হোমPlot1আজও তিনি বাংলা আর বাঙালির মোহর

আজও তিনি বাংলা আর বাঙালির মোহর

আজও তিনি বাংলা আর বাঙালির মোহর

ডঃ বিকাশ পাল, লন্ডন
তখন বিলেত থেকে ফিরে কানপুর আইআইটি-তে অধ‍্যাপনার কাজে যোগ দিয়েছি। দূরদর্শনে দেখলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীজি লোকসভায় উপস্থিত সদস‍্যদের সাথে কণিকা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের প্রয়াণে শোক পালন করছেন। সময়টা ২০০০ সালের এপ্রিল মাস। অমনি মনে পড়ল তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় ‘তবু মনে রেখো , যদি দূরে যাই চলে’ গানটি । ১২ অক্টোবর কণিকা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের ১০২তম জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে দু’চারটি কথা।

আমি রবীন্দ্রসংগীত নিয়মিত শোনা শুরু করেছি অনেক পরে, যখন ব্যাঙ্গালোরে স্নাতকোত্তর স্তরে পড়াশুনা করি। মূলত অভ‍্যাসটা হয়েছিল আমার দুই বাঙালি বন্ধুর থেকে। সেই তখন ক‍্যাসেটে কণিকা, সুচিত্রা, দেবব্রত, সাগর সেনদের গাওয়া গান শুনতে শুরু করি। খুব যে সে সব গান উপভোগ করতাম, সেটা বলতে পারি না। কারণটা সহজ, গানের মর্মার্থ বোঝার অক্ষমতা। বিগত ১০-১৫ বছর অবশ‍্য নিয়মিত শুনি। বছর কয়েক আগে ঢাকায় রেজওয়ানা চৌধুরী বন‍্যার সাথে দেখা আর গল্প হয়েছিল। তিনি কণিকার কাছে দীর্ঘদিন গান শিখেছেন শান্তিনিকেতনের সংগীত ভবনে। সেজন‍্য রেজওয়ানার গায়নশৈলী নিজের হলেও, পরিবেশনায় কণিকা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের একটা প্রছন্ন ছাপ পাওয়া যায়।

কণিকার জন্ম বাঁকুড়ার সোনামুখীতে হলেও, বাবা কর্মসূত্রে শান্তিনিকেতনে থাকতেন। তাই তিনি আশ্রম কন‍্যা হয়েই বড় হয়েছেন। কালবৈশাখীর ঝড়ে উত্তরায়ণের আম বাগানে আম কুড়োতে গিয়ে হোল এক বিপদ । হঠাৎ ঝেঁপে আসা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন‍্য শ‍্যামলীর বারান্দায় আশ্রয় নিতে হোল। আর সেই বিপদের আড়ালেই লুকিয়েছিল তাঁর সারা জীবনের সম্পদ। শ‍্যামলীর ঘরের জানলা থেকে গুরুদেব দেখতে পেলেন ছোট্ট মেয়েটিকে। ডেকে নিলেন। জানতে চাইলেন সে কাদের মেয়ে? গান করতে পারে কিনা। উত্তর এলো হ‍্যাঁ। একটি গানও শোনালেন। ব‍্যাস। তারপর গুরুদেব নিজেই তাঁকে ডেকে গান শেখাতেন। বাড়ির দেওয়া নাম অণিমা পাল্টে রাখলেন কণিকা – ডাক নাম দিলেন মোহর। পরে গুরুদেবের মোহর হয়ে উঠলেন বাঙালীদের মোহর। কলকাতায় রবীন্দ্রসদনের উল্টো দিকে ফাঁকা জায়গায় অনেক আগে যেখানে বইমেলা হতো, সেই জায়গার নাম হয়েছে মোহরকুঞ্জ, রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বাংলা তথা বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন‍্য। আমার মনে হয় রবিঠাকুরের গান গাওয়ার জন‍্যই তিনি জন্মেছিলেন।

সঙ্গীতশিল্পী হেমন্তবাবুর থেকে কণিকাকে লেখা একটি চিঠি নিয়ে বালিগঞ্জের বীরেন বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় শান্তিনিকেতনে ডেপুটি লাইব্রেরিয়ানের চাকরিতে যোগ দেন। কণিকা তখন শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালিম নিয়ে চলেছেন শৈলজানন্দ মজুমদারের কাছে। বেশ কিছু রেকর্ডও বেরিয়েছে। তাঁর নামও হয়েছে। সেই সঙ্গে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতও শিখে চলেছেন পুরো মাত্রায়। হেমন্তবাবুর চিঠি নিয়ে কণিকা মুখোপাধ‍্যায়ের সাথে বীরেনবাবু আলাপ করেন। আর সেই আলাপ বিয়ে পর্যন্ত গড়াল। তাই কণিকা মুখোপাধ্যায় থেকে কণিকা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়। তখন তাঁর ২০-২১ বছর বয়স। সুখী আর সহজ সরল জীবনযাপন করতেন তাঁরা। পোশাক পরিচ্ছদে বাহার বা আড়ম্বর না থাকলেও, আভিজাত্যের ছাপ থাকত। প্রকৃত রুচিশীল মানুষদের যা হয়। গানই তাঁর জীবন। সুরের যাদুতেই তিনি বিশ্বের নানান দেশে বসবাসকারী সব বাঙালি সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। পরে সঙ্গীত ভবনের অধ্যক্ষা হয়েছিলেন। অবসরের পর আমৃত্যু ছিলেন এমেরিটাস প্রোফেসর। পেয়েছেন ভারত সরকারের পদ্মশ্রী সম্মান সহ আরও কত কি।

আমার তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু তাঁর গান আমাকে শুধু নন্দিতই করে না, আমার মনকে ভরিয়ে দেয় এক মুগ্ধতায়।

তাঁর গানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব:
কণিকা বিষ্ণুপুর ঘরানার পণ্ডিতের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেন। রবিঠাকুর তাঁর গানের সুর কোনও না কোনও রাগের আধারে করেছেন। ভৈরব, বেহাগ, পূরবী, ইমন কল‍্যাণ – এইগুলি কবিগুরুর প্রিয় রাগগুলির মধ‍্যে পড়ে। তবে তাঁর গান বাণীপ্রধান। সেখানে রাগের সাথে পরিচয় একটু হলেই চলে। রাগের বিন‍্যাস, বিস্তার বা তানের মুন্সিয়ানার দরকার নেই। সুরে রাগের আবেশ আছে, কিন্তু রাগ সুরকে আগলে রাখেনি। তিনি কখনও এর প্রয়োজনও অনুভব করেননি। খুব বেশি রেওয়াজী গলার চেয়ে, মিষ্টি গলায় আবেগ অনুভুতি দিয়ে গাওয়াই বড় ব্যাপার। তাঁর গান যেন সকলেই একটু আধটু খালি গলায় গাইতে পারে। তাই রাগ কখনও কথাকে ছাপিয়ে যাক, তা তিনি চাননি। তাঁর গানে কথার জন্য সুর। সুরের জন্য কথা নয়।

কণিকা যেসব গান বিলম্বিত লয়ে কোনও যন্ত্র ছাড়া শুধু তানপুরার সাহায‍্য নিয়েই গেয়েছেন, সেগুলি শুনলে বোঝা যায়, তাঁর গলা কতটা সুরেলা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষা আর অনুশীলন তাঁর কত গভীর। আর গানে তার পরিমিত প্রয়োগে তিনি কত পারদর্শী। কবিগুরুর গানের অর্থ আমাদের মত সাধারণ বাঙালির কাছে কিছুটা হলেও সহজবোধ‍্য হয়েছে, তাঁর পরিবেশনার গুনেই। অথচ বিলম্বিত লয়েই রাগের রূপ আর রঙ বেরিয়ে আসে। কণিকার ক্ষেত্রে সেখানেও পরিবেশনায় গানের বাণীই প্রধান, রাগ নয়। ‘আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না ওগো’, ‘বাজে করুণ সুরে’ – এই গান দুটি শুনলে যাঁদের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জন্য একটু আধটু আগ্রহ আছে, তাঁরা ঠিক ধরতে পারবেন।

আবার যখন তিনি ভানুসিংহের পদাবলী থেকে মরণ রে তুহুঁ মম শ্যাম সমান গাইছেন, সেখানে শুরুতে বিলম্বিত লয়, পরে মধ্য/দ্রুত লয়। আবার বিলম্বিত লয়ে ফেরা। কত লয়কারি, অথচ সুর আর তালের উপর অনবদ্য নিয়ন্ত্রণ। গানের কথাই মুখ্য – সুর, তাল লয় অনুষঙ্গ মাত্র। কবিগুরুর একটি গানের কথা মনে এল এ প্রসঙ্গে –
“আমার এ গান ছেড়েছে তার
সকল অলংকার,
তোমার কাছে রাখে নি আর
সাজের অহংকার।
অলংকার যে মাঝে পড়ে
মিলনেতে আড়াল করে,
তোমার কথা ঢাকে যে তার
মুখর ঝংকার।”

কণিকা সেভাবেই গেয়েছেন,শুধু সুরে গেয়েছেন । তান, গমকের ঝঙ্কার তোলেননি। গানের কথাকে সামনে এনে তিনি শ্রোতার মনে একটি ছবি এঁকে দিয়েছেন। যেমন ধরা যাক ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’গানটি। আমার বিবেচনায় এটি তাঁর সিগনেচার সঙ। এই গান শুনলে আমাদের চেতনায় আমাদের আশেপাশের একটা চলমান আনন্দময় জগতের উপস্থিতি অনুভুত হয়। মনে হয় আমরা আমাদের চারপাশে বিশ্ববিধাতার যেসব আয়োজন, সেসবের সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছি। তাদের প্রাণপ্রবাহের সাথে আমাদের জীবনের প্রবাহ একাত্ম হয়ে গিয়েছে। ইংরেজিতে যাকে বলে harmonious existence. কোথাও কোনও ফাঁক বা অসঙ্গতি নেই। আমরা সকলেই সেই পূর্ণের, সেই আনন্দের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই গানে কণিকা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শ্রুতি আর মীড় অসাধারন দক্ষতায় প্রছন্ন ভাবে কাজে লাগিয়েছেন।

গুরুদেবের এই গানের সুরের আধার হল মালকোষ রাগ। উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এই রাগের বিশিষ্টতা হল, কোমল গান্ধার (গা), কোমল ধৈবত (ধা) আর কোমল নিষাদ (নি) – এই তিন কোমল স্বর বা নোটের উপস্থিতি। এছাড়া ষড়জ (সা) আর শুদ্ধ মধ্যম (মা)। পাঁচটি স্বরের রাগ হল মালকোষ। এই রাগে মীড়ের সুন্দর প্রয়োগ হয়। মীড় হল, একটি স্বর থেকে অন্য স্বরে স্লাইড করে বা মাড়িয়ে মাড়িয়ে যাওয়া। মধ্যম (মা) থেকে কোমল গান্ধার (গা) হয়ে ষড়জে (সা)-এ নামার সময়, এই রাগের সুরে পণ্ডিত উস্তাদেরা বেশ কালোয়াতীর সাথে মীড়ের প্রয়োগ করেন। গানের সঞ্চারীর লাইন গুলি ধরা যাক- বসিয়া আছো কেন আপন মনে, স্বার্থ নিমগ্ন কি কারণে ?’।

‘মনে’ আর ‘কারণে’ এই দুটি শব্দ গাইতে গিয়ে যে মুন্সিয়ানার সাথে কণিকা মীড়ের ব্যবহার করেছেন, সেটি সত্যিই তাঁর কণ্ঠে অনবদ্য। গানটি মন দিয়ে বেশ কয়েকবার শুনলে তবে ধরা যায়। হেমন্তবাবুর উদ্যোগে লতা মঙ্গেশকর রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন ঠিকই কিন্তু তিনি কণিকার গানের এক বিরাট অনুরাগী। তিনি হেমন্তবাবুকে বলেছিলেন কণিকার গান শোনার পর তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে ইচ্ছেই ছিল না। কিন্তু হেমন্ত, সলিলদবাবুদের সহজে না বলতে পারতেন না বাংলা গান গাওয়ার অনুরোধ এলে। কণিকার মতো বিশ্বভারতী লতাজিকেও দেশিকোত্তম সম্মানে ভূষিত করে। সেই সম্মান নিতে এসে লতাজি কয়েক ঘণ্টা কণিকার শান্তিনিকেতনের বাড়িতে সময় কাটিয়েছিলেন।

কণিকা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়াও কিছু কিছু ভজন, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদী, আধুনিক গেয়েছেন জেনেছি। সে সব আমার শোনা হয়নি। তবে তাঁর প্রথম রেকর্ড আধুনিক গানের। সে রেকর্ড বার হওয়ার খবরে গুরুদেব ব্যথিত হয়ে শৈলজানন্দ মজুমদারের কাছে আক্ষেপ করে বলেছিলেন “জানো তোমার ছাত্রী মোহর গান রেকর্ড করেছে, তবে এখানের নয়, বাইরের”। তখন কণিকা ১৩-১৪ বছরের কিশোরী । সেই ঘটনার পর থেকে তিনি আর কোনওদিন আধুনিক গানের রেকর্ড করেননি। সলিল চৌধুরীর মত সুরকারকেও তিনি না করে দিয়েছিলেন।

তিনি কোনওদিন তাঁর এত খ্যাতি পরিচিতির কোনও সুযোগ-সুবিধাও নেননি। তাঁর জীবনের একটি ঘটনার উল্লেখ করলে এটা বিশ্বাসযোগ্য হবে। একবার তিনি ট্রেন ধরে শান্তিনিকেতন যাওয়া্র সময় হাওড়া স্টেশনে ব্যাগ প্লাটফর্ম থেকে তুলে ট্রেনের সিটে বসে দেখলেন, একটি ব্যাগ তুলতে ভুলে গিয়েছেন । ট্রেন ছাড়তে দেরি ছিল। সঙ্গে সঙ্গে প্লাটফর্মে নেমে দেখলেন সে ব্যাগ আর নেই। কেউ হয়তো নিয়ে পালিয়েছে। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা দু’একজনকে জিগ্যেস করলেন সে ব্যাপারে। কেউ কিছু বলতে পারল না। টিকিট চেকার এলেন কামরায়, তাঁকেও কিছু বললেন না। বাড়িতে এসে বললেন সে কথা তাঁর এক গানের ছাত্রকে। গানের ছাত্রটি বললেন, দিদি আপনি হাওড়ায় ট্রেন ছাড়ার আগে রেলের পোশাক পরা কোন কর্তাকে বললেন না কেন আপনার নাম করে? কণিকা বললেন হাওড়া স্টেশনে রেলে কাজ করা কোনও কর্তা তাঁকে চেনেন যে, এসব বললে তাঁরা শুনবেন। তাঁর মতো এক তারকা শিল্পীর নাম শুনেই যে কত মানুষ তাঁকে সাহায্যের জন্য জড় হয়ে যেতে পারতেন, সেই ভাবনা তাঁর মাথতেই আসেনি। হয়তো সেই জন্যই তিনি খ্যাতির ওই অত উচ্চতায় পৌঁছেছেন। তাই তিনি আজও বাংলা আর বাঙালির মোহর।

জন্মদিনে তাঁকে আমার বিনম্র প্রণাম।

  • লন্ডন-প্রবাসী ডঃ বিকাশ পাল ইম্পিরিয়াল কলেজের ফ্যাকাল্টি। বর্তমানে তিনি ইলেকট্রিক পাওয়ার সিস্টেমের অধ্যাপক। এছাড়া, আইইইই, রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (ব্রিটেন), চাইনিজ সোসাইটি অফ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (আইএনএই)-এর মতো বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে ফেলোর সম্মানে সম্মানিত।
spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img