কুলাবধূতাচার্য সোমানন্দ নাথ
ভারতের শক্তি সাধনার অন্যতম ক্ষেত্র কামাখ্যা ধাম। একান্ন পীঠের অন্যতম এবং প্রধান পীঠ। এটি দেবী সতীর যোনী পীঠ হিসাবেই পরিচিত। প্রতি বছর সাড়ম্বরে পালিত হয় দেবীর অম্বুবাচী যাত্রা। দূর দূরান্ত থেকে সাধু ভক্তরা আসেন এই কামাখ্যা ধামে, সাধন ভজনের জন্য। চলতি বছর ২২ জুন রাত্রি ৯ টা ১০ মিনিট থেকে অম্বুবাচী যাত্রা শুরু হয়েছে, চলবে ২৬ জুন সকাল পর্যন্ত।
এই উৎসব উপলক্ষে গোটা কামাখ্যা ধাম সহ মন্দির চত্বর সেজে উঠেছে। এবার এই অম্বুবাচী মেলার উপলক্ষে সাধু ভক্তদের জলসেবার আয়োজন করেছে বগলামুখী মাতৃ মিশন। কামরূপ কামাখ্যা তীর্থ ক্ষেত্রে ভক্ত শিষ্যের সুবিধার্থে দুটি ক্যাম্প রয়েছে জলসেবার।
দেবীর ষোড়শ যাত্রার অন্যতম যাত্রা অম্বুবাচী। এই অম্বুবাচী শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ “অম্ব ” এবং ” বাচি ” থেকে। “অম্ব” শব্দের অর্থ জল এবং “বাচি ” শব্দের অর্থ বৃদ্ধি। অর্থাৎ, গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহের পর যখন বর্ষার আগমনে ধরিত্রী সিক্ত হয় এবং নবরূপে বীজধারণের যোগ্য হয়ে ওঠে, সেই সময়কেই বলা হয় অম্বুবাচী।
এই শক্তিপীঠ ভারত তথা গোটা বিশ্বের একমাত্র শক্তিক্ষেত্র, যেখানে সাধন বা যে কোনও ক্রিয়া করলে চতুবর্গ ফলপ্রাপ্তি হয়। তাই আমি গুরুর কৃপায় মায়ের কাছে বারবার ছুটে যাই ভক্তদের নিয়ে। আর মা-ও কৃপা করে তাদের উদ্ধার করেন। কারণ, সর্বোপরি ইষ্টদেবী ও মা কামাখ্যার আশীর্বাদ ভিন্ন তাঁর ক্ষেত্রে পৌঁছে পূজা বা হোম সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
এই পীঠ সমস্ত পীঠের থেকে শ্রেষ্ঠ ও ফলপ্রদ। এই শক্তি ক্ষেত্রে সাধক-ভক্ত যদি একবারও একাগ্র চিত্তে পূজা করেন, তাহলে স্বয়ং মা তাঁর দেহে বসবাস করেন। যুগে যুগে এই কামাখ্যা ক্ষেত্র সর্ব তীর্থের শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্ররূপে খ্যাত হয়েছে। দেবগণ যখন আসুরিক শক্তির জ্বালায় জর্জরিত, তখন মা কামাখ্যাই তাঁদের রক্ষা করেছেন, কখনও কুমারী রূপে, আবার কখনও মায়া বিস্তার করে।
যিনি এই পীঠের মাহাত্ম্য সম্পর্কে জানেন, তিনিই দিব্যজ্ঞান লাভ করে পরম নির্বাণ লাভ করবেন। শুধু তাই নয়, এই পীঠে কোনো ভক্ত যদি পূজা পাঠ করেন, তাহলে তাঁর বংশের পূর্ব পুরুষের সঙ্গে তিনি নিজেও দিব্যজ্ঞান লাভ করবেন এবং চিরমুক্তি লাভ করবেন।
দেবী কামাখ্যা সর্বকালে ভক্তদের কামনা বাসনা পূরণ করেন। এই পীঠে ভক্তদের কামনা বাসনা পূরণ হয়। ভক্তরা যে মনোবাঞ্ছা নিয়ে মায়ের কাছে আসেন, সেই মনস্কামনা পূরণ করেন দেবী কামাখ্যা। তাই এই পীঠের নাম কামরূপ। পাশাপাশি কলিযুগের সাধনার মূল ক্ষেত্র এই কামাখ্যা। সাধকের সাধনা সম্পূর্ণই হয় না কামাখ্যা ক্ষেত্রে না পৌঁছালে। সত্যযুগে উড্ডীয়ান পীঠের প্রাধান্য, ত্রেতায় পূর্ণশিলা, দ্বাপরে জলশিলা আর কলিযুগে পাপ বিনাশে মহামায়া কামাখ্যা যোনীপীঠ পূজাই প্রধান।
কামরূপ মহাপীঠে সাধনা এবং প্রার্থনা করলেই ভক্ত সিদ্ধিলাভ করেন। কলিযুগে ভক্ত বা সাধক এই স্থানে বসে জপ করলেই তাঁর আকাঙ্ক্ষিত ফলপ্রাপ্তি ঘটে। তাছাড়া, এই নীলাচল পাহাড়েই দশমহাবিদ্যার মন্দির রয়েছে।
এই ক্ষেত্রে ত্রিগুণাতিতা যোনীপীঠ বিদ্যমান, তিনিই মা কামাখ্যা। পাশাপাশি উমানন্দ ভৈরব এবং হয়োগ্রীব বিরাজমান। এই স্থানে মুক্তিলাভ হবেই কারণ, এখানে ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, বগলা, মাতঙ্গী, কমলা, কালিকা, ভুবনেশ্বরী, ধুমাবতী ও ত্রিপুরা এই নববিদ্যা বিরাজমান।
দেবী কামাখ্যা সর্ব দেবগণের পূজিতা। সমস্ত দেবগণ তাঁর শ্রীচরণ বন্দনা করেন এবং মায়ের কৃপা পান। কামাখ্যা যোনীমণ্ডলে মন্ত্র জপ করে ব্রহ্মা সহ দেবগণ সিদ্ধ হয়ে খেচরত্ব লাভ করেন এবং সবার কাছে পূজিত হয়েছিলেন।
কামাখ্যা দেবীর মাহাত্ম্য ত্রিলোকে বন্দিত। এই মায়ের পীঠে ব্রহ্মা ব্রহ্মাপদ, বিষ্ণু বিষ্ণুপদ এবং শিব শিবত্ব লাভ করেছিলেন। তাই ভক্তি দিয়ে মায়ের যোনীপীঠে পূজা করাই উচিত।
এই মহোৎসব উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম চলছে। চলতি বছর বগলামুখী মাতৃ মিশন প্রতিদিন জল দানের উদ্যোগ নিয়েছে, সাধু ভক্তদের সেবার্থে এবং জীব সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখতেই এই উদ্যোগ।
- কুলাবধূতাচার্য সোমানন্দ নাথ বগলামুখী মাতৃ মিশনের আচার্য



