“সন্ন্যাসী চিন্ময় প্রভু এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জেলখানার ভিতরে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আর কতদিন রাষ্ট্রযন্ত্র মিথ্যা মামলা দিয়ে এভাবে আটকে রাখা হবে? রাষ্ট্রের কাছে জানতে চায় দেশের জনগণ।” এই প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট সমাজসেবিকা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সংগঠক প্রাইমা হোসেন। তাঁর প্রশ্ন, আইনের শাসনের নামে অপব্যবহার করে বর্তমানে ক্ষমতাসীন তারেক রহমানের সরকার আসলে কী প্রমাণ করতে চাইছেন?

কারাবাস বনাম বিচারের দীর্ঘসূত্রতা
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তিকে বিনা বিচারে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায় না। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩ বলছে – গ্রেফতার করা ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে এবং তাঁর জামিনের অধিকার রয়েছে।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী ও আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় জামিন পেলেও নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানো – এই ‘মামলার বেড়াজাল’ নিয়ে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হবে কেন?
গাইবান্ধায় মন্দির নির্মাণ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা
সাম্প্রতিক সময়ে গাইবান্ধায় এক ব্যক্তি নিজ জমিতে নিজ অর্থে রাম মন্দির তৈরি করতে গেলে একটি গোষ্ঠী মানববন্ধন করে বাধা দেয়। “এখানে মন্দির করা যাবে না”, এই স্লোগান তোলা হয়।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪১(১)-এ স্পষ্ট: “আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের যে কোনও ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রহিয়াছে।”
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূলমন্ত্র ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। প্রাইমা হোসেনের ভাষায় – “এই বাংলাদেশ তো সেই বাংলাদেশ নয়। ১৯৭১ সালে আমরা ধর্মের নামে বিভাজনের বিরুদ্ধে লড়েছি। আজ নিজ জমিতে উপাসনালয় বানাতে বাধা এলে প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি আবার পিছনের দিকে হাঁটছি?”
আইনের শাসন কার জন্য?
আইনের শাসন মানে কারও জন্য নরম, কারও জন্য কঠোর নয়। অপরাধী হিন্দু হোক, মুসলিম হোক, আওয়ামী লীগ হোক বা বিএনপি – আইন সবার জন্য সমান। অনুচ্ছেদ ২৭ বলছে – “আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।”
প্রাইমা বলেন, “যদি মিথ্যা মামলা দিয়ে কাউকে হয়রানি করা হয়, তবে তা শুধু ব্যক্তির উপর আঘাত নয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার উপর আঘাত। আবার যদি উগ্র গোষ্ঠী সংবিধান অমান্য করে সংখ্যালঘুর ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ করে, তবে রাষ্ট্রের নীরবতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।”
প্রাইমা বলেন, “আওয়ামী লীগের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে বিএনপি চাঁদাবাজি ও লুটপাটের মহোৎসব চালাচ্ছে। জামায়াত-বিএনপি-ড. ইউনূসের শাসনকালে কারাগারের ভিতরেই আওয়ামী লীগের ২৯৭ জন নেতাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর, ২০৬ জন হিন্দুকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা বিশ্ববাসী দেখেছে। সন্ন্যাসী চিন্ময় প্রভুকে মিথ্যা মামলায় ২ বছর ধরে কারাগারে অমানবিক নির্যাতন করা হচ্ছে।”
আগে বিএনপি মুখে আইনের শাসন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসনের কথা শোনা যেত। অথচ তারাই একদলীয় নির্বাচনের নজির স্থাপন করেছে। ৬৫% দেশবাসীকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এটাই কি গণতন্ত্র? এই প্রশ্ন তুলছেন দেশের সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশ কারও একার নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডা সবার নিরাপত্তা। জেল-জুলুম দিয়ে মত দমন করা যায় না, মানবন্ধন দিয়ে সংবিধান বদলানো যায় না।
বিশিষ্ট এই সমাজসেবীর প্রশ্ন, রাষ্ট্র কি সংবিধানের পক্ষে দাঁড়াবে, নাকি জনতার উস্কানির কাছে মাথা নত করবে? বিচার কি আদালতে হবে, নাকি রাজপথে?



