ডঃ বিকাশ পাল, লন্ডন
আজ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিন। তাঁর লেখা বর্ণপরিচয় দিয়েই আমার মত কত বাঙালীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু। রামমোহনের সতীদাহ বিরোধী সামাজিক আন্দোলনের পরে বাংলার শিক্ষা সংস্কারে বিদ্যাসাগর। সাহিত্যে মূলত রবীন্দ্রনাথ। বিদ্যাসাগর বেথুন স্কুল খুলে দেশে নারী শিক্ষার সংস্কার (শুরুও বলা যেতে পারে) করেন।
লেখক বিদ্যাসাগর
তিনি যতটুকু লিখেছেন মূলত তা শিক্ষামূলক হলেও, তাতে তাঁর জীবনবোধের একটা স্পষ্ট পরিচয় রেখেছেন পাঠকের কাছে। মনের শিক্ষাতেই তিনি বেশি জোর দিয়েছেন আর সেটাই লিখেছেন। তাঁর লেখায় গোপাল, ভুবন মাসী এই সব চরিত্রকে ঘিরে যে সব ঘটনার ঘনঘটা, তাতে শিক্ষার উদ্দেশ্য যে মনুষ্যত্বের বিকাশ, সে বার্তা স্পষ্ট। তিনি সবসময় জীবনকে সামনে থেকে দেখেছেন। কখনও ফিরে তাকাননি। তাঁর কাছে জীবন আর জগৎ সব সময় গতিময়। ‘জগৎ’ এই শব্দটার মধ্যেই যে গতি কথাটা লুকিয়ে আছে, সেটা আমরা সহজে ধরতে পারি না । তাই তাঁর জীবন আর জগৎ চেতনার মত তাঁর লেখাতেও কত গতি।
বেতাল পঞ্চবিংশতির প্রতিটি গল্পে ঘটনা প্রবাহ কত দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। একেকটি গল্প তাই এক পাতাতেই শেষ অথচ সম্পূর্ণ। শেক্সপিয়ারের কমেডি অফ এররস-এর মধ্যে যে অসাধারণ একটা সাহিত্য রস আছে, সেটা বোধ হয় বিদ্যাসাগর বেশ উপভোগ করেছিলেন। তাই ভ্রান্তি বিলাসে তিনি পাঠকের কাছে এত হাস্যরসিক। তবে তিনি পটভূমিটা একেবারে পাল্টে তাতে আদ্যোপান্ত বাঙালিয়ানা এনেছিলেন। নাটকীয় না করে গল্পের মাধ্যমে পাঠকের কাছে পরিবেশন করেন। তবে তাতেও শেক্সপিয়ারের রচনার মতোই বিভ্রান্তি (confusion) , বিশৃঙ্খলা (chaos), বিপত্তি (crisis) আর নিস্পত্তি (resolution) -এসবই আছে।
মানুষ বিদ্যাসাগর
ভ্রান্তিবিলাসের বিদ্যাসাগর রসিক হলেও, বাস্তব জীবনে কিন্ত তিনি বেশ গুরুগম্ভীর মানুষ ছিলেন। প্রয়োজনের বেশি কথা বলতেন না। একেবারে সময় আর নিয়মবর্তী মানুষ। পোশাক-আশাক সাদামাটা হলেও, ঘরদোর পরিপাটি করে সাজানো পছন্দ করতেন। আর পরিশীলিত জীবনের আনন্দ ও সৌন্দর্য উপভোগ করতেন। তবে উত্তর কলকাতার রাজা জমিদার, বাবু বিবিদের বিলাস বৈভবময় আচার অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকতেন, যাকে বলে টোটাল নো ননসেন্স্ লাইফ। তবে তাঁর নিজের চরিত্রের মধ্যে দয়া , করুণা সহমর্মিতা আর নমনীয়তা বোধ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ।
জীবনের শেষ দিকে কার্মাটারে শীতের সকালে পাড়ার দোকানে চা খেতে খেতে যখন নিজের গায়ে থাকা শালটি পাশে এক কনকনে ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপতে থাকা আদিবাসী রমণীকে দেখে দিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাতেই তাঁর দয়ার বড় পরিচয় পাই। সত্যিই এই ঘটনার কথা যখন পড়েছিলাম, তখন আমারও চোখ ছল ছল করে উঠেছিল আর তাঁকে তখন মনে মনে প্রণাম করেছিলাম। সেজন্যই তাঁর জীবনের দয়া মনুষ্যত্ব বোধের দিকগুলিও আমাকে আরো বেশি করে আকৃষ্ট করেছে। দয়াই তাঁর বিত্ত। মনুষ্যত্বই তাঁর জীবনের বড় ঐশ্বর্য। এটা আমি বুঝতে পেরেছি অনেক বয়স হওয়ার পর, তাঁকে অন্তত কিছুটা পড়ার পর।
রবিঠাকুর লিখেছিলেন:
“তোমায় দিতে পূজার ডালি
বেরিয়ে পড়ে সকল কালি ,
পরাণ আমার পারিনে তাই পায়ে থুতে।
দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে।
নইলে কি আর পারবো তোমার চরণ ছুতে॥”
বিদ্যাসাগর তাঁর কাজে কর্মে তাঁর দয়া, করুণা, বিবেক দিয়ে তাঁর অন্তরের জীবনদেবতার চরণ ছুঁয়েছিলেন।
সমাজ সংস্কারক বিদ্যাসাগর
বাংলাদেশে শুধু বিধবা বিবাহ প্রথা চালুই করেননি, নিজের ছেলের সাথে এক বিধবার বিয়েও দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এতটাই বিদ্যাসাগরের এই বিধবা বিবাহ প্রথার সমর্থক ছিলেন যে, তিনিও অনেক পরে তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিয়ে দিয়েছিলেন বিধবা প্রতিমাদেবীর সাথে। রবীন্দ্রনাথ মেদিনীপুরে এসেছিলেন তাঁর জীবনের প্রায় শেষ লগ্নে (১৯৩৮-৩৯), বিদ্যাসাগর মঞ্চের উদ্বোধনে। চারদিন ছিলেন মেদিনীপুর শহরে। মেদিনীপুরের মাটিতে মাথা রেখে প্রণাম করেছিলেন। বলেছিলেন এই মাটিকে প্রণাম করাই তাঁর এখানে আসার মূল উদ্দেশ্য। মঞ্চ উদ্বোধনটা কিছুটা উপলক্ষ বা হেতু। তিনি বিদ্যাসাগরের উপর অসাধারণ দুটি প্রবন্ধ (বিদ্যাসাগর চরিত – ১ ও ২ ) লিখেছিলেন। সেটা গীতাঞ্জলি লেখার আগেই। আমি এক বারের বেশি পড়েছি। একজনের প্রতি কতটা ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা থাকলে, মূল্যায়নটা এতটা সর্বাঙ্গীন আর অভিঘাতমূলক হয়, সেটা যাঁরা পড়েছেন তাঁরা অনুভব করতে পারবেন।
আমার মত একজন সাধারণ প্রবাসী বাঙালির বিবেচনায় রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ – মূলত এই তিন বাঙালি মনীষীর কর্মজীবনই বাঙালিদের মননশীলতায় আধুনিকতা আর অসাম্প্রদিয়কতা বোধের জন্ম দিয়েছিল। সেই রেশটা বাঙালিদের জীবনবোধে এখন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে চলেছে। তবে স্রোতটা ক্ষীণ হলেও, একেবারে বন্ধ হয়ে যায় নি।
হয়ত সেজন্য এখনও বিদ্যাসাগরের জন্মের ২০০ বছরেরও বেশি পরে যেখানে গুজরাটে ছেলে মেয়ের জন্মের অনুপাত ১০০০ : ৮৫৬ ; সেটা বাংলায় ১০০০: ৯৫৩ ( ২০১১ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী) । এই তথ্য প্রমাণ করে অর্থনৈতিক উন্নতির দিক থেকে দেশে গুজরাট, হরিয়ানা, পাঞ্জাব বেশ এগিয়ে থাকলেও, মানব উন্নয়নের সূচকে এখনও পূর্ব ভারতের থেকে পিছিয়ে। এখানে একটা সূচক মানুষের উন্নতির , আর অন্যটা মানুষের প্রগতির। দুটো আলাদা হলেও, অবিচ্ছেদ্য করে দেখলে মানুষের অগ্রগতির মূল্যায়ন একপেশে হয়ে যায়। তাই আমার কাছে প্রগতি, উন্নতির চেয়েও বেশি গুরুত্বের। এজন্য বাঙালীরা বিদ্যাসাগরের মতো মানুষের কাছে চিরঋণী।
বিদ্যাসাগরকে আজ আমার বিনম্র চিত্তে প্রণাম।
- লন্ডন-প্রবাসী ডঃ বিকাশ পাল ইম্পিরিয়াল কলেজের ফ্যাকাল্টি। বর্তমানে তিনি ইলেকট্রিক পাওয়ার সিস্টেমের অধ্যাপক। এছাড়া, আইইইই, রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (ব্রিটেন), চাইনিজ সোসাইটি অফ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (আইএনএই)-এর মতো বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে ফেলোর সম্মানে সম্মানিত।



