প্রাইমা হোসেন
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান রণধ্বনি ছিল ‘জয় বাংলা’। যে স্লোগান বুকে ধারণ করে ৩০ লাখ শহিদ হয়েছেন, সেই স্লোগান উচ্চারণ করাই আজ বাংলাদেশে অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ‘জয় বাংলা’ বলার অপরাধে নাগরিকদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

নাবালক শিশু গ্রেপ্তার: মানবাধিকারের নির্মম লঙ্ঘন
সাম্প্রতিককালে নোয়াখালীর সুধারাম থানায় ছয়জন নাবালক শিশুকে ‘ছাত্রলীগ ট্যাগ’ দিয়ে ‘জয় বাংলা’ বলার অপরাধে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রশ্ন জাগে, আইনের শাসন বলতে কি আদৌ কিছু আছে? শিশুদের গ্রেপ্তার শুধু দেশের প্রচলিত আইন নয়, জাতিসঙ্ঘের শিশু অধিকার সনদেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিশ্বের সকল মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রতি আহ্বান জানাই, বাংলাদেশে আইনের শাসনের নামে যে অপশাসন ও বিভীষিকাময় দুঃশাসন চলছে, তার বিরুদ্ধে এগিয়ে আসুন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
রাষ্ট্রযন্ত্র যখন দলীয় লাঠিয়াল
বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে চারদিকে চলছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মিছিল-সমাবেশ। অথচ একই সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের ওপর দমন, নিপীড়ন, জুলুম অব্যাহত রাখা হয়েছে। বিনা অভিযোগে বাড়ি বাড়ি অভিযান চালিয়ে নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এক মামলায় জামিন পেলে জেলগেট থেকে আরেক মামলায় ফের গ্রেপ্তার, এটাই এখন বিএনপির ‘সুশাসন’।
গণতন্ত্রের মূল কথা হল, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। যখন বিরোধী দল ও মতকে দমন করাই রাষ্ট্রের একমাত্র হাতিয়ার হয়, তখন বুঝতে হবে দেশে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই।
পুলিশ কার? জনগণের না দলের?
রাষ্ট্রের জনগণের বিপক্ষে পুলিশ বাহিনীকে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার পরিণতি কখনও ভাল হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, পুলিশের বেতন হয় জনগণের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায়। বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা করে, পুলিশ হবে জনগণের বন্ধু, মানুষের জীবন ও সম্পত্তির রক্ষক। কোনও রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল নয়।
বিচার বিভাগ আজ জিম্মি
বিচার বিভাগ হল, মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। অথচ সেই বিচার বিভাগই আজ রাষ্ট্রের কাছে অসহায় ও জিম্মি। আদালতে তারিখের পর তারিখ পড়ে, বিচার হয় না। জামিন পাওয়া নাগরিকের নৈতিক অধিকার, সেখান থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। অভিযোগ আছে, বিএনপি-র পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে। কারাগারে একজন বন্দির যে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য, রাষ্ট্র সেটুকুও দিচ্ছে না। মিথ্যা মামলা দিয়ে সাধারণ নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অর্থনীতি ভঙ্গুর, মানুষ দিশেহারা
রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও আজ ভঙ্গুর। মানুষের দুর্দশা ও ভোগান্তি সব ক্ষেত্রে প্রকট। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে জনজীবন অতিষ্ঠ। গণমাধ্যমকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। মানবাধিকার বলতে কিছু নেই।
এই পরিস্থিতিতে দেশবাসী মনে করে, অন্ধকার এই কালো অধ্যায় থেকে মুক্তি পেতে, স্থিতিশীল ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য শেখ হাসিনার কোনও বিকল্প নেই।
দমন-পীড়ন চালিয়ে ইতিহাস থামানো যায় না
সরকারের কাছে প্রশ্ন, দমন-পীড়ন চালিয়ে কতদিন টিকে থাকতে পারবেন? জনগণ তো এর বিপক্ষে চলে গেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যত দমন চালানো হয়, আন্দোলন ততই বেগবান হয়। জনসমর্থন বাড়ে, প্রতিবাদ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
যদি গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে এই জাতির কপালে সামনে আরও দুঃখ আছে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা হল, অর্থনৈতিক উন্নতি, বাকস্বাধীনতা ও স্বস্তির জীবন।
তাই এই মুহূর্তে প্রয়োজন একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যে বাংলাদেশের জন্য জীবন দিয়েছিলেন লাখো শহীদ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ‘জয় বাংলা’ স্লোগান কোনও দলের সম্পত্তি নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িত। একে অপরাধীকরণ করা মানে সংবিধানের মূলনীতি ও ইতিহাসকে অস্বীকার করা।
আইনি কাঠামো: শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে কাউকে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়া বেআইনি। ‘জয় বাংলা’ বলা ফৌজদারি অপরাধ নয়।
রাজনৈতিক বার্তা: রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয়করণ করলে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য থাকে না। তখন সরকার পতনের সঙ্গে রাষ্ট্রও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ: শিশু গ্রেপ্তার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ‐ তিনটিই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির লঙ্ঘন। এতে GSP+ সহ বৈদেশিক বাণিজ্য সুবিধা হুমকিতে পড়ে।
প্রাইমা হোসেন বিশিষ্ট সমাজসেবিকা, সংগঠক ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মী



