবে, গণ আন্দোলন হবে। দেশ রক্ষার সংগ্রাম হবেই। তোফায়েল আহমেদের জানাজায় জনতার যে বাঁধভাঙা জোয়ার, যে বজ্রনির্ঘোষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, তাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
এই কিংবদন্তি রাজনীতিবিদের চিরবিদায়ে তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করি। তিনি ছিলেন, তিনি আছেন, তিনি থাকবেন বাংলাদেশের ইতিহাসে, কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়।
সংক্ষিপ্ত জীবনী
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ সভাপতি ছিলেন। তবে ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার পরই জনপ্রিয়তা পান। গণ অভ্যুত্থানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন তিনিই। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণাও করেছিলেন তোফায়েল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর চার প্রধানের অন্যতম তোফায়েল বাংলাদেশের জন্ম হলে, শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পান। গোটা রাজনৈতিক কেরিয়ারে ৯ বার সাংসদ ছিলেন তিনি। একাধিকবার মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সারা জীবনে বহুবার কারাবরণ করেছেন। আওয়ামি লিগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যও ছিলেন।
(নয়ন বিশ্বাস রকি বাংলাদেশের প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা)



