হোমদেশঅক্সিজেন থেকে ভ্যাকসিন, তথ্য বলছে, কেন্দ্রের ঢিলেমিতেই বিপন্ন দেশ

অক্সিজেন থেকে ভ্যাকসিন, তথ্য বলছে, কেন্দ্রের ঢিলেমিতেই বিপন্ন দেশ

অক্সিজেন থেকে ভ্যাকসিন, তথ্য বলছে, কেন্দ্রের ঢিলেমিতেই বিপন্ন দেশ

দেশের হাসপাতালগুলিতে এখন করোনায় মৃত মানুষের স্তুপ। কোথাও অমিল অক্সিজেন, কোথাও আইসিইউ বেডের ঘাটতি, আবার কোথাও ডাক্তার বা অক্সিজেনের অভাব, অসহায় রোগীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

কেন এই হাহাকার? কেন এই মর্মান্তিক পরিস্থিতি? দায়ী কি শুধু করোনার জীবাণু? না, দায়ী হল করোনার হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রের ব্যর্থতা আর ঢিলেমি।

সরকার ঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলেই তার মাশুল গুনতে হচ্ছে দেশবাসীকে। ২০২১-এর ২১ এপ্রিলের পর সরকারের যখন টনক নড়ল, তখন এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২ লক্ষে পৌঁছেছে,  সক্রিয় রোগীর সংখ্যা ২০ লক্ষ ছাড়িয়েছে। আর প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছিলেন ৩ লক্ষেরও বেশি?

শুধুমাত্র কেন্দ্রের অপরিণামদর্শিতার জন্য প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন শত শত দেশবাসী।

ভ্যাকসিনের ঘাটতি?

গত বছর থেকে আমরা শুনে আসছি, যতদিন না প্রতিষেধক আসছে, ততদিন কোনওরকম শিথিলতা নয়। টিকাই এই রোগের প্রকৃত প্রতিষেধক। কিন্তু টিকা বাজারে আসার পর এর উৎপাদন বাড়াতে সরকার কি আদৌ কোনও উদ্যোগ নিয়েছিল? না, কার্যত কিছুই করেনি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক।

বিদেশের দিকে চোখ ফেরাই। আমেরিকা, ব্রিটেনের মতো দেশগুলি টিকা প্রস্তুতকারী সংস্থাকে অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছিল। গত বছরের অগাস্টের মধ্যে টিকার পরীক্ষা এবং উৎপাদনের জন্য মার্কিন ফাইজার, জনসন অ্যান্ড জনসন সহ বিভিন্ন সংস্থাকে দিয়েছিল ৪৪,৭০০ কোটি টাকা।

আর ভারতে? দেশের দুই বড় সংস্থা সেরাম ইনস্টিটিউট এবং ভারত বায়োটেক কার্যত কোনও সরকারি সাহায্য পায়নি।

সেরাম নিজে ২ হাজার কোটি টাকা লগ্নি করেছিল। আর বিল অ্যান্ড মিলিন্ডা গেট ফাউন্ডেশন থেকে পেয়েছিল ২২০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ভারত বায়োটেক নিজস্ব পুঁজিকে সম্বল করে টিকা তৈরিতে নেমেছিল।

ভারতে ভ্যাকসিন নির্মাতাদের দেওয়া হয়েছে ৪৫০০ কোটি টাকা। তার জন্য প্রস্তুতকারীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে এ বছরের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। কেন এতদিন ধরে সরকারি টাকার জন্য অপেক্ষা করতে হল সেরাম, ভারত বায়োটেককে। টাকা না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছিল সেরাম।

ভারতে ভ্যাকসিন উৎপাদনের ক্ষমতাও চাহিদা মেটানোর পক্ষে যথেষ্ট নয়। দেশে মাসিক চাহিদা রয়েছে ১৫০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডোজ। কিন্তু এর অর্ধেকও উৎপাদন ক্ষমতা নেই। ভ্যাকসিনের এই ঘাটতি মেটাতে অন্য নির্মাতাদের সঙ্গে কোনও কথাবার্তা হয়েছিল কি? না, হয়নি।

২০২০-র অগাস্টে বিভিন্ন ওষুধ সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে ৪০০ মিলিয়ন ডোজ টিকা বুক করে রেখেছিল আমেরিকা। আর গত বছরের নভেম্বরে ৮০০ মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন বুক করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

সেখানে ১৩০ কোটি দেশবাসীর জন্য ভারত প্রথম পর্বে কত ভ্যাকসিন বুক করেছিল জানেন? মাত্র ১৬ মিলিয়ন ডোজ। হ্যাঁ, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশ যখন ছারখার হতে বসেছে, তখন বিদেশি সংস্থাগুলির কাছের টিকার জন্য আবেদন জানাচ্ছে কেন্দ্র। বিভিন্ন দেশ ওইসব বিদেশি সংস্থাকে বহু আগেই বরাত দিয়ে রেখেছে। তাই এখনই সেসব টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

কোথায় অক্সিজেন?

করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় নাজেহাল রাজ্য সরকারগুলি অক্সিজেনের জন্য কেন্দ্রের কাছে কাতর আর্তি জানাচ্ছে? যত লোক করোনায় মারা যাচ্ছেন, তার চেয়ে মৃত্যু হচ্ছে অক্সিজেন না পাওয়ার কারণে। অক্সিজেনের জোগান স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হলে, এভাবে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি হত না। অনেক অমূল্য জীবন রক্ষা করা যেত।

দেশের ১৫০টি জেলা হাসপাতালে ১৬২টি অক্সিজেন ইউনিট স্থাপনের জন্য নরেন্দ্র মোদী সরকার টেন্ডার ছেড়েছিল গত বছরের অক্টোবরে। এর জন্য  পিএম কেয়ার্স তহবিল থেকে বরাদ্দ করা হয়েছিল ২০১ কোটি টাকা।

এ পর্যন্ত অর্থাৎ গত ৬ মাসে কয়টি অক্সিজেন ইউনিট বসানো হয়েছে জানেন? মাত্র ৩৩টি, যার ১৪টি ইউনিট বসানো হয়েছে উত্তরপ্রদেশে। প্রশ্ন উঠেছে, ৬ মাসেও কেন অক্সিজেন ইউনিট তৈরি করা গেল না, খরচ যেখানে মাত্র ২০০ কোটি টাকা (সরকারের কাছে অত্যন্ত নগন্য)। আর এখন কেন এত তৎপরতা?

বর্তমানে করোনার যে ভারতীয় ভাইরাসটি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, তা হল B.1.167. গবেষকরা জানাচ্ছেন, দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য দায়ী হল, করোনা ভাইরাসের এই ‘ডবল
মিউটেন্ট স্ট্রেনই (Double Mutant Strain)। কিন্তু জানেন কি এই ভাইরাসটি কখন চিহ্নিত করা হয়েছিল? ২০২০-র ৫ অক্টোবরে। এই মারাত্মক ভাইরাসের মোকাবিলায় তখন কোনও সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল কি? না হয়নি। অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর, এই তিন মাস কার্যত কিছুই করেনি কেন্দ্র।

এই ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি বুঝতে এ বছরের জানুয়ারিতে ১০টি ল্যাবরেটরিকে নিয়ে গঠন করা হয় COVID Genomics Consortium. বরাদ্দ করা হয় ১১৫ কোটি টাকা। এখনও পর্যন্ত এই ল্যাবগুলি খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি। কেন জানেন? কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার বায়োটেকনোলজি দফতরকে বরাদ্দ করা ১১৫ কোটি টাকা দেয়নি।

কেন কুম্ভমেলা, ভোটপ্রচারে অনুমতি?

দেশে যখন কোভিডের বাড়বাড়ন্ত, তখন কুম্ভমেলার মত ধর্মীয় জমায়েতে কেন অনুমতি দেওয়া হল?
লক্ষ লক্ষ মানুষের এই মেলায় করোনা বিধি যে মানা সম্ভব হবে না, তা কি সরকার বুঝতে পারেনি? তড়িঘড়ি করে শেষ পর্যন্ত যখন মেলায় লাগাম টানা হল, তখন যা সর্বনাশ হওয়ার, হয়ে গিয়েছে।

বিতর্ক তৈরি হয়েছে ৫ রাজ্যের ভোটে নিয়ন্ত্রণহীন প্রচারের অনুমতি দেওয়া নিয়েও। এরকম পরিস্থিতিতে কেন পশ্চিমবঙ্গে ৮ দফায় ভোট ক‍রা হল?

এখন কোন পথে মোকাবিলা?

গত বছ‍র করোনা দেশজুড়ে আচমকা লকডাউনের পথে হেঁটেছিল কেন্দ্র, যার জেরে চরম দুর্দশার শিকার হয়েছিলেন দেশবাসী। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন লকডাউন পথ নয়। একমাত্র শেষ বিকল্প হিসেবে লকডাউনের কথা ভাবা যেতে পারে।
সরকার কি আবার সর্বাত্মক লকডাউনের পথে হাঁটবে? নাকি আংশিক লকডাউন? নাকি এখন যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলবে? এগুলির উত্তর আমরা জানি না।

তবে একটি জিনিস স্পষ্ট, হাসপাতালে বেডের জন্য হাহাকার মিটবে না? রোগীদের জুটবে না আইসিইউ, আর অক্সিজেন না পেয়ে মরবেন অসংখ্য দেশবাসী।

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img