হোমআন্তর্জাতিকশিখাহীন 'শিখা অনির্বাণ', স্বাধীনতা বিরোধীদের ছোবল

শিখাহীন ‘শিখা অনির্বাণ’, স্বাধীনতা বিরোধীদের ছোবল

শিখাহীন ‘শিখা অনির্বাণ’, স্বাধীনতা বিরোধীদের ছোবল

প্রাইমা হোসেন
ঢাকা সেনানিবাসের ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ ‘শিখা অনির্বাণ’ জ্বলছে না। গত ২ মে থেকে এটি সরকারের নির্দেশে বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের অদম্য সাহস ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারণকারী এই প্রতীকটি বন্ধ থাকার খবর বাংলাদেশের গণমাধ্যমও সেভাবে তুলে ধরেনি। এত বড় একটি সংবাদ কেন দেশের গণমাধ্যমগুলি গুরুত্ব দিল না, তা সত্যিই বিস্ময়কর।

আমার মতে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত মুক্তিযুদ্ধকে হেয় ও অবমাননা করার শামিল। স্থাপিত হওয়ার পর থেকে দেশের সামরিক ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এর আগে কোনও সরকারের আমলেই এটি এক মিনিটের জন্যও বন্ধ হয়নি। আমি মনে করি, এটা স্বাধীনতা বিরোধীদের ছোবল।

তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনমনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সম্প্রতি দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকা এই অনির্বাণ শিখা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে জনমনে আলোচনা ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি শিখা নিভে যাওয়া নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকের পরিবর্তন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পিছনে যদি প্রশাসনিক, কারিগরি, নিরাপত্তা বা অন্য কোনও বাস্তব কারণ থেকে থাকে, তবে সেটিও স্বচ্ছভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত। কারণ জাতীয় স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত যে কোনও সিদ্ধান্ত মানুষের আবেগ ও ইতিহাস চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

নানা সমালোচনার মুখে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতা এবং এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু মিতব্যয়িতা ও জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব পদক্ষেপের অংশ হিসেবে গত ২ মে থেকে ঢাকা সেনানিবাসের শিখা অনির্বাণ আর অবিরাম জ্বালিয়ে রাখা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে আইএসপিআর।

তারা বলছে, বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় দিবস, রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদন, সামরিক আনুষ্ঠানিকতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অনুষ্ঠানের সময় শিখাটি প্রজ্বলিত করা হবে। অন্য সময় এটি বন্ধ থাকবে। এ কথা সত্যি যে, শিখা অনির্বাণ জ্বালাতে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। এবার জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতির কারণে এটি বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধু একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়, এটি একটি জাতির আত্মত্যাগ, সাহস ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত, অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি। এই ইতিহাসকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্মৃতিস্তম্ভ, জাদুঘর ও স্মারকগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনা কেবল স্থাপত্য নয়, বরং জাতীয় চেতনার দৃশ্যমান প্রতীক।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত ‘শিখা অনির্বাণ’ তেমনই একটি স্মারক, যা মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অন্যতম প্রতীক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। শিখা অনির্বাণ মূলত একটি চিরজাগ্রত শিখার প্রতীক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় বীর ও শহীদদের স্মরণে অনির্বাণ শিখা প্রজ্বলিত রাখা হয়। এর অর্থ হল, যাঁদের আত্মত্যাগে একটি জাতি স্বাধীনতা বা মর্যাদা অর্জন করেছে, তাঁদের স্মৃতি কখনও নিভে যাবে না। বাংলাদেশেও সেই ভাবনা থেকেই এই স্মারক নির্মিত হয়। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং সকল শহীদের স্মরণে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক এবং সাধারণ মানুষ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে এখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছেন। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এই স্মৃতিস্তম্ভের সামনে শ্রদ্ধা নিবেদন একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুশীলনে পরিণত হয়েছে। শিখা অনির্বাণের সবচেয়ে বড় শক্তি এর প্রতীকী অর্থে। একটি জ্বলন্ত শিখা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা কখনও বিনামূল্যে অর্জিত হয় না। এটি নতুন প্রজন্মকে শেখায় যে, স্বাধীনতার পিছনে রয়েছে অসংখ্য ত্যাগের ইতিহাস। তাই এই স্মারক কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি শিক্ষা।

এ কথা সত্যি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশ হাঁটছে উল্টোপথে। হাঁটছে মেটিকুলাস ডিজাইনের ছকে। বাংলাদেশ চলছে ৭১-এর পরাজিত শক্তি ও জঙ্গিদের ছত্রছায়ায়। সরকার পরিবর্তনের পর একটি উদ্বেগের বিষয় সামনে এসেছে – মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭১ সালের ইতিহাস এবং এর চেতনা নিয়ে নানা বিতর্ক, অবমূল্যায়ন ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের বিস্তার। এই জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের হাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি ভাস্কর্য, মূরাল এবং বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে অনন্য অধ্যায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর। তারপর সাত বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য, মুজিব নগর স্মৃতিস্তম্ভ সহ সারা দেশে বহু মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল চেতনার স্থাপনা।

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আত্মত্যাগ ও জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি। লাখো শহীদের রক্ত, অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার ত্যাগ এবং নির্যাতিত মানুষের আত্মবলিদানের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ার বিষয় নয়। ইতিহাসকে বিকৃত করা, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব খাটো করা কিংবা স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা মতাদর্শকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা জাতীয় ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

আমার দৃষ্টিতে, একটি জাতির ইতিহাসকে সম্মান করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল, তার প্রতীকগুলোর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা। প্রতীক পরিবর্তন করা যেতে পারে, সংস্কার করা যেতে পারে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আনা যেতে পারে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা জনগণের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি। অন্যথায় বিভ্রান্তি, সন্দেহ এবং অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ইতিহাসের প্রশ্নে অস্পষ্টতা কখনোই জাতীয় ঐক্যের জন্য সহায়ক নয়।

আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ১৯৭১-এর বিভীষিকা নিজের চোখে দেখেনি। তারা ইতিহাস জানে বই, চলচ্চিত্র, পরিবার ও স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে। তাই শিখা অনির্বাণের মতো প্রতীকগুলো তাদের কাছে জীবন্ত ইতিহাসের পাঠশালা। যদি এসব প্রতীক তাদের আগের রূপে আর না থাকে, তবে তার বিকল্প কী হবে- সেই প্রশ্নেরও উত্তর থাকা দরকার। ইতিহাস সংরক্ষণ মানে শুধু স্থাপনা রক্ষা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্মৃতি, মূল্যবোধ ও জাতীয় পরিচয়।

একটি বিষয়ও মনে রাখা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল একটি শিখা, একটি স্তম্ভ বা একটি স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা নিহিত আছে গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সাম্য এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যে। তাই কোনো প্রতীক নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও জাতির মূল চেতনাকে অক্ষুণ্ণ রাখাই হওয়া উচিত সবার অঙ্গীকার। একই সঙ্গে, যেসব স্মৃতিচিহ্ন জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ইতিহাসবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

শিখা অনির্বাণের আলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতার ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। একটি শিখা নিভে যেতে পারে, আবার জ্বালানোও যেতে পারে; কিন্তু জাতির স্মৃতি ও আত্মত্যাগের ইতিহাস তখনই টিকে থাকে, যখন আমরা তাকে সম্মান করি, সংরক্ষণ করি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিই। ইতিহাসকে ঘিরে যে কোনো সিদ্ধান্তে তাই সংবেদনশীলতা, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় ঐকমত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে, শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারে এবং স্বাধীনতার মূল্য বুঝতে শেখে- এই দায়িত্ব আমাদের সবার। শিখা অনির্বাণ সেই দায়িত্বেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। প্রতীকটির রূপ যাই হোক না কেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শ যেন কখনো অনির্বাণ শিখার মতোই চিরজাগ্রত থাকে – এটাই একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা।

  • প্রাইমা হোসেন বিশিষ্ট সমাজ সেবিকা ও সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মী।
spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img