নয়ন বিশ্বাস রকি
বাংলাদেশের রাজনীতির আজ চরম দুর্ভাগ্য হল, যোগ্য নেতৃত্বের সঙ্কট। মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লিগ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও একই সমস্যায় জর্জরিত। পৃথিবীতে সবকিছুই যুগের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী চলতে থাকে। বাংলাদেশ হয়তো বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে যুগের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি। কেউ যদি একবার নেতা হয় এবং ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে তিনি একে তাঁর রাজনৈতিক লাইসেন্স বলে মনে করেন এবং আমৃত্যু এই লাইসেন্সটি আর ছাড়তে চান না।

যতক্ষণ শরীরে শক্তি থাকে, ততক্ষণ তাঁরা এই ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করতে চান না। আর যদিও বা চান, তাহলে পরিবারের কাউকে উত্তরসূরী মনোনীত করে যান। যার ফলে তৃণমুল স্তর সহ বিভিন্ন পর্যায়ে যোগ্য ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারেনি। এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব কমই আছে যে, কোনও রাজনৈতিক নেতা অবসর গ্রহণ করে যোগ্য নেতৃত্বের হাতে দায়িত্বভার অর্পন করেছেন। ১৯৭১ পরবর্তী যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠেছিল, তাঁরা আমৃত্যু নেতৃত্ব প্রদান করে চলেছেন।
বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে সময়োপযোগী ও যোগ্য নেতৃত্বের সঙ্কটে আজ বাংলাদেশ। রাজনীতিকে যখন ব্যবসা ও ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক উন্নয়নের একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়, তখন রাজনীতিতে দূর্বৃত্তায়ন ঘটে। ব্যক্তিগত ভোগ বিলাসের কেন্দ্র হয়ে উঠে রাজনীতি।
নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী কতজন ছাত্রনেতা আজ জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্হানে রয়েছে? কেন তাঁদেরকে যোগ্যতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হয়নি? কেন একজন সংসদ সদস্যকে ৭/৮ বার সংসদে নির্বাচিত করতে হবে? কেন রাজনৈতিক দলগুলি বিশ্বায়নের এই যুগে আধুনিক ও গতিশীল নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেননি?
২০২৪-এর তথাকথিত জঙ্গি হামলার পিছনে রয়েছে সঠিক ও সময়োপযোগী রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব। প্রজন্মকে সঠিক মূল্যায়ন করে যদি আমরা যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারতাম, বাংলাদেশ আজ পথ হারাতো না। নেতৃত্বের এই যে ফাঁক তৈরি হয়েছে, যার ফলে অশুভ রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়েছে, আজকে যার খেসারত দিতে হচ্ছে গোটা দেশ ও জাতিকে।
তাই রাজনৈতিক দলগুলির কাছে বিনীত অনুরোধ, আপনারা আপনাদের নেতৃত্ব পরিবর্তন করুন। রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের হাতে ফিরিয়ে আনুন। ব্যবসায়ী ও চাটুকারদের হাত থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করুন। তা না হলে আরও ভয়াবহ পরিণতি হবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগ্যতা ও বয়স নির্ধারণের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার উপযুক্ত ও আধুনিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তুলন।
বিশ্ব এখন আধুনিকতার চরম শিখরে অবস্থান করছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশ বির্নিমাণের যে ঘোষণা দিয়েছিল আওয়ামী লিগ সরকার, তা সত্যিকার অর্থেই আজ কার্যকর ও সুস্থায়ী হত, যদি আগে ডিজিটাল ও স্মার্ট নেতৃত্ব গড়ে তোলা যেত। অচল মানসিকতা ও নেতৃত্ব দিয়ে শুধুমাত্র স্লোগানসর্বস্ব আমলা নির্ভর হয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ বির্নিমাণ সম্ভব নয়।
পরিশেষে একটি কথাই বলব, আমরা যতদিন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আপডেট ও যুগোপযোগী করতে না পারব, ততদিন পর্যন্ত রাজনীতি সঠিক পথে চালিত হবে না।
- নয়ন বিশ্বাস রকি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতা, সমাজসেবক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মী।



