ডঃ বিকাশ পাল
নয় নয় করে আমার প্রায় বার পনেরো এই দেশে আসা হয়ে গেল। কিন্তু সবই বড় শহরে। শুধু ভাষণ, ভোজন আর হাততালি – কখনই তার বাইরে বেরোনো হয়ে ওঠে না। অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল এই দেশের কোনও এক গ্রামে একটা দিন কাটায়। একেবারে জন কোলাহলের বাইরে । রোদ ঝলমল খোলা আকাশের নীচে। একেবারে প্রত্যন্ত যে সব মানুষ, যারা আছে মাটির কাছাকাছি, তাদের সাথে।এদের ভাষা বুঝি না, তবে তাতে কি। রবি ঠাকুর লিখেছিলেন – “চির জনমের পরিচিত ওহে তুমিই চেনাবে সবে”। মানুষ তো মানুষই। তাদের জানার জন্য আর তাদের সাথে মেশার জন্য আগ্রহই যথেষ্ট নয় কি।
কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডন থেকে ফোনে কথা হচ্ছিল অধ্যাপক ইফেই গুয়োর সাথে। ইফেই এক সময় আমার ছাত্র ছিল। এখন সে দেশে ফিরে শানডঙ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে। বছরও ঘোরেনি, সে বিয়ে করেছে। শুনলাম মেয়েটিও ওর মত শানডঙ প্রদেশের এক ছোট মফঃস্বল শহরের থেকে আসা। নাম শান। ওর নামের বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় পার্বতী।

শান অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর। জিনান শহরে এক সরকারি অফিসে কাজ করে। এই প্রথম ওর সাথে দেখা হবে। ইফেইকে ভীষণ ভালোবাসি, তাই শানের সাথে দেখা করার মধ্যে আমার একটা গরজ ছিলই। লন্ডনে স্যাকরাকে বলে তার দোকানে শান এর নাম লেখা একটা পদক বানিয়ে একটা লাল কৌটোতে ভরে আমার হাতে দিয়ে সোমা বলল, এটা দিয়ে ইফেই-এর বউয়ের মুখ দেখবে।
শানডঙ প্রদেশের লোকজনের একটা বৈশিষ্ট্য হল, ওদের আচার আচরণের মধ্যে একটা শান্ত, সংযমী, দয়ালু আর সহমর্মিতার ছাপ থাকে। চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াসের জন্ম আর কর্মভূমি হল শানডঙ। সে প্রায় ৩০০০ বছরের আগের কথা, কিন্তু এখনও এই এলাকার মানুষের স্বভাব চরিত্রের মধ্যে কনফুসীয় জীবন দর্শনের বেশ প্রভাব আছে। চিন দেশের মানুষের একটা বিরাট শতাংশ আছেন, যাঁদের কোনও ধর্মই নেই। তাই দেশটায় ধর্মীয় মাতামাতির খবর পাই না। বুদ্ধের মূর্তি, প্যাগোডা, গির্জা প্রায়ই চোখে পড়ে। সেখানে মানুষের ভিড়ও হয়। সেটা বোধ হয় যতটা ধর্মীয় টানে, তার চেয়েও বেশি বেড়ানোর জন্য। মানুষের সাথে মানুষের মিলনের জন্য।
ফোন করে ইফেইকে বললাম কাজে বেজিং আসছি, তুমি এসো, ওখানে দেখা হবে। তোমায় বেজিংয়ে এক বিখ্যাত মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। তোমার ভালো হবে ভবিষ্যতে। ইফেই বলল, তা আসব, তবে এবার আপনি জিনানে আসবেন না? জিনান শানডঙ প্রদেশের রাজধানী, যেখানে ওর বিশ্ববিদ্যালয়, আর শানের সাথে ও ঘর বেঁধেছে। আমায় বলল, ও আমাকে শানের গ্রামে নিয়ে যাবে। আমি জানতে চাইলাম, সে গ্রাম কোথায়? সে বলল, দক্ষিণ পশ্চিম শানডঙে হোয়াং হো নদীর অববাহিকায় ঈয়াংগু নামের একটি ছোট জনপদ। এখন কয়েক লক্ষ মানুষের বাস – তাই গ্রাম না বলে ছোট্ট শহর বলা ঠিক। তবে ১৫ বছর আগেও চিনের সাধারণ মানুষের যখন ততটা অর্থ বা সামর্থ্য ছিল না, তখন ঈয়াংগু একবারেই সবুজ গম আর ভুট্টার ক্ষেতে ঘেরা গ্রামই ছিল। শান সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয়েছে। আমি গ্রামেরই মানুষ। গ্রাম আমায় সব সময় টানে। তাই চিনের এবারের সফরের মাঝে দুদিনের ছুটি লাগিয়ে রাজি হয়ে গেলাম।
ফুজোও থেকে বিমানে ইফেইর শহর জিনানে এসে গেলাম। রাতটা জিনানের হোটেলে থেকে পরের দিন আমরা দুপুরে তিনজন রওনা হয়ে গেলাম। শানের সাথে প্রথম দেখা হল। সে গ্রামের মেয়ে, কিন্তু মোটেই গ্রাম্য নয়। ইংরেজিতে কথা বলতে একটু আড়ষ্ট, এই যা। যাই হোক প্রায় ২২০ কিমি মত রাস্তা, আড়াই ঘন্টার মত লাগবে বলল। দু’দিকে পাহাড়, মাঝে বিরাট চওড়া রাস্তা। চিনের রাজারা নেই কিন্তু রাজপথ আছে। পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট জমি বানিয়ে চাষিরা চাষ করছে চোখে পড়ল। গরমে ভুট্টা। এখন এদেশে গরম কাল। অসাধারণ দৃশ্য। রাস্তা ফাঁকা, গাড়ির গতি ১২০ কিমিতে স্থির। ইফেই-এর নতুন জার্মান গাড়ি, সব কিছু স্বয়ংক্রিয়। এক লেন থেকে অন্য লেনে ড্রিফট করার ভয় নেই। আমি বললাম, গাড়ি একটু আস্তে চালাও।
আমি দু’চোখ ভরে তোমাদের দেশের সবুজ পাহাড় আরও বেশি উপভোগ করতে চাই । শান বলল, একটু পরেই শুরু হবে আরও ভালো দৃশ্য। কিছু দূর যাওয়ার পর দেখলাম বেশ একটা বড় নদী। শান বলল, প্রফ (ওরা আমায় প্রফ বলে ডাকে, কেননা আমি ইফেইর প্রফেসর) এই হোল আপনার হোয়াং হো। আমরা বলি, ইয়েলো রিভার। আমি বললাম ভুগোলে পড়েছি চিনের দুঃখ হোয়াং হো। কিন্তু দুঃখের তো কোনও চিহ্ন নেই এখানে। ও বলল, এখানে নেই কিন্তু অন্যান্য প্রদেশে আছে। তিব্বতের কোনও এক হিমগিরির হিমবাহতে জন্ম হোয়াং হো-র। সেখান থেকে বেরিয়ে প্রায় আট দশটি প্রদেশের আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে হোয়াং হো শানডঙের ওপর দিয়ে উত্তর চিনে পীত সাগরে মিশেছে। তার পাঁচ হাজার মাইলেরও বেশি এই যাত্রাপথে শানডঙই শেষ প্রদেশ। সাগরের সাথে তার মিলন হবে, এখানে সে তাই শান্ত।
কিন্তু সিচুয়ান, গাঙসু , সানচি, ইনার মঙ্গোলিয়ায় সে বেশ খরস্রোতা। দক্ষিণে ইয়াংক সিকিয়াং আর মধ্য উত্তর চিনে হোয়াং হো – এই দুই নদীকে ঘিরেই চিনের হাজার হাজার বছরের সভ্যতা গড়ে উঠেছে। কত সাম্রাজ্যের জন্ম হয়েছে, পরে তারা কালের নিয়মে শেষও হয়ে গেছে। আর এই নদী সেই সবের জীবন্ত সাক্ষী থেকে গিয়েছে। আজও আধুনিক উন্নত চিনের কারিগর। কত সহস্র মানুষের তেষ্টার জল সে মেটায় । কত মানুষের পাতের অন্নের সংস্থান হয় তার জল আর দুই তীরের মাটি থেকে। এই নদীর গল্প শুনে আমার দেবাদিদেব মহাদেবের কথা মনে এল। শিবঠাকুরের দুই রূপ। রুদ্র রূপে তিনি সব কিছু বিনাশ করেন, আর শান্ত রূপে তিনি সৃষ্টি করেন।
তখন তিনি কল্যাণময়। হোয়াং হো এখানে মাইলের পর মাইল তার জল মাটি দিয়ে সবুজের সৃষ্টি করেছে। শানডঙের মানুষকে সে দু’হাত ভরে দিয়েছে। এখানে তার কল্যাণময় রূপই চোখে পড়ল। যেদিকেই তাকাই শুধু সবুজ ভুট্টার ক্ষেত । মাথার উপর নীল আকাশ। ছোট ছোট চাষির ঘর। হাইওয়ের দুদিকে আস্পেন গাছের সারি। এগুলি সব হাল আমলের। কবিগুরুর লাইন মনে এল – “এই নিখিল আকাশ ধরা, এ যে তোমায় দিয়ে ভরা। আমার হৃদয় হোতে এই কথাটি বলতে দাও হে , বলতে দাও”।
আমি গাড়ি ছোট রাস্তায় নামিয়ে ভুট্টার ক্ষেতে একটু দাঁড়ালাম। সবুজ পাতার মধ্য দিয়ে যেন কেউ কথা বলছে, আপনাদের আমি চিনি। সত্যিই আমার দাও ফিরে সে অরণ্য লহ এ নগর দশা। ঈয়াংগুতে পৌঁছে গেলাম তার একটু পরে । সেখানেও আর এক মধুর চমক। দেখলাম শানের বাবা মা দিদি আর যমজ বোন ফুলের একটা বিরাট তোড়া নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। ভাষা কোনও বাধা হোল না । ইফেই কিছুটা দোভাষীর কাজ করল। চায়নার সিঙ্গেল চাইল্ড পলিসির সময় তিন মেয়ের জন্ম। সরকার জানতে পারলে সরকারি চাকরির দফারফা। সেজন্য মেয়েদের ইনস্পেকশানের ভয়ে অন্যের বাড়িতে লুকিয়ে রাখতে হোতো নিয়মিত।
গ্রাম, তাই বিধিগত কড়াকড়ি ছিল না। শানের বাবা-মায়ের উপর বেশি সরকারি চোটপাট তাই হয়নি। এখন সরকার সে নিয়ম উঠিয়ে দিয়েছে। চিনের জনসংখ্যা কমতে শুরু করেছে তাই। হোটেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে রাতের খাবার খেয়ে একটু ঘোরাফেরা । পরের দিন সকাল ১১ টার পর ওদের বেশ আত্মীয় স্বজন মিলে বিরাট খাওয়া দাওয়ার আয়োজন। ইফেই এই প্রথম শ্বশুর বাড়ির দেশে এসেছে বলল। তাই এত সব ব্যাপার। তার সাথে আমি নতুন জামাইয়ের ২৪ ঘন্টার জন্য আপাতকালীন অভিভাবক। তার পর সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে এসেছি। তাই এত ঘটা করে খাওয়ার দাওয়ার আয়োজন। টেবিলে সব কিছু পরিপাটি করে সাজানো। দেওয়ালে লাল বেলুন।
শানের পরিবার দেখলাম হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েট হলের দেওয়ালে বড় বড় করে আমায় স্বাগত জানিয়ে ফেস্টুন লাগিয়েছেন। তাতে ইংরেজি তর্জমায় কনফুসিয়াসের বিখ্যাত বাণী: Is it not a joy to have friends come from a far? আমি অভিভুত। এঁদের সকলকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমার নেই। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। শানের বাবা মা ঠাকুরদা দিদিমা সকলেই এসেছেন। আমি আম খেতে ভালবাসি, সেটা ইফেই জানে, তাই দেখলাম টেবিলে আমের প্লেট । খাওয়া দাওয়া শেষ করে সকলকে নমস্কার জানিয়ে একই পথে আমরা তিনজন জিনানের পথে রওনা দিলাম। আবার সেই ভুট্টার মাঠ, আস্পেনের বন, হোয়াঙ হোর লম্বা সেতু পেরিয়ে দুদিকে পাহাড়ে ঘেরা পথে আসা। তবে এসব আগের দিনের মত ততটা মনকে টানল না। কয়েক ঘন্টা মনটা থেমে গিয়েছিল ঐ পরিবারের মানুষগুলির আল্তরিক আগ্রহ আর আতিথেয়তার মুহূর্তে। দুদিনের ছুটি শেষ – এবার গন্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার সিঙ্গাপুর। সেখানে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে হবে।
জিনান শহরের হোটেল – শানডঙ , ২২ শে আগস্ট , ২০২৬
- লন্ডন-প্রবাসী ডঃ বিকাশ পাল ইম্পিরিয়াল কলেজের ফ্যাকাল্টি। বর্তমানে তিনি ইলেকট্রিক পাওয়ার সিস্টেমের অধ্যাপক। এছাড়া, আইইইই, রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (ব্রিটেন), চাইনিজ সোসাইটি অফ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (আইএনএই)-এর মতো বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে ফেলোর সম্মানে সম্মানিত।



