হোমআন্তর্জাতিকতারেক সরকারের বাজেটে শুধুই প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়নের কোনও দিশা নেই

তারেক সরকারের বাজেটে শুধুই প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়নের কোনও দিশা নেই

তারেক সরকারের বাজেটে শুধুই প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়নের কোনও দিশা নেই

নয়ন বিশ্বাস রকি
ভাবছেন বাজারের খরচ বেড়েছে, সন্তানের শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে, চিকিৎসার বিলও কম নয়। টেলিভিশনের পর্দায় দেখলেন নতুন বাজেট। সেখানে কর ছাড় আছে, মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি আছে, কর্মসংস্থানের কথা আছে, এমনকি আগামী দশকে দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার স্বপ্নও আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব কি সত্যিই সহজ হবে? ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে এই প্রশ্নের প্রেক্ষাপটেই দেখতে হবে। কারণ বাজেট শুধুমাত্র আয়-ব্যয়ের হিসেব নয়; এটি একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন। দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার যে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট দিয়েছে, সেখানে উচ্চাভিলাষের অভাব নেই।

কিন্তু বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় স্বপ্নের আকার দিয়ে নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতা দিয়ে। সরকার বাজেটকে নাম দিয়েছে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। নামের মধ্যেই একটি রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, আর্থিক ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, পরিবেশ ও সুশাসন – এসবকে অগ্রাধিকার দিয়ে এক ধরনের পুনর্গঠনের রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন।


আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধুমাত্র কারখানা বা কৃষিক্ষেত্র থেকে আসে না। আসে মেধা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং সংস্কৃতিনির্ভর শিল্প থেকেও। তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়। লক্ষ্য নির্ধারণ তুলনামূলক সহজ, কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের রোডম্যাপ কতটা স্পষ্ট? যে কোনও বাজেটের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো – টাকা কোথা থেকে আসবে? সরকার আগামী অর্থবছরে বিপুল ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধানও তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে, অন্যদিকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।

সমস্যা হলো, বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। প্রায় প্রতি বছরই লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব আদায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফারাক দেখা গেছে। এবারও করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই কথা আমরা বহু বছর ধরেই শুনে আসছি। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা এখনও সীমিত সংখ্যক মানুষের ওপর নির্ভরশীল। নতুন করদাতা যুক্ত করার প্রক্রিয়া ধীর। ফলে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য অর্জন করা সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বৈদেশিক ঋণ। নতুন অর্থবছরে বিদেশি ঋণপ্রাপ্তির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু বৈদেশিক অর্থায়ন এখন আর কেবল অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় নয়- এটি সংস্কার, সুশাসন ও নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। অর্থাৎ কাগজে-কলমে ঋণ পাওয়ার পরিকল্পনা করা সহজ, কিন্তু বাস্তবে সেই অর্থ সময়মতো পাওয়া মোটেও সহজ নয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গাগুলির একটি হল, ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্র। খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, আস্থাহীনতা – সব মিলিয়ে এই ক্ষেত্র এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি। এই অবস্থায় সরকার যদি ব্যাপক হারে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেয়, তাহলে একটি পরিচিত ঝুঁকি সামনে আসবে – ‘ক্রাউডিং আউট’ বা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থ সংকট। আরেকটা বিষয় – সরকার যখন ব্যাঙ্ক থেকে বেশি ঋণ নেয়, তখন উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিনিয়োগ কমে যায়। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থনীতির গতিও কমে যায়। অথচ এই বাজেটের অন্যতম লক্ষ্যই হচ্ছে বিনিয়োগ-নির্ভর কর্মসংস্থান। অর্থাৎ লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা এখন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

এই বাজেটের অন্যতম আলোচিত দিক হল, কর ছাড়। ব্যক্তিগত আয়করে স্বস্তি দেওয়া হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ফ্রি-ল্যান্সার, স্টার্টআপ ও কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের ওপর কর কমানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্ষেত্রেও বড় সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতমুখী।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে মানুষের ধৈর্য অনেকটাই ক্ষয় হয়েছে। এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক জিডিপি নয়, বরং বাজারের চাল-ডাল-তেল, সন্তানের চাকরি এবং চিকিৎসার খরচ। তারা জানতে চায়- মূল্যস্ফীতি কি কমবে? নতুন চাকরি কি তৈরি হবে? ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় কি আস্থা ফিরবে? আরও জানতে চায়, ব্যবসা করা কি সহজ হবে? বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে।

প্রস্তাবিত বাজেট দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৃদ্ধি এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রণয়ন করা হলেও, এর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক দিক রয়েছে, যা অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট এবং আয় বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে বাজেটের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।


প্রথমত, বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও সুস্পষ্ট পদক্ষেপের অভাব লক্ষ্য করা যায়। গত কয়েক বছর ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। যদিও সরকার মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তবে বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী উদ্যোগের অভাব রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বাজেটে করের বোঝা তুলনামূলকভাবে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের ওপর বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরোক্ষ কর, ভ্যাট এবং বিভিন্ন পরিষেবার ওপর কর বৃদ্ধির কারণে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ধনী শ্রেণির তুলনায় মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষ এসব করের প্রভাব বেশি অনুভব করে, যা আয় বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তৃতীয়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে বাজেটে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে সমালোচনা রয়েছে। দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচিতে আরও বেশি বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল। কর্মসংস্থানের সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাবে যুব বেকারত্ব আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

চতুর্থত, বাজেট ঘাটতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ বাড়বে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের একটি বড় অংশ ঋণসেবায় ব্যয় হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পঞ্চমত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দ দেশের প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অপর্যাপ্ত। একটি উন্নয়নশীল দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এই দুটি ক্ষেত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাজেটে এসব ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধির হার প্রত্যাশিত নয়। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার মানোন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন কঠিন হতে পারে।

ষষ্ঠত, কৃষিক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সহায়তা না থাকাও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। কৃষি এখনও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সার ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণে কৃষকরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। বাজেটে কৃষকদের জন্য আরও বেশি ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন ছিল।

সপ্তমত, কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বা কর ছাড়সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে, তা সৎ করদাতাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। এটি করনৈতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এবং দীর্ঘমেয়াদে কর সংস্কৃতিকে দুর্বল করতে পারে।

অষ্টমত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হলেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় ভাতার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত। দরিদ্র, বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান সহায়তা তাদের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

সবশেষে, বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো সম্পন্ন হয়নি এবং বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি, অপচয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা বাজেট বাস্তবায়নের বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। সহজ করে বললে, বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আসলে স্বপ্ন দেখার মধ্যে দোষ নেই। বরং রাষ্ট্রকে সামনে এগোতে হলে বড় স্বপ্ন দেখতেই হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, স্বপ্ন তখনই শক্তি হয়ে ওঠে যখন তার সঙ্গে বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা যুক্ত হয়। দেশের মানুষ বহু বছর ধরে নানা প্রতিশ্রুতি শুনেছে। এখন তারা প্রতিশ্রুতির চেয়ে ফলাফল দেখতে বেশি আগ্রহী। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘মানুষ আর মোহের তরঙ্গে ভাসতে চায় না। তারা বাস্তব পরিবর্তন চায়।’

নয়ন বিশ্বাস রকি প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজসেবক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মী

spot_img
spot_img

সবাই যা পড়ছেন

spot_img