হোমPlot1Editorial: মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আদৌ প্রয়োজনীয়তা আছে কি?

Editorial: মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আদৌ প্রয়োজনীয়তা আছে কি?

Editorial: মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আদৌ প্রয়োজনীয়তা আছে কি?

বিতর্কের কেন্দ্রে পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। রাজ্যে বর্তমানে যে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে, তার সঙ্গে আলাদা করে মাদ্রাসা শিক্ষার আদৌ কোনও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি? ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করে ভারতের মত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের জন্য এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতা কোথায়? বিভিন্ন সময়ে এরকম প্রশ্ন উঠে এসেছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের অননুমোদিত ও পরিকাঠামোহীন মাদ্রাসাগুলির বিরুদ্ধে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে চলেছে। সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর সম্প্রতি কলকাতা এবং রাজ্যের ২২টি জেলায় সম্প্রতি সমীক্ষা চালিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে। সমীক্ষায় খারিজি মাদ্রাসাগুলির উপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল। এই সমীক্ষায় মোট ২,৩৯৬টি অনুমোদনহীন বা খারিজি মাদ্রাসার সন্ধান মিলেছে।

পরিকাঠামো ও নিয়মের অসঙ্গতির কারণে প্রথম দফায় ২৫২টি মাদ্রাসাকে বন্ধেরও নোটিস দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সংখ্যালঘু প্রভাবিত দুই জেলা মালদহ ও উত্তর দিনাজপুরে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জেলাভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে বন্ধের নোটিস দেওয়া হয়েছে মালদহে। প্রায় ৪৪-৪৫টি। এরপর রয়েছে উত্তর দিনাজপুর, সেখানে প্রায় ৩৭টি মাদ্রাসাকে বন্ধের নোটিস দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ ২৪ পরগনায় প্রায় ৩২টি এবং মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় প্রায় ২৫টি করে মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১০০টি মাদ্রাসাকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে বৈধভাবে অনুমোদিত মাদ্রাসার সংখ্যা ২,১৩২টি।

সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু জানিয়েছেন, সন্তোষজনক জবাব না মিললে ওই প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সমীক্ষায় প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন, পরিচালন ব্যবস্থা, পড়ুয়ার সংখ্যা ও পরিচয়, শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা, পরিকাঠামো এবং অর্থের উৎস সবকিছুই খতিয়ে দেখা হয়। প্রশাসনিক রিপোর্ট পাওয়ার পর তথ্য যাচাই করতে রাজ্যস্তর থেকে বিশেষ পরিদর্শন এবং তদন্তকারী দলও পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলির দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল রয়েছে কি না, তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখা হয়।

সমীক্ষায় বেশ কিছু সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাব, পড়ুয়া ও শিক্ষকের সংখ্যা কম থাকা, রাজ্যের নির্ধারিত স্কুলের পাঠ্যক্রম থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি এবং প্রশাসনিক নিয়ম না মানা। এসব কারণেই একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একসময় বলেছিলেন, অনুমোদনহীন মাদ্রাসাগুলি জঙ্গি বা সন্ত্রাসবাদী তৈরির আঁতুড়ঘর। তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে সেই সময় তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। দলের মধ্যেই আক্রমণের মুখে পড়েন তিনি। বুদ্ধদেববাবু আবেগপ্রবণ মানুষ। তাই আবেগের বশে শুনতে অপ্রিয় হলেও, সত্যি কথাটা তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল।

৩৪ বছরের বাম শাসনে সংখ্যালঘুরাই ছিলেন বামেদের প্রধান ভোট-ব্যাঙ্ক, পরবর্তীকালে তাতে থাবা বসায় তৃণমূল কংগ্রেস। তাই বাম বা তৃণমূল, কোনও দলই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কখনও কোনও পদক্ষেপ গ্রহণের পথে তো হাঁটেইনি, বরং মুসলিমদের নানা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। সংখ্যালঘু তকমার আড়ালে মুসলিমদের জন্য এই সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থা বেশি ক্ষতি করেছে মুসলিমদেরই। মাদ্রাসা শিক্ষার নামে সমাজের মূল শিক্ষার স্রোত থেকে তাদের কার্যত এক বিচ্ছিন্নতার পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যার পরিণতি হিসেবে দেখা গেছে, অপরাধ জগতের সঙ্গে মুসলিম পরিবারের সন্তানদের বেশি বেশি করে জড়িয়ে পড়া।

নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে বাম এবং তৃণমূল কংগ্রেস, দুই দলই শিক্ষার সঙ্গে ধর্মকে মিশিয়ে দিয়ে মুসলিম সমাজের একটা বড় অংশকে অন্ধকারের পথে ঠেলে দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদ বা ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড অফ মাদ্রাসা এডুকেশন হল সম্ভবত ভারতের প্রাচীনতম প্রাক-মাধ্যমিক বোর্ডগুলির মধ্যে একমাত্র মাদ্রাসা বোর্ড, যা ভারত সরকারের স্বীকৃত। সরকার স্বীকৃত আলিয়া মাদ্রাসায় প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সিনিয়র মাদ্রাসাগুলিকে আলিম এবং প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মাদ্রাসাগুলিকে ফাজিল বলা হয়।

সাচার কমিটি রিপোর্টে ভারতের মুসলিমদের ভয়াবহ দুর্দশার ছবি ধরা পড়েছিল। মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাগত পিছিয়ে পড়া অবস্থা মূল্যায়নের জন্য ২০০৫ সালের মার্চ মাসে দিল্লি হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেন্দ্র সাচারের নেতৃত্বে এই সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এই কমিটি গঠন করেন এবং ২০০৬ সালের ৩০ নভেম্বরে কমিটির রিপোর্ট সংসদে পেশ করা হয়।

এই কমিটি গড়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, ভারতের মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষাগত বাস্তব চিত্র তুলে ধরা এবং সরকারি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি মূল্যায়ন করা।

সাচার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে সরকারি উচ্চপদে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৪.৭ শতাংশ, এবং মোট সরকারি চাকরিতে মাত্র ২.১ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রছাত্রীদের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ৩-৪ শতাংশ মুসলমান। তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনে এই পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অনুমোদনহীন মাদ্রাসাগুলির বিরুদ্ধে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেবেন, সেইসঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর অসন্তোষের কথাও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। রাজ্য সরকারের উচিত, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটিয়ে ধর্ম নির্বিশেষে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসা। তাতে আখেরে লাভ হবে মুসলিমদেরই।

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img