হোমPlot1দেবী দুর্গার কোনও উৎপত্তি নেই, রয়েছে শুধুই আবির্ভাব

দেবী দুর্গার কোনও উৎপত্তি নেই, রয়েছে শুধুই আবির্ভাব

দেবী দুর্গার কোনও উৎপত্তি নেই, রয়েছে শুধুই আবির্ভাব

কুলাবধূতাচার্য সোমানন্দ নাথ
প্রথমেই বলি, শ্রীদুর্গার কোনও উৎপত্তি নেই, রয়েছে শুধুই আবির্ভাব। দুর্গা আমাদের অন্তরে, প্রতিটি জীবের মননে, এমনকি দেবগণের ভিতরেও তিনিই বিরাজমান। তাই তাঁকে সৃষ্টি করতে হয় না, শুধু প্রকাশের জয়ধ্বনি দিতে হয়।

দুর্গা এই শব্দটির একটা বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, বাংলা অভিধানে এই দুর্গা শব্দটি ভাঙলেই বোঝা যাবে যে, তিনি আমাদের মধ্যে কিভাবে বিরাজমান। ‘দুর্গা’ অক্ষরকে, ভাঙলে দাঁড়ায় = দ্+উ+র্+গ্+আ। শাস্ত্রে বলছে,
‘দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।
উ কার বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত।।
রেফ রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।
ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত।।’

অর্থাত্‍ এই ‘দ’ অক্ষর দৈত্য দানব বিনাশকারী শক্তিকে উল্লেখ করে, আবার ‘উ’ বিঘ্ন নাশ করে, ‘রেফ’ কার মূলত সমস্ত ধরণের রোগ নাশ করাকেই বোঝায়, “গ’ অক্ষরটি পাপ নাশ করে এবং “আ” সকল শত্রু নাশ করে। আবার শব্দকল্পদ্রুমে বলা হয়েছে,

দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা প্রকীর্তিতা।
অর্থাত্‍,যিনি দুর্গমাসুর নামে অসুরকে বধ করেছিলেন, তিনিই দুর্গা নামে পরিচিতা। আবার আরকে অর্থে জীবের দেহের দুর্গ যিনি রক্ষা করেন এবং আত্মারূপে যিনি অধিষ্ঠান করেন, তিনিই দুর্গা। আবার-

‘প্রভাতে য স্মরেনিত্যং দুর্গা দুর্গা অক্ষরদ্বয়ম।
আপদং তস্য নশ্যন্তি তমোঃ সূর্যোদয়ে যথা।।’

অর্থাৎ, প্রতিদিন সকালে যে ব্যক্তি ‘দুর্গা দুর্গা’, এই নাম স্মরণ করেন, তাঁর মধ্যে থাকা সব অন্ধকার দূর হয় এবং সমস্ত বিপদ-আপদ দূর হয়। তাহলে, উল্লিখিত তত্ত্বে বোঝা গেল যে, শ্রীদুর্গা আমাদের অন্তরের সকল অসুর, সকল রোগ, সকল পাপ, এমনকি সকল শত্রুকে ধ্বংস করতেই আবির্ভূতা হয়েছিলেন। তিনি একাধারে যেমন দেবতাদের ত্রাণকর্ত্রী, ঠিক অন্যদিকে তিনি সব জীবের দুর্গতিনাশিনী। তিনি শিবের ঘরণী, আবার কখনও তিনি শবের ওপর অধিষ্ঠাত্রী।

শ্রীশ্রীচণ্ডীর মধ্যে আমরা তাঁকে তিন রূপে পাই – মহাকালী, মহালক্ষ্মী এবং মহাসরস্বতী। সবেতেই তিনি, আবার কোনও কিছুতেই তাঁকে সরাসরি ধরা যায় না। তিনি মধু-কৈটভ বধে যেমন শ্রী বিষ্ণুকে সাহায্য করেছেন, ঠিক তেমনই নিজেই মহিষাসুরকে নিধন করেছেন। আবার তাঁরই সৃষ্টিতে ৯ দেবী মিলিত শক্তিরূপে শুম্ভ নিশুম্ভকে নিধন করেছেন।

আমরা ধর্মগ্রন্থে পাই যে, শুভশক্তির দ্বারা অশুভকে পরাজিত করা হয়েছে। বেদের যুগে ঋষিরা এই দেবী দুর্গার শক্তিকেই সম্মান দিয়েছেন, প্রকট রূপে উল্লেখও করেছেন। অর্থাৎ, শক্তির হাতে অসুরদের পরাজয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শান্তি।

শ্রীশ্রীচণ্ডীতেই দেখেছি যে, দেবতারা যখন অসুরদের কাছে পরাজিত, রীতিমত স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সর্বত্র, তখন তাঁদের আশ্রয় নিতে হচ্ছে সেই কাত্যায়নের আশ্রমে। মূলত, পুরাকালে দেবতারা নিজেদের ভোগে এতটাই মত্ত ছিলেন যে, নিজ নিজ কর্তব্য থেকে সকলেই বিচ্যুত হয়েছিলেন। আর তখন এই সুযোগে অসুরেরা দখল করে নেয় স্বর্গরাজ্য। আবার সেই রাজ্য ফিরে পেতে, নিজেদের শক্তি ক্ষমতা সব ফিরে পেতে সেই তেজশক্তির আরাধনা করতে হয়েছে, যা তাঁদের অন্তরেই বিরাজমান, তিনিই দেবী দুর্গা।

শ্রীশ্রীদেবীমাহাত্ম্য চণ্ডীতে উল্লেখ করা হচ্ছে যে,
মহারাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি কৃপা পেয়েছিলেন দেবী চণ্ডীর। রাজা সুরথ ছিলেন সর্বগুণসম্পন্ন এক আদর্শ রাজা। কিন্তু তিনি বহিঃশত্রু হাতে আক্রান্ত হয়ে পরাজিত হন। ঘটনাচক্রে তিনি মহর্ষি মেধসের আশ্রমে এসে উপস্থিত হলে, সমাধি বৈশ্যের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তিনিও তাঁরই মতো মোহগ্রস্ত। এরপর মহর্ষি মেধস তাঁদের মনের দুঃখ দূর করতে তাঁদেরকে জগজ্জননী জগতের স্থিতিসংহারকারিণী মহামায়ার অপার লীলামাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। মধু-কৈটভ, মহিষাসুর, ধূম্রলোচন, চণ্ড-মুণ্ড, রক্তবীজ, শুম্ভ-নিশুম্ভ প্রভৃতি ভয়ানক অসুর ও দানবদের নিধনকারিণী। মহাবীর্যা মায়ের বুদ্ধি, শৌর্য, শক্তি ও ভক্তদের প্রতি দেবীর গভীর স্নেহ-করুণার কথা মেধা মুনি ব্যক্ত করেন।

এতে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য অচিন্ত্যরূপিণীর মহিমা বোঝেন এবং তাঁদের মনের মধ্যে ভক্তির উদয় হয়। এরপর মেধস মুনির পরামর্শে তাঁরা দেবীর কঠোর তপস্যা করেন। অবশেষে, শ্রীচণ্ডী তাদের সামনে প্রকট হন এবং তাদেরকে মনোবাঞ্ছিত বরপ্রদান করেন।

শ্রীশ্রী চণ্ডীর ত্রয়োদশ অধ্যায় বলছে, “হে নরপতি, অতি অল্পদিনের মধ্যেই তুমি শত্রুনাশ করিয়া নিজ রাজ্যে পুনরায় লাভ করিবে। তোমার সেই রাজ্যের এর বিচ্যুতি হইবে না এবং মৃত্যুর পর পুনরায় তুমি সূর্যদেব হইতে তৎপত্নী সবর্ণার গর্ভে জন্মলাভ করিয়া পৃথিবীতে সাবর্ণি নামে অষ্টম মনু হইবে।”

পরোক্ষভাবে, সমাধির উদ্দেশে দেবী বলেন, “হে বৈশ্যশ্রেষ্ঠ, তুমি আমার নিকট যে বর প্রার্থনা করিয়াছ, তাহা তোমাকে প্রদান করিতেছি। তোমার মুক্তিপ্রদ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হইবে।” অর্থাৎ, উল্লিখিত আলোচনায় বোঝা গেল যে, দেবী দুর্গা সব ভক্তের, দেব এমনকি সবার অন্তরে থাকা সেই তেজশক্তি, যাঁকে প্রতিমুহূর্তে বাইরে প্রকাশিত হতে হয়। যাঁর কোনও উৎপত্তি নেই, শুধুই আবির্ভাব রয়েছে।

  • কুলাবধূতাচার্য সোমানন্দ নাথ, আচার্য, বগলামুখী মাতৃ মিশন
spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img